‘ডিগার’ রিভিউ

দর্শককে ধমক দিয়ে বোঝানোর চেষ্টায় অতিনাটকীয় টম ক্রুজ

আসল সমস্যা অন্য জায়গায়। ‘ডিগার’ মোটেও হাস্যকর নয়। ছবিটি মুখের ওপর কথা বলা, দুঃসাহসী ও অদ্ভুত

তবে সিনেমায় একটি দৃশ্য আছে, যা দর্শকের রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। এর কারণ একদিকে ক্রুজের অভিনয়, অন্যদিকে দৃশ্যটির বক্তব্য। বিশ্ব যখন বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন ডিগার একটি বৈশ্বিক সমাবেশের সামনে দাঁড়ান। সেটি ভবিষ্যতের জাতিসংঘের মতো দেখতে। সেখানে তিনি ব্যাখ্যা করেন, কেন বিশ্ব এখনো তেলের ওপর নির্ভরশীল

আলেহান্দ্রো জি ইনারিতু পরিচালিত ‘ডিগার’ চলচ্চিত্রে টেক্সাসের এক জ্বালানি তেল টাইকুনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন টম ক্রুজ। আর চরিত্রটি এমন এক বিপর্যয় ডেকে আনে, যা শেষ পর্যন্ত তার নিজের ক্ষমতারও বাইরে চলে যায়। ‘ডিগার’ এমন একটি সিনেমা— যেখানে নির্মাতা-অভিনেতারা মনে করে তারা শুধু বার্তাই দিচ্ছে না; বরং মানুষের সামনে সত্যের বাণী তুলে ধরছে। ক্রুজকে এখানে দেখা যায় ভারি গাল এবং এলোমেলো, পাতলা সাদা চুলে। তার চরিত্র প্রবীণ জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবসায়ী ডিগার রকওয়েল। যিনি শুধু নিজের কোম্পানির ওপর আধিপত্য বিস্তার করেন না, পুরো তেলশিল্পের নিয়ন্ত্রকও। সেই সূত্রে আমেরিকা, এমনকি হয়তো পুরো বিশ্বও তার নিয়ন্ত্রণে।

ছবিতে ক্রুজ প্রতিটি সংলাপ এমনভাবে উচ্চারণ করেন যেন বক্তৃতা দিচ্ছেন। তার অভিনয়ে আছে অন্ধ আত্মবিশ্বাস, দাপট এবং এক ধরনের উদ্ধত ‘গুড-অল-বয়’ উচ্ছ্বাস। ফলে ডিগার হয়ে উঠে হাঁটাচলা করা এক কার্টুন চরিত্র। অতিরঞ্জিত আমেরিকান ঔদ্ধত্যের এক বিশাল ব্যঙ্গচিত্র। চরিত্রটিকে মনে হয় সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসন ও কার্টুন চরিত্র ফগহর্ন লেগহর্নের মিশ্রণ।

‘ট্রপিক থান্ডার’ ছবিতে স্থূল শরীরের কৃত্রিম পোশাক পরে অশ্লীল ভাষায় কথা বলা স্টুডিও নির্বাহী লেস গ্রসম্যানের চরিত্রে অভিনয় করেছেন টম ক্রুজ। ‘ডিগার’-এর অভিনয় তারই অনেকটা সম্প্রসারিত রূপ। একসময় ক্রুজ লেস গ্রসম্যানকে নিয়ে আলাদা সিনেমা বানাতে চেয়েছিলেন। এক অর্থে ‘ডিগার’ সেই সিনেমাই—দুই ঘণ্টা ধরে নিজেকে পুরোপুরি ছেড়ে দিয়ে অভিনয় করার সুযোগ। এমন এক অতিনাটকীয় অভিনয়, যা মূলত ‘স্যাটারডে নাইট লাইভ’-এর কোনো ব্যঙ্গাত্মক চরিত্রের মতো, তবে মেথড অ্যাক্টিংয়ের পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে এখানে তা করা হয়েছে।

