কোম্পানির উপনিবেশ, শ্রমিক অসন্তোষ, বানানা ম্যাসাকার ও মার্কেজের মাকোন্দো

মার্কেজের লেখায় বানানা ম্যাসাকার অধ্যায়ের পর অজ্ঞান হয়ে পড়া হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো একটি ট্রেনে জেগে ওঠেন। দেখেন, তার চারপাশে শুধু মৃতদেহ। শেষ পর্যন্ত যখন তিনি মাকোন্দোয় ফিরে আসেন, হিসাব করে তার মনে হয়, সেই ঘটনায় প্রায় তিন হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল

মাকোন্দোয় রেলগাড়ি এনেছিলেন হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো। যেদিন প্রথমবারের মতো ট্রেন এসে থামল, সেগুন্দো জানত না তারও জীবন বদলে যাবে। সেই ট্রেনেই এসেছিল বেশ কয়েকজন আমেরিকান। মাকোন্দো তাদের কাছে নতুন। মাকোন্দোর পরিবেশের সঙ্গে সেখানকার আবহাওয়া ও ফলও অচেনা। এর মধ্যে একজনের দৃষ্টির পাশাপাশি রসনা আকর্ষণ করল কলা। তারপর একদিন সেখানে কার্যক্রম শুরু করল ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানি। তারা হয়ে উঠল প্রভু, আর মাকোন্দোর অধিবাসীরা তাদের দাস। রেললাইন বসানোর সব কাজ করে, সেই গাড়িতে ‘বিদেশী’দের এনে নিজের অতিথি করে কলাকে পরিচিত করানো হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো হয়ে গেল কোম্পানির ফোরম্যান। আর ঔপনিবেশিক সেই কাঠামোয় একদিন বর্ষিত হলো গুলি।

ফিকশনের থাকা ঘটনাটি আদতে ঐতিহাসিক। কলম্বিয়ার ১৯২৮ সালের ঘটনাটি ইতিহাসে ‘বানানা ম্যাসাকার’ নামে পরিচিত। কিন্তু সেদিনের ঘটনায় ঠিক কত মানুষ মারা গিয়েছিল, তা এখনো বিতর্কিত। সংবাদপত্রে এক বয়ান দেয়া হয়, সরকারি আরেক। সময় গড়ানোর সঙ্গে বিষয়টি আরো কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে উঠেছে।

১৯২৮ সালের ৬ ডিসেম্বর ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানির বিরুদ্ধে শ্রমিকদের ধর্মঘট চলাকালে তাদের ওপর গুলিবর্ষণ করে সামরিক বাহিনী। পরবর্তীতে স্থানীয় সংবাদপত্রগুলো জানায়, গুলিতে নয়জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্রের গোপন কূটনৈতিক বার্তাগুলোতে নিহতের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছিল কয়েকশ। কয়েক মাস পর প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়, নিহতের সংখ্যা ছিল এক হাজারেরও বেশি।

গার্সিয়া মার্কেজের কলমে বানানা ম্যাসাকারের অংশটি কেবল লাতিন না, বিশ্ব সাহিত্যের একটি অসামান্য ‘বর্ণনা’ হিসেবে বিবেচিত।ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিটিউড-এ এই গণহত্যার কাল্পনিক রূপায়ণে তিন হাজার মৃতদেহের কথা লিখেছিলেন মার্কেজ। বাস্তবে কী হয়েছিল, তা এখনো কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না।

ঘটনায় আসা যাক। ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানি তখন কলম্বিয়ায় নিজের আসন গেঁড়ে বসেছে। ভারতীয় উপমহাদেশে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যেভাবে কাজ করত, তার ছোট সংস্করণ বলা যায় একে। একইভাবে তারা বাইরে থেকে এসে কলম্বিয়ায় থানা গেড়েছিল। নিজেরা মালিক হয়ে স্থানীয়দের পরিণত করেছিল দাসে। কোম্পানির দাস। তাদের ক্যানড হ্যাম, কমিসারি থেকে খাবারের বিনিময়ে কাজ করানো হতো। কলার ব্যবসা বাড়ছিল, বাড়ছিল বাগান, কিন্তু শ্রমিকদের জন্য কোনো সুবিধা ছিল না। ফলে তারা আন্দোলনে নামে।

