পরিবার, বন্ধু কিংবা আমাদের প্রিয় কোনো সেলিব্রেটি কাপল, কারও ডিভোর্স হয়েছে শুনলেই আমাদের মাথায় প্রায় একই প্রশ্ন আসে, ‘দোষটা কার?’ প্রশ্নটি যেন না করলেই নয়। স্বামী কী করেছে? স্ত্রী কী করেছে? কে সংসার করতে চায়নি? কে বদলে গেছে? পরকীয়াটা কে করছে? যেন একটি বিয়ে ভাঙতে হলে অবশ্যই একজনকে খারাপ হতে হবে। সবসময় কি একজনের দোষ থাকাটা জরুরি?
একটি বিয়ের শুরুতে যে দুজন মানুষ একে অপরকে বেছে নিয়েছিলেন, কয়েক বছর পর তারা ঠিক একই মানুষ থাকবেন, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। মানুষ বদলায়। তার অগ্রাধিকার বদলায়, মূল্যবোধ বদলায়, স্বপ্ন বদলায়, কখনো নিজের সম্পর্কেও তার প্রয়োজন বদলে যায়। একজন হয়তো সন্তান চান, অন্যজন চান না। একজন ক্যারিয়ারের জন্য পৃথিবীর অন্য প্রান্তে যেতে চান, অন্যজন শিকড় ছেড়ে যেতে রাজি নন। একজন ধীরে ধীরে আরও স্বাধীন জীবন চান, অন্যজন চান ঘনিষ্ঠ, পারিবারিক জীবন। এখানে কাকে ভুল বলবেন আপনি?
মনোবিজ্ঞানে ‘গ্রোয়িং অ্যাপার্ট (growing apart)’ বা ধীরে ধীরে দূরে সরে যাওয়াকে সম্পর্ক ভাঙার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, দম্পতিরা অনেক সময় নির্দিষ্ট কোনো অপরাধের চেয়ে অনুভূতির অভাবকেও বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। অর্থাৎ সম্পর্ক সবসময় বড় কোনো কারণে শেষ হবে এমন নয়। কখনো তা নিঃশব্দে ক্ষয়ে যায়। আমরা আটকে থাকি একটাই প্রশ্নে, প্রতারণাটা কে করেছে।
আর একটি অদ্ভুত সত্য হলো, ভালোবাসা এবং সংসার একই জিনিস নয়। দুজন মানুষ একে অপরকে ভালোবাসতে পারেন, কিন্তু তারা একসঙ্গে ভালো জীবনযাপন করতে নাও পারেন। ভালোবাসা কখনো কখনো সম্পর্ক শুরু করার জন্য যথেষ্ট, কিন্তু একটি দীর্ঘ জীবন ভাগ করে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন আরও অনেক কিছু—যোগাযোগ, মূল্যবোধের সামঞ্জস্য, ভবিষ্যৎ নিয়ে কাছাকাছি ধারণা, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, ব্যক্তিগত সীমারেখা এবং জীবনের পরিবর্তনের সঙ্গে একসঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। কিন্তু ওই তো আমাদের ঐ একই প্রশ্ন, পরকীয়াটা কে করল?
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। সন্তান জন্মের পর অনেক দম্পতির ম্যারিটাল স্যাটিসফ্যাকশন কমে যাওয়ার প্রবণতা গবেষণায় পাওয়া গেছে। কারণ সন্তান আসা শুধু পরিবারের সদস্য বাড়ায় না; বদলে দেয় ঘুম, সময়, অর্থনীতি, দায়িত্ব, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং দাম্পত্য ঘনিষ্ঠতার কাঠামোও। আর এদিকে আমরা আটকে থাকি একটাই প্রশ্নে, ধোঁকাটা কে দিয়েছে।
কখনো অর্থনীতিও একটি সম্পর্কের নীরব তৃতীয় পক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। বেকারত্ব, ঋণ, আয়-ব্যয়ের চাপ, দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিশ্চয়তা—এসব মানুষের মেজাজ, আত্মসম্মান, পারস্পরিক আচরণ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নিরাপত্তাবোধেও প্রভাব ফেলে। আবার কখনো দূরত্ব, ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ততা দুজনের জীবনকে এমন দুটি আলাদা বাস্তবতায় নিয়ে যায়, যেখানে ভালোবাসা থাকলেও একসঙ্গে থাকার ইচ্ছে ক্রমশ হারিয়ে যায়। কিন্তু আমরা আমাদের প্রশ্ন থেকে বেরিয়ে আসতে পারি না, দোষটা কার ছিল।
দক্ষিণ এশীয় সমাজে বিয়ে প্রায়ই শুধু দুজন মানুষের সম্পর্ক নয়। শ্বশুরবাড়ির প্রত্যাশা, বাবা-মায়ের হস্তক্ষেপ, আর্থিক নির্ভরতা, সন্তান পালনের পদ্ধতি, সামাজিক মর্যাদা, অনেক কিছুই দাম্পত্যের ভেতরে ঢুকে পড়ে। ফলে কখনো কখনো যে সম্পর্কটি ভাঙছে, তার সমস্ত কারণ স্বামী-স্ত্রী না হয়ে পরিবারও হতে পারে। আবার কিছু ভাঙনের পেছনে থাকে এমন বাস্তবতা, যার জন্য কাউকে দোষী করা প্রায় নিষ্ঠুর। দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা, বৈবাহিক সম্পর্কের চাপ, এসব মানুষের জীবনকে বদলে দিতে পারে। কিন্তু আমাদের চিন্তায় এসব কখনোই আসে না। আমরা কেবল দোষ খুঁজি।
তবে এ কথার অর্থ কখনোই এটা নয় যে, সব ডিভোর্সে কেউই দায়ী নয়। নির্যাতন, প্রতারণা, পরিত্যাগ, কিংবা ইচ্ছাকৃত সহিংসতার মতো ক্ষেত্রে দায় এবং জবাবদিহি স্পষ্ট। এসব ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীকে ‘দুজনেরই দোষ’ বলে দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি করা আরও অন্যায়। কিন্তু প্রতিটি বিচ্ছেদকে একই কাঠামোয় বিচার করাও সমান ভুল। সম্ভবত আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল হলো—আমরা বিয়েকে সফলতা আর ব্যর্থতার সরল সমীকরণে দেখি। বিয়ে টিকে গেলে সফল, ভেঙে গেলে ব্যর্থ। কিন্তু একটি সম্পর্কের শেষ তার পুরো সময়টাকে মিথ্যা করে দেয় না। যে দুজন মানুষ দশ বছর একে অপরকে ভালোবেসেছেন, অসুস্থতায় পাশে থেকেছেন, সন্তান বড় করেছেন, অসংখ্য রাত কথা বলে কাটিয়েছেন—তাদের সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলে সেই দশ বছর হঠাৎ অর্থহীন হয়ে যায় না।
তাই পরেরবার কারও বিবাহবিচ্ছেদের খবর শুনে হয়তো আমাদের প্রশ্ন তোলার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে বোঝা উচিত, একটা সম্পর্ক ভাঙার পর দুজন মানুষই প্রচণ্ড মানসিক পীড়ার ভেতর দিয়ে যায়। তাই প্রশ্ন নয়, বরং কনভার্সেশন করুন। তাদের সময় দিন, পাশে থাকার চেষ্টা করুন।