নিজস্বতার জায়গা থেকে ক্রুজের অভিনয় ভালো এবং দক্ষতার সঙ্গে নির্মিত। তাকে এভাবে বাঁধনহীন অভিনয় করতে দেখা মজারই হওয়ার কথা। কিন্তু লেস গ্রসম্যান ছিল হালকা বিনোদনের একটি চরিত্র। অন্যদিকে ‘ডিগার’-এর পরিচালক আলেহান্দ্রো জি ইনারিতুর মাথায় রয়েছে আরো গুরুতর কিছু বিষয়।

ছবির গল্প খুব বেশি দূরের ভবিষ্যতের নয়। সেখানে ডিগার এমন একটি প্রাসাদে ঘুম থেকে ওঠেন, যেটি চার্লস ফস্টার কেনের ‘জ্যানাডু’র মতোই একাধারে বিলাসবহুল প্রাসাদ ও সুরক্ষিত দুর্গ। সাদা তুলতুলে বিড়ালটিকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ঘুমান। বিড়ালটি মারা যাচ্ছে এবং কোনো এক অদ্ভুত কারণে সেটির ভূমিকায় ব্যবহার করা হয়েছে একটি কৃত্রিম যান্ত্রিক বিড়াল।

ঘুম থেকে উঠেই ডিগার তার এক সহযোগীর কাছ থেকে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো একটি বার্তা পান। আর্কটিকে জ্বালানি তেল অনুসন্ধানের কাজে সমস্যা দেখা দিয়েছে। বরফে মাত্র কয়েক ফুট চওড়া একটি ফাটল তৈরি হয়েছে, কিন্তু সেটি প্রতি মিনিটে বড় হচ্ছে। ডিগার অবশ্য বলে, চিন্তার কিছু নেই। কয়েক দশক ধরে যে নীতিতে কোম্পানি চালিয়েছেন, সেটিই তার বার্তা—‘ড্রিল, বেবি, ড্রিল’ অর্থাৎ খনন করে যাও, পরিণতি নিয়ে ভাবার দরকার নেই।

কিন্তু এবার সেই পরিণতি আর তার কথা শুনছে না। বছরের পর বছর জলবায়ুর ওপর নির্যাতন এবং পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্গম প্রান্তগুলোয়ও বেপরোয়া জ্বালানি তেল অনুসন্ধানের ফলে বিপুল পরিমাণ মিথেন ছড়িয়ে পড়েছে। পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষেত্রে মিথেন এমন এক বিপদ, যার তুলনায় কার্বন ডাই-অক্সাইডকে প্রায় লাফিং গ্যাস বলে মনে হতে পারে। ৪০০ মাইল প্রশস্ত একটি বরফের স্তর হিমবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ইউরোপের দিকে ভাসতে শুরু করে। সেটি মহাদেশটির সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে সুনামি, মহাবিপর্যয় এবং ব্যাপক প্রাণহানি ঘটাতে চলেছে। এবার কি হাসি পাচ্ছে?

পৃথিবী ধ্বংসের কাউন্টডাউনকে সামনে রেখে জলবায়ু পরিবর্তনের ‘ড. স্ট্রেঞ্জলাভ’ হতে চায় ডিগার। একইসঙ্গে এটি জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে ‘নেটওয়ার্ক’ সিনেমার সংস্করণ হতে চায় এবং অ্যাডাম ম্যাককের ব্যঙ্গাত্মক সিনেমা ‘ডোন্ট লুক আপ’-এর তুলনায় পরিস্থিতিকে আরো অনেক বেশি চরম পর্যায়ে নিয়ে যেতে চায়।

একপর্যায়ে ‘ডিগার’ দর্শকদের প্রায় অপরাধবোধে ভোগাতে শুরু করে। সিনেমাটি দর্শকদের এমন এক অবস্থায় দাঁড় করায়, যেখানে তাদের সামনে যেন আর কোনো পথ নেই। ছবির অতিরঞ্জনই যেন বলছে, পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ, আমরা এতটাই বিপর্যয়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছি যে এ সিনেমা দেখেও যদি কেউ এর ‘দূরদর্শী’ বার্তা—এখনই সর্বনাশ ঠেকানোর আহ্বান গ্রহণ না করে, তাহলে সে নিজেই সমস্যার অংশ।