সান্তা মার্তার উপকূল। ছবি: হিস্টোরি

১৯২৮ সালের নভেম্বর। কলম্বিয়ার সান্তা মার্তায় চলছে শ্রমিক ধর্মঘট। তাদের মাত্র নয়টি দাবি। এর মধ্যে ছিল সরাসরি কোম্পানির সঙ্গে শ্রমিকদের কর্মচুক্তি করা; উন্নত আবাসনব্যবস্থা; সপ্তাহে এক দিন ছুটি; কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার জন্য ক্ষতিপূরণ এবং চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা। কোম্পানি নানা টালবাহানা করে এইসব নিয়ে। শ্রমিকরা কেবল দাবি জানিয়েছিল, কোনো সহিংসতায় যায়নি তারা। এরপরও তাদের প্রতি নরম হয়নি কোম্পানি।

ইতিহাসবিদ কেভিন কোলম্যান বলেন, ‘শ্রমিকেরা কোনো বিপ্লবের ডাক দেননি। তারা শুধু চেয়েছিল, কোম্পানি যেন কলম্বিয়ার আইন মেনে চলে। কিন্তু কোম্পানি ও রাষ্ট্র এটিকে একটি উগ্র দাবি হিসেবে দেখেছিল। কারণ এই দাবিই একটি অস্বস্তিকর সত্য সামনে নিয়ে এসেছিল—যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি কোম্পানি কলম্বিয়ার এই অঞ্চলে কার্যত সার্বভৌম ক্ষমতায় পরিণত হয়েছিল।’

সংঘাত ক্রমশ তীব্র হয়ে ওঠে। তা সামাল দেয়ার জন্য কলম্বিয়ার সরকার দমননীতি গ্রহণ করে। তারা সান্তা মার্তার কলা বাগান এলাকায় সেনা পাঠায়। সামরিক অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয় জেনারেল কার্লোস কোর্তেস ভার্গাসকে। ঘোষণা দেয়া হয় সান্তা মার্তায় চলবে সামরিক শাসন।

প্রথমে রাষ্ট্র বা কোম্পানি সরাসরি কিছু করেনি। তারা নিয়মিত অনুসরণ করত ইউনিয়ন নেতা ও ধর্মঘটকারীদের। কোম্পানির কিছু কর্মীও ট্রেনে চড়ে সেনাদের দেখিয়ে দিতেন কোন শ্রমিকদের গ্রেফতার করতে হবে। একই সময়ে ধর্মঘট এবং ক্রমবর্ধমান শ্রমিক আন্দোলনের বিরুদ্ধে সরকারি দমন-পীড়ন আরো কঠোর হতে থাকে। এর মধ্যে কর্তৃপক্ষ ফের চাতুরি করে।

কলা বাগানে শ্রমিকরা

৫ ডিসেম্বর কোর্তেস ভার্গাসের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের জানানো হয়, বিরোধ মীমাংসার জন্য ম্যাগদালেনা প্রদেশের গভর্নর তাদের সিনাগা শহরে ডেকেছেন। আলোচনার ফল জানার অপেক্ষায় হাজার হাজার শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা রেলস্টেশনের আশপাশে জড়ো হন। কথা ছিল তাদের দাবি-দাওয়া কিছুটা হলেও মানা হবে।

কিন্তু মধ্যরাতের কিছু আগে জেনারেল কোর্তেস ভার্গাস সরকারের কাছ থেকে একটি টেলিগ্রাম পান। সেখানে ছিল ‘ডিক্রি নম্বর ১’। কলা উৎপাদনকারী অঞ্চলজুড়ে জরুরি অবস্থা বা সামরিক অবরোধ জারি করা হয়। এর ফলে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা আরো বিস্তৃত হয়। এরপর সামরিক কমান্ডার নিজেও একটি আদেশ জারি করেন। খুব চেনা সেই বয়ান—তিনজনের বেশি মানুষের যেকোনো সমাবেশ অবিলম্বে ভেঙে দেয়ার নির্দেশ। প্রয়োজন হলে সৈন্যদের জনতার ওপর গুলি চালানোর ক্ষমতাও দেয়া হয়। আদেশে বলা হয়েছিল, ‘সামরিক বাঁশি বাজানোর পর কোনো ব্যক্তি চলাচল করতে পারবে না।’

