বিড়াল পালন করেন অথচ তার অদ্ভুত সব কাণ্ডকারখানা দেখে অবাক হননি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। কখনো সে ল্যাপটপের ওপর আয়েশ করে শুয়ে পড়ে, আবার কখনো গভীর রাতে অকারণেই ঘরের ভেতর দৌড়ঝাঁপ শুরু করে। বিজ্ঞানীদের মতে, বিড়ালের প্রতিটি বিচিত্র আচরণের পেছনেই লুকিয়ে আছে নির্দিষ্ট কোনো অর্থ। বিড়ালপ্রেমীদের জন্য তাদের প্রিয় সঙ্গীর গোপন ভাষার অর্থ জানতেই আজকের এ আয়োজন।
মনোযোগ কাড়ার অভিনব কৌশল
কাজের সময় হঠাৎ বই বা ল্যাপটপের ওপর উঠে বসা বিড়ালের খুব পরিচিত আচরণ। এটি আসলে মালিকের মনোযোগ নিজের দিকে টেনে আনার একটি প্রক্রিয়া। বিড়াল এভাবে জানিয়ে দেয়, এখন অন্য কিছু নয়, তাকেই সময় দিতে হবে।
ডাকলেও সাড়া না দেয়া
অনেকে মনে করেন বিড়াল তার নাম বোঝে না, কিন্তু বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। বিড়াল খুব বুদ্ধিমান ও জেদি প্রাণী। সে তার নাম ঠিকই চেনে, কিন্তু ডাকে সাড়া দেবে কি না সেটি সম্পূর্ণ তার নিজের মর্জির ওপর নির্ভর করে। তারা নিজেদের শর্তে ভালোবাসা প্রকাশ করতে পছন্দ করে।
পায়ের কাছে উপহার নিয়ে আসা
মাঝে মাঝে বিড়াল শিকার করা মরা তেলাপোকা, ইঁদুর বা পাখি মালিকের পায়ের কাছে নিয়ে আসে। এটি দেখতে অস্বস্তিকর হলেও বিড়ালের কাছে এটি মূলত ‘প্রেস্টিজিয়াস’ বিষয়। ছোটবেলায় মা বিড়াল যেভাবে তার সন্তানদের খাবার এনে দিত, বিড়ালও তার ওনার বা প্যারেন্টকে পরিবারের অংশ মনে করে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এসব ‘উপহার’ নিয়ে আসে।
ছবি: ফেসবুক থেকে নেয়া
থাবা দিয়ে চাপড়ানো বা ‘নিডিং’
প্রাপ্তবয়স্ক বিড়াল অনেক সময় মালিকের শরীরের নরম অংশে দুই পা দিয়ে চাপ দেয়, যাকে বলা হয় ‘নিডিং’। এটি আসলে তাদের শৈশবের প্রবৃত্তি। ছোটবেলায় মায়ের দুধ খাওয়ার সময় তারা এভাবে চাপ দিত। বড় হওয়ার পরও তারা যখন খুব খুশি থাকে বা মানসিক প্রশান্তি পায়, তখন এমন আচরণ করে।
গন্ধ শোঁকার অভ্যাস
হঠাৎ কাছে এসে মুখ বা হাত শোঁকা মানে পরিচিত গন্ধ খোঁজা। এটি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি উপায়। পরিচিত গন্ধ পেলে তারা বেশি স্বস্তিতে থাকে।
প্লাস্টিক চিবানোর কারণ
বিড়াল যদি হঠাৎ খাবার ছাড়া অন্য কিছু যেমন প্লাস্টিক চিবানো শুরু করে, তবে সাবধান হওয়া জরুরি। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে ‘পাইকা’ বলা হয়। সাধারণত দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপ কিংবা পুষ্টির অভাব থেকে তারা এমনটা করতে পারে। এক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া প্রয়োজন। তবে সব ক্ষেত্রেই যে বিষয়টি এরকম তা নয়। অনেক সময় দুষ্টুমি বা খেলার ছলে বিড়াল নাগালে যা পায় তা ই কামড়ে থাকে।
জানলার পাশে অদ্ভুত শব্দ করা