কিন্তু আসল সমস্যা অন্য জায়গায়। ‘ডিগার’ মোটেও হাস্যকর নয়। ছবিটি মুখের ওপর কথা বলা, দুঃসাহসী ও অদ্ভুত। প্রচলিত কাঠামোর বাইরে গিয়ে এটি এক ধরনের বেপরোয়া ভঙ্গিতে এগোয়। অতি অভিনয়ের কারণে ছবিটিকে কমেডি বলেও মনে হয়। যেন খারাপ কোনো কোয়েন ব্রাদার্সের সিনেমার অতিরঞ্জিত অভিনয় চলছে।

কিন্তু পিটার সেলার্সের অসাধারণ অভিনয়কে কেন্দ্র করে তৈরি ‘ড. স্ট্রেঞ্জলাভ’ ছিল দুর্দান্তভাবে মজার। ‘ডিগার’ সেই সিনেমার পৃথিবী ধ্বংসের কাঠামো ধার করেছে, কিন্তু তার সূক্ষ্ম ব্যঙ্গাত্মক বুদ্ধিমত্তা নেয়নি। তার বদলে তৈরি করেছে বিপুল আয়োজনের এক প্রদর্শনী, যেখানে দর্শককে বারবার নিজের বক্তব্য মেনে নিতে চাপ দেয়া হয়।

আলেক্সান্ডার দিনেলারিস, নিকোলাস জিয়াকোবোনে ও সাবিনা বেরমানের সঙ্গে মিলে চিত্রনাট্য লিখেছেন ইনারিতু। সিনেমাটিকে তিনি এক ধরনের বারোক ভিজ্যুয়াল প্রদর্শনী হিসেবে সাজিয়েছেন। প্রতিটি সেটে রয়েছে সূক্ষ্ম নকশা ও বিস্তারিত কাজ। পুরো ছবিতে এমন এক একরঙা আবহ রাখা হয়েছে, যা সাদাকালো সিনেমার একেবারে কাছাকাছি। সিনেমাটি প্রতিটি মুহূর্তে দর্শককে জানিয়ে দিতে চায়—আপনি যে ধরনের সিনেমা সাধারণত দেখেন, এটি তেমন নয়।

তারপরও মনে হয় না ‘ডিগার’ দর্শকদের সঙ্গে খুব সহজে সংযোগ তৈরি করতে পারবে। কারণ সিনেমাটি নিজেকে নিয়ে এতটাই মগ্ন এবং নিজের গুরুত্ব সম্পর্কে এতটাই নিশ্চিত যে সেটি ভারি হয়ে উঠেছে। ছবিটি নির্মাণে সাড়ে ১২ কোটি ডলারের বেশি খরচ হয়েছে। এত বড় বাজেট শুধু সিনেমাটিকে ব্যবসায়িকভাবে সফল হওয়ার কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেনি, বরং নির্মাতাদের আত্মবিশ্বাসের মাত্রাটিও প্রকাশ করে। যেন ধরে নেয়া হয়েছে— এই ভারি ও দীর্ঘ বক্তৃতার মতো সিনেমা দেখতে দর্শক দল বেঁধে প্রেক্ষাগৃহে আসবে।