কিন্তু বিক্ষোভকারীদের অনেকেই সরে যাননি। কোলম্যান জানান, কোর্তেস ভার্গাসের ‘আত্মপক্ষসমর্থনমূলক বিবরণ’ অনুযায়ী, ৬ ডিসেম্বর রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে ভার্গাস সশস্ত্র সেনাদের রেলস্টেশনের দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেন। শ্রমিকদের সামনে সামরিক আদেশ পড়ে শোনানো হয়। সরে যেতে সময় দেয়া হয়। কিন্তু তারা সরেনি। এরপর বাঁশি বেজে উঠলে শুরু হয় গুলিবর্ষণ।

ওইদিন বা ওই রাতে কতজন মানুষ নিহত হন সেই সংখ্যা ও পুরো বিষয়টিকে ‘আজও বিতর্কিত’ বলে মন্তব্য করেন কোলম্যান। গণহত্যার পরের কয়েক দিনে কলম্বিয়ার সংবাদপত্রগুলো জানায়, সেনাবাহিনীর গুলিতে মাত্র নয়জন নিহত হয়েছেন। পরে সংগৃহীত মৌখিক সাক্ষ্যগুলো অবশ্য অনেক বেশি মৃত্যুর কথা উঠে আসে।

কোলম্যান বলেন, ‘জনস্মৃতিতে প্রচলিত আছে যে সামরিক বাহিনী অসংখ্য মৃতদেহ সরিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু পরদিন সকালে শহরের মানুষ চত্বরে মাত্র নয়টি মৃতদেহ দেখতে পেয়েছিল। নয়টি মৃতদেহ—ধর্মঘটকারী শ্রমিকদের নয়টি দাবির প্রতিটির জন্য একটি করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় বোগোতায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে ওয়াশিংটনে পররাষ্ট্র দপ্তরের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগে।’ তিনি জানান, একটি বার্তায় রাষ্ট্রদূত লিখেছিলেন, নিহতের সংখ্যা ৫০০ থেকে ৬০০-এর মধ্যে। আবার ১৯২৯ সালের আরেকটি বার্তায় তিনি ‘সম্মানের সঙ্গে জানাচ্ছেন’ যে কলম্বিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে নিহত ধর্মঘটকারী শ্রমিকের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে গেছে। সেক্ষেত্রে বলা যায়, ঐদিনের পরও ধড়পাকড় ও হত্যা চলছিল।

মাগদালেনা নদীর তীরে কলার বাজার

কখনো কখনো কিছু ঘটনা ইতিহাসের চেয়ে ফিকশনে বেশি জীবন্ত হয়ে ওঠে। বানানা ম্যাসাকারের সেই ঘটনা গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের উপন্যাসে ইতিহাসের তুলনায় জীবন্ত। ১৯৬৭ সালে প্রকাশ হয় ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিটিউড। উপন্যাসে গার্সিয়া মার্কেস এই ঘটনাকে স্থানান্তরিত করেন কাল্পনিক শহর মাকোন্দোয়। বানানা ম্যাসাকারে অংশটিতে কেন্দ্রীয় চরিত্র বুয়েন্দিয়া পরিবারের চতুর্থ প্রজন্মের হোসে আর্কাদিও সেগুন্দো। তিনি গণহত্যা থেকে বেঁচে যান এবং ঘটে যাওয়া হত্যাযজ্ঞের স্মৃতি ধরে রাখেন। কিন্তু কেউ তার কথা বিশ্বাস করে না।

মার্কেজের লেখায় এই অধ্যায়ের অন্যতম স্মরণীয় দৃশ্যে তিনি এমন একটি ট্রেনে জেগে ওঠেন, যার চারপাশে শুধু মৃতদেহ। শেষ পর্যন্ত যখন তিনি মাকোন্দোয় ফিরে আসেন, হিসাব করে তার মনে হয়, সেই ঘটনায় প্রায় তিন হাজার মানুষের মৃতদেহ ছিল।

তবে তিন হাজার সংখ্যাটি কোনো ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। ১৯৯০ সালে ব্রিটিশ টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গার্সিয়া মার্কেস জানান, উপন্যাস লেখার আগে তিনি প্রকৃত নিহতের সংখ্যা নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। তিনি দেখেছিলেন, বিভিন্ন সূত্রে নিহতের সংখ্যা তিন হাজারের তুলনায় অনেক কম। কিন্তু সঠিক সংখ্যা নিশ্চিত করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। কিন্তু মার্কেজ তিন হাজার সংখ্যাটিই বেছে নেন। তার ব্যাখ্যায়, উপন্যাসের ‘জাদুবাস্তবতার অনুপাতের সঙ্গে মানানসই’ ছিল এই সংখ্যা।

কোলম্যান বলেন, ‘কলম্বিয়াসহ বিশ্বের অনেক পাঠকের কাছে গার্সিয়া মার্কেসের কাল্পনিক বিবরণই ইতিহাস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের উপন্যাসের (সিয়েন আনোস দে সোলেদাদ) প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ।

তবে গণহত্যার প্রকৃত ইতিহাস খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে জনতার বিশ্বাসই একমাত্র সমস্যা নয়। কয়েক দশক ধরে ইতিহাসবিদরা এ নিয়ে কাজ করছেন। কিন্তু তারা নথি খুঁজে পাননি। কিংবা নথি থাকলেও তাদের দেয়া হয়নি। এর পেছনে আংশিকভাবে দায়ী ছিল ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানিও। কোম্পানিটি কখনোই গবেষকদের ওই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত নিজস্ব নথিপত্র দেখার অনুমতি দেয়নি।

যে অল্প কিছু উপাদান টিকে ছিল, তার মধ্যে ছিল হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলে দান করা কিছু আলোকচিত্র। আরও কিছু সংশ্লিষ্ট ছবি বহু বছর পর পানামায় কোম্পানির একটি গুদামে পাওয়া যায়। কিন্তু তাতে এই ঘটনা বিস্মৃত হয়ে যায়নি।

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ

রাজনৈতিকভাবেও ধর্মঘট ও গণহত্যার ঘটনাটি পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এই ঘটনাকে ব্যবহার করে সরকারের বিরুদ্ধে এবং ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানির সঙ্গে সরকারের সম্পর্কের সমালোচনা করে। কোলম্যানের মতে, ১৯২৮ সালের ঘটনাগুলোকে ‘দীর্ঘ শীতল যুদ্ধের একেবারে শুরুর দিকের একটি অধ্যায়’ হিসেবেও দেখা যায়।

কিন্তু ইতিহাস এখনো নিশ্চিত করে বলতে পারেনি—সেদিন এবং পরবর্তী মাসগুলোতে ঠিক কতজন মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। এই অনিশ্চয়তাই বানানা ম্যাসাকারের ইতিহাসকে আরও জটিল করে তুলেছে। একদিকে আছে রাষ্ট্রীয় নথি ও সরকারি বিবরণ, অন্যদিকে শ্রমিক ও স্থানীয় মানুষের স্মৃতি, কূটনৈতিক নথি এবং সাহিত্যিক পুনর্নির্মাণ। তাই মার্কেজের ম্যাজিক রিয়ালিজম, মাকোন্দোর ঘোর, ঔপনিবেশিকতা ও পোস্ট ট্রুথের আধুনিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে দেখা যায় ১৯২৮ সালের সেই রক্তাক্ত রাত আজও ইতিহাস, স্মৃতি ও সাহিত্যের এক সংযোগস্থল হয়ে আছে।

[সূত্র:

১. One Hundred Years of Solitude by Gabriel García Márquez; Translated by Gregory Rabassa

২. ‘হিস্টোরি’তে প্রকাশিত মারিয়া দেস লস অ্যাঞ্জেলেস অর্ফিয়ার নিবন্ধ]

আরও