জানলার বাইরে পাখি দেখে বিড়াল অনেক সময় দাঁত দিয়ে এক ধরনের কিচিরমিচির শব্দ বা অযথাই ঝাপাঝাপি করে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি আসলে শিকার ধরতে না পারার হতাশা। আবার অনেকের মতে, এটি শিকার ধরার আগে তাদের পেশিকে সচল করার একটি প্রাকৃতিক কৌশল।
পেট প্রদর্শন ও গড়াগড়ি
বিড়াল যখন আপনার সামনে চিৎ হয়ে শুয়ে পেট দেখায় বা গড়াগড়ি খায়, তখন বুঝবেন সে আপনাকে ভীষণ বিশ্বাস করে। প্রাণিজগতে পেট হলো সবচেয়ে সুরক্ষিত অংশ, যা তারা কেবল নিরাপদ বোধ করলেই উন্মুক্ত করে। এটি আপনার সঙ্গে খেলার একটি আমন্ত্রণও হতে পারে।
রাতের বেলা কান্নাকাটি বা চিৎকার
গভীর রাতে বিড়ালের উচ্চস্বরে ডাকাডাকি অনেক সময় ক্যাট প্যারেন্টদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। আসলে বিড়ালরা রাতে বেশি সক্রিয় থাকে। আর তাই ঘরে কোনো শিকার খুঁজে না পেলে বা একঘেয়েমি থেকে তারা এভাবে চিৎকার করে। দিনের বেলা তাদের সঙ্গে বেশি খেললে রাতে তারা শান্তিতে ঘুমায়।
লেজ নাড়ানোর ভিন্ন অর্থ
কুকুরের লেজ নাড়ানো আনন্দের প্রতীক হলেও বিড়ালের ক্ষেত্রে বিষয়টি উল্টো। বিড়াল যখন দ্রুত লেজ ডানে-বামে ঝাপটায়, তখন বুঝতে হবে সে বিরক্ত বা উত্তেজিত। এমন সময় তাকে একা ছেড়ে দেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। তবে লেজ যদি ধীরে ধীরে কাঁপে, তবে বুঝতে হবে সে কোনো বিষয়ে কৌতূহলী।
লুকিয়ে থাকা
ছোট জায়গায় লুকিয়ে থাকা তাদের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। এতে তারা নিরাপদ বোধ করে, বিশেষ করে অচেনা পরিবেশে।
হঠাৎ দৌড়ঝাঁপ
ঘরের ভেতর হঠাৎ দৌড়ানো জমে থাকা শক্তি ঝেড়ে ফেলার উপায়। নিয়মিত খেলাধুলা এ আচরণ কমাতে সাহায্য করে।
অতিরিক্ত একা থাকা
বিড়াল নিরিবিলি থাকতে পছন্দ করলেও একাকীত্ব আবার তাদের আচরণে পরিবর্তন আনতে পারে। তাই দিনের নির্দিষ্ট একটি সময় বরাদ্দ রাখা যেতে পারে আদুরে এ বন্ধুটির জন্য।
ঘুমের ভঙ্গি
গুটিসুটি মেরে ঘুমানো বিড়ালদের শরীরের তাপ ধরে রাখার কৌশল। আবার পা ছড়িয়ে ঘুমানো মানে পুরোপুরি নিশ্চিন্ত থাকা।
গরগর শব্দের রহস্য
গরগর শব্দ সাধারণত সুখের প্রকাশ হলেও কখনো চাপ কমানোর উপায় হিসেবেও কাজ করে। তবে বিড়ালরা যখন কারো কাছে স্বস্তি পায়, খুব নিরাপদ ও আদর অনুভব করে তখন তারা এরকম শব্দ করে নিজেদের অনুভূতির জানান দেয়।
চোখ দিয়ে ‘আই লাভ ইউ’ বলা
বিড়াল যখন কারো দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে চোখের পাতা বন্ধ করে ও খোলে, তখন সেটি তাদের ভাষায় ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। গবেষকরা একে ‘ক্যাট কিস’ বা বিড়ালের চুম্বন বলে অভিহিত করেন। আর কেউ যদি একইভাবে ধীরে ধীরে চোখের পাতা বন্ধ করে তার পোষা বিড়ালের দিকে এভাবে তাকায়, তবে বিড়ালটি সেই ভালোবাসা বুঝতে পারবে।
বিড়ালের এ ছোটছোট বিচিত্র স্বভাবগুলোই তাকে অনন্য করে তোলে। একটু সচেতন হলেই বোঝা যায়, এ আচরণের মাধ্যমেই তারা আসলে নিজেদের আনন্দ, বেদনা আর ভালোবাসার গল্পগুলো আমাদের কাছে পৌঁছে দিতে চায়।
—মাহফুজা মিম অনূদিত ও পরিমার্জিত