প্রথমবারের মতো আরারাত পর্বতের রহস্যময় হিমবাহ জরিপ করলেন বিজ্ঞানীরা

আনাতোলিয়া, মেসোপটেমিয়া ও ককেশাসের সংযোগস্থলে আরারাতের অবস্থান হিমবাহটিকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ করেছে। এ অঞ্চলেই কৃষির সূচনা এবং খনন ও ধাতুবিদ্যার প্রাচীন কেন্দ্রগুলো গড়ে উঠেছিল

তুরস্কের সর্বোচ্চ পর্বত আরারাতের হিমবাহে প্রথমবারের মতো বৈজ্ঞানিক জরিপ চালিয়েছেন জার্মানি ও তুরস্কের একদল গবেষক। অতীতের জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রাচীন মানবসভ্যতার কর্মকাণ্ডের ইতিহাস এই বরফের স্তরে সংরক্ষিত আছে কিনা, তা জানতেই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নে হিমবাহটি দ্রুত সংকুচিত হওয়ায় বরফে জমে থাকা মূল্যবান তথ্যও হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

গত জুলাইয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে পাঁচ হাজার মিটারেরও বেশি উচ্চতায় দুই সপ্তাহ ধরে জরিপ চালান গবেষকরা। সেখানে উপত্যকার তুলনায় অক্সিজেনের পরিমাণ প্রায় অর্ধেক। তীব্র ঠাণ্ডা ও প্রবল বাতাসের মধ্যেই এতদিন বিজ্ঞানের কাছে অনেকটা অজানা থাকা বরফক্ষেত্রটির গঠন ও গভীরতা পরিমাপ করেন তারা।

জরিপে ভূমি থেকে পরিচালিত রেডিও ইকো সাউন্ডিং ও অ্যাকটিভ সিসমিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এসব প্রযুক্তির সাহায্যে হিমবাহের বরফের পুরুত্ব এবং এর নিচে থাকা ভূমির আকৃতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। গবেষকদের মূল লক্ষ্য ছিল, কোথা থেকে সবচেয়ে দীর্ঘ ও অবিচ্ছিন্ন আইস কোর সংগ্রহ করা সম্ভব, সেই স্থান শনাক্ত করা।

জরিপ দলের সদস্য জার্মানির আলফ্রেড ওয়েগেনার ইনস্টিটিউটের ড. কোয়েন হফস্টেড জানান, বৈরী আবহাওয়া সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় সব তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে পরবর্তী অভিযানে বরফ খননের উপযুক্ত স্থান নির্ধারণ করা হবে। পরিকল্পনা সফল হলে সেটিই হবে আরারাত পর্বত থেকে সংগৃহীত প্রথম আইস কোর।

আইস কোর হলো হিমবাহের গভীর থেকে তুলে আনা লম্বা বরফখণ্ড। এর বিভিন্ন স্তরে অতীতের বায়ুমণ্ডলের গঠন, ধূলিকণা, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ও জলবায়ুর পরিবর্তনের চিহ্ন সংরক্ষিত থাকতে পারে। ফলে রোমান ক্লাইমেট অপটিমাম ও লেট অ্যান্টিক লিটল আইস এজের মতো পরিচিত জলবায়ুপর্ব এ অঞ্চলে কী প্রভাব ফেলেছিল, তা জানা যেতে পারে।

প্রকল্পের নেতৃত্ব দেয়া মুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আচিম লিশটেনবার্গের মতে, প্রত্নতত্ত্বের জন্য এটি সম্পূর্ণ নতুন তথ্যভাণ্ডার হতে পারে। এতদিন প্রাচীন মানুষের কর্মকাণ্ড জানতে মূলত মাটির নিচের নিদর্শনের ওপর নির্ভর করতে হতো। কিন্তু আরারাতের বরফে হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিক চিহ্ন স্তরে স্তরে সংরক্ষিত থাকতে পারে।

আনাতোলিয়া, মেসোপটেমিয়া ও ককেশাসের সংযোগস্থলে আরারাতের অবস্থান হিমবাহটিকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ করেছে। এ অঞ্চলেই কৃষির সূচনা এবং খনন ও ধাতুবিদ্যার প্রাচীন কেন্দ্রগুলো গড়ে উঠেছিল। গবেষকরা আশা করছেন, বরফে প্রাচীন ধাতু গলানোর চুল্লি থেকে ছড়িয়ে পড়া সূক্ষ্ম কণা কিংবা জুমচাষের অবশেষও পাওয়া যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে আরারাতের হিমবাহ পুরো অঞ্চলের জলবায়ু ও মানবসভ্যতার এক অনন্য প্রাকৃতিক মহাফেজখানায় পরিণত হবে। গবেষণা প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করছে গেরদা হেঙ্কেল ফাউন্ডেশন।

আরও