ছবিটি ডিগার রকওয়েলকে এমনভাবে উপস্থাপন করে, যেন তিনি ‘দেয়ার উইল বি ব্লাড’ ছবির ড্যানিয়েল প্লেইনভিউয়েরই উত্তরসূরি। সেই সিনেমাটিও নিজের বক্তব্যকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়ার কারণে কিছুটা বক্তৃতাধর্মী হয়ে উঠেছিল। যদিও মূল বার্তা ‘পুঁজিবাদ খারাপ’ এক প্রজন্মের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে বেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল। ‘দেয়ার উইল বি ব্লাড’ নিঃসন্দেহে দারুণ মনোযোগ কাড়তে সক্ষম হয়েছিল। ‘ডিগার’ সেখানে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে। এর সঙ্গে রয়েছে এমন এক ব্রেখটীয় মোড়, যা একইসঙ্গে বিস্মিত ও বিভ্রান্ত করে। দর্শকের মনে প্রশ্ন জাগে, ‘সত্যিই কি তারা এটা করছে?’ তারপরই আরেকটি প্রশ্ন আসে, ‘কিন্তু কেন?’

এভাবে বিস্তৃত পরিসরে দর্শককে ধমক দেয়ার মতো করে সিনেমা বানানো আর বুদ্ধিদীপ্ত ব্যঙ্গ এক বিষয় নয়। ক্রুজের পাশাপাশি ‘ডিগার’-এ আছেন জন গুডম্যান। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের চরিত্রে একরৈখিক বিদ্বেষ নিয়ে সবসময় মুখ গোমড়া করে থাকেন। তার চরিত্রটি আবার ‘অ্যাস ক্যানসার’ নামের এক রোগে আক্রান্ত—এটা কি মজার হওয়ার কথা?

সান্দ্রা হুলার অভিনয় করেছেন ডিগারের রাগী সৎবোনের চরিত্রে। তিনি একটি পরিবেশবিষয়ক কোম্পানি চালান। ছবিতে তার চরিত্রের মাধ্যমে বোঝানো হয়, ‘অ্যাক্টিভিজম’ বা পরিবেশবাদী সক্রিয়তাও আসলে এক ধরনের বিভ্রম, যা তেলশিল্প আমাদের হাতে ধরিয়ে দেয়। রিজ আহমেদ অভিনয় করেছেন গণেশ চরিত্রে। ডিগারের ঘনিষ্ঠ বৈজ্ঞানিক পরামর্শক, যে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত। তাই তাকেই ডিগারকে খারাপ খবর জানানোর দায়িত্ব নিতে হয়। একপর্যায়ে তিনিও বিপর্যস্ত ও মাতাল হয়ে পড়েন।

তবে সিনেমায় একটি দৃশ্য আছে, যা দর্শকের রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। এর কারণ একদিকে ক্রুজের অভিনয়, অন্যদিকে দৃশ্যটির বক্তব্য। বিশ্ব যখন বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন ডিগার একটি বৈশ্বিক সমাবেশের সামনে দাঁড়ান। সেটি ভবিষ্যতের জাতিসংঘের মতো দেখতে। সেখানে তিনি ব্যাখ্যা করেন, কেন বিশ্ব এখনো তেলের ওপর নির্ভরশীল।

ডিগারের বক্তব্য হলো, এর কারণ মানুষ নিজেই এমনটা চায়। আমরা সবাই হাজার ধরনের জীবনযাপনের অভ্যাসের সঙ্গে আটকে আছি। শুধু পেট্রলচালিত গাড়ি নয়, এর বাইরেও এমন অসংখ্য জীবনধারা রয়েছে, যেগুলো আমরা আসলে ছাড়তে চাই না। এটি সিনেমার ‘হাওয়ার্ড বিইল’ মুহূর্ত। অন্তত ১০ মিনিটের জন্য ‘ডিগার’ তখন শুধু তেলশিল্প ও ক্ষমতাবানদের দায়ী না করে সমস্যাটির অন্য একটি দিক তুলে ধরে। ক্রুজও সেই বক্তব্য খুব জোরালোভাবে উপস্থাপন করেন।

কিন্তু এরপরই সেই ভাবনা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। সিনেমা আবার ফিরে যায় অভিযুক্ত করার ভঙ্গিতে তৈরি দুর্যোগের অন্ধকার জগতে। আর ছবিটির ফোর্থ ওয়াল ভাঙার বