সকালের নরম আলোয় দূর থেকে ভেসে আসে পাখির ডাক। অচেনা হলেও এমন শব্দ অনেক সময় মনকে অদ্ভুতভাবে শান্ত করে। কিন্তু সব পাখির ডাক কি আমাদের সমানভাবে আনন্দ দেয়? কাকের কর্কশ ডাক যেখানে বিরক্তির কারণ হয়, সেখানে কিছু পাখির সুর শোনামাত্রই যেন মন শান্ত হয়ে যায়। কিন্তু মানুষের কানে কোন পাখির সুর কতটা মধুর শোনায়, তা নিয়ে এবার দীর্ঘদিনের কৌতূহল থেকে এবার বিজ্ঞানীরা বের করেছেন এর সুনির্দিষ্ট কারণ।
সম্প্রতি জার্মানির টিউবিনগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু বিশেষ শব্দের বৈশিষ্ট্যের কারণেই কিছু পাখির ডাক মানুষের কাছে তুলনামূলক বেশি সুরেল ও আনন্দদায়ক মনে হয়। ‘ফ্রন্টিয়ার্স’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এ গবেষণার প্রধান গবেষক ড. নাদিন কাল্ব জানান, মানুষ কম কম্পাঙ্কের, নিচু স্বরের এবং তুলনামূলক জটিল বা পেঁচানো মেলোডির সুর বেশি পছন্দ করে।
মজার বিষয় হলো, পাখির নাম বা প্রজাতি সম্পর্কে শ্রোতার পূর্বজ্ঞান থাকুক কিংবা না থাকুক, এই পছন্দের ক্ষেত্রে তেমন কোনো প্রভাব ফেলে না। অর্থাৎ মানুষের সৌন্দর্যচেতনার সঙ্গে পাখির সুরের এক গভীর মৌলিক মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ক রয়েছে।
গবেষণায় ৮৪ জন অংশগ্রহণকারীকে ১২৩টি বুনো পাখির ডাক শুনিয়ে রেটিং দিতে বলা হয়। ১ থেকে ৫ স্কোরের এই জরিপে ৪.৫২ পয়েন্ট পেয়ে সেরা সুরেল পাখির খেতাব জিতেছে ‘ইউরেশিয়ান ব্ল্যাকবার্ড’ বা সাধারণ ব্ল্যাকবার্ড। ইউরোপজুড়ে দেখা যাওয়া এই পাখির বাঁশির মতো নিচু ও গভীর সুর মানুষের মন সবচেয়ে বেশি জয় করেছে। অন্যদিকে তালিকায় সবচেয়ে নিচে ঠাঁই পেয়েছে ‘বার্ন আউল’ বা লক্ষ্মীপেঁচা। এর কর্কশ বা হাঁকডাকের মতো সুর পেয়ে মাত্র ১.৩২ পয়েন্ট পেয়েছে। তালিকায় অন্য জনপ্রিয় পাখিদের মধ্যে ইউরোপীয় গোল্ডফিঞ্চ ৪.২৬, ইউরোপীয় রবিন ৪.০৪ এবং ব্লু টিট ৩.৯২ পয়েন্ট অর্জন করেছে।
প্যারিসের বোয় দ্য ভাঁসেন উদ্যানে দেখা মেলা এক ইউরোপীয় গোল্ডফিঞ্চ, যা সমীক্ষায় ৫-এর মধ্যে ৪.২৬ নম্বর পেয়ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা পাখিদের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে
সিনিয়র গবেষক ড. ক্রিস্টোফ র্যান্ডলার বলেন, সাধারণত আমরা মনে করি সহজ ও একই সুরের পুনরাবৃত্তি হয়তো মানুষের বেশি ভালো লাগবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে জটিল ও সুরের বৈচিত্র্যময় বিন্যাসই মানুষ বেশি উপভোগ করে।
বিজ্ঞানীদের মতে, মানব বিবর্তনের আদি ইতিহাস থেকেই প্রকৃতির এই শব্দগুলোর গুরুত্ব রয়েছে। স্বাভাবিকভাবে পাখি ডাকাডাকি করার অর্থ চারপাশ বিপদ মুক্ত। আর বিবর্তনের এই অনুভূতি হয়তো মানুষের মনে সুরের মাধ্যমে এক গভীর স্বস্তি তৈরি করে।
এদিকে অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শহরের পার্ক বা সবুজ এলাকা পরিকল্পনা করার ক্ষেত্রে কেবল শব্দদূষণ কমানোর দিকে নজর না দিয়ে পাখির প্রাকৃতিক সুর বজায় রাখার ওপর জোর দেয়া উচিত।
তবে গবেষকরা সতর্ক করছেন, শুধু মিষ্টি গান গাওয়া পাখিকে গুরুত্ব দিয়ে পাখির অন্য জাতগুলো সংরক্ষণে গুরুত্ব না দিলে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে। রয়্যাল হলওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রবার্ট ল্যাচলানও মনে করেন, গবেষণাটি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে, তবে আরো গবেষণা প্রয়োজন।
—সিএনএন থেকে তথ্য নেয়া