অলফ্যাক্টরি মেমোরি: গন্ধ মানুষকে স্মৃতিকাতর করে তোলে

কোনো পুরনো ধুলোমাখা বইয়ের গন্ধ, বৃষ্টির পর ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ কিংবা ছোটবেলায় মা বা দাদির ব্যবহৃত কোনো সাবানের সুবাস মুহূর্তেই আমাদের শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। মনে করিয়ে দেয় বহু বছর আগের কোনো বিশেষ মুহূর্তে। এই যে হুট করে আসা স্মৃতির জোয়ার, বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘অলফ্যাক্টরি মেমোরি’ বা ঘ্রাণজ স্মৃতি।

ঘ্রাণ বা গন্ধের সঙ্গে মানুষের স্মৃতির এক অদ্ভুত ও অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। কোনো পুরনো ধুলোমাখা বইয়ের গন্ধ, বৃষ্টির পর ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ কিংবা ছোটবেলায় মা বা দাদির ব্যবহৃত কোনো সাবানের সুবাস মুহূর্তেই আমাদের শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। মনে করিয়ে দেয় বহু বছর আগের কোনো বিশেষ মুহূর্তে। এই যে হুট করে আসা স্মৃতির জোয়ার, বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘অলফ্যাক্টরি মেমোরি’ বা ঘ্রাণজ স্মৃতি।

স্নায়ুবিশেষজ্ঞ ও মনোবিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের পাঁচটি প্রধান ইন্দ্রিয়ের মধ্যে ঘ্রাণশক্তি বা নাক দিয়ে গন্ধ নেয়ার ক্ষমতা সবচেয়ে প্রাচীন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী ভেঙ্কটেশ মূর্তি বলেন, স্বাদ ও গন্ধ একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। চিবানোর সময় খাবারের উড়ন্ত অণুগুলো নাকে ঢুকে ঘ্রাণ-সংবেদনকারী নিউরনকে উদ্দীপ্ত করে। এতে মানুষের খাদ্য গ্রহণের স্পৃহা তীব্র হয়। একই কারণে সাধারণ সর্দি-কাশি বা শ্বাসনালীর অসুখে যখন গন্ধের অনুভূতি কমে যায়, তখন খাবারও বিস্বাদ লাগে।

বিবর্তনের ধারায় মানুষ যখন চোখ বা কান দিয়ে চারপাশকে বুঝতে শেখেনি, তারও আগে অতি ক্ষুদ্র এককোষী ব্যাক্টেরিয়াও তাদের চারপাশের রাসায়নিক সংকেত বুঝতে পারত। মানুষের নাকে প্রায় ৪৫০ ধরনের রিসেপ্টর থাকে, যা প্রায় এক ট্রিলিয়ন (১ লাখ কোটি) ভিন্ন ভিন্ন গন্ধ আলাদা করতে সাহায্য করে।

মস্তিষ্কের মানচিত্রে প্রতিবেশী গন্ধ ও স্মৃতি

কেন ঘ্রাণ এত শক্তিশালী স্মৃতি জাগানিয়া? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের মস্তিষ্কের গঠন বা এনাটমিতে।

গন্ধ শনাক্ত করার প্রধান কাজটি করে মস্তিষ্কের ‘অলফ্যাক্টরি বাল্ব’। এটি মস্তিষ্কের ঠিক সামনের দিকে অবস্থিত। আর এ অলফ্যাক্টরি বাল্ব সরাসরি যুক্ত থাকে মস্তিষ্কের ‘হিপোক্যাম্পাস’ অঞ্চলের সঙ্গে। মজার ব্যাপার হলো, মস্তিষ্কের এ অংশটিই মূলত সমস্ত স্মৃতি জমা রাখা ও তা খুঁজে বের করার দায়িত্ব পালন করে। হিপোক্যাম্পাসের পাশেই ‘অ্যামিগডালা’র অবস্থান, যা আবেগ বা ইমোশন নিয়ন্ত্রণ করে।

যেহেতু গন্ধ শনাক্তকারী অংশটি স্মৃতি ও আবেগের প্রধান কেন্দ্রের খুব কাছে অবস্থান করে এবং সরাসরি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে, তাই কোনো বিশেষ গন্ধ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মস্তিষ্ক সে গন্ধের সঙ্গে যুক্ত পুরনো কোনো স্মৃতিকে মুহূর্তে সামনে নিয়ে আসে।

অন্যান্য ইন্দ্রিয় কেন এমন নয়?

আমরা কোনো কিছু দেখলে (দৃষ্টি) বা শুনলে (শ্রবণ) সেই তথ্যগুলো সরাসরি হিপোক্যাম্পাসে পৌঁছায় না। সেগুলো মস্তিষ্কের অন্যান্য প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ঘুরে আসে। কিন্তু ঘ্রাণের ক্ষেত্রে তথ্যগুলো সরাসরি স্মৃতির স্টোরহাউসে আঘাত করে। আর একারণেই কোনো পুরনো ছবি দেখার চেয়ে কোনো পরিচিত সুবাস আমাদের অনেক বেশি দ্রুত ও স্পষ্টভাবে স্মৃতিকাতর করে তোলে।

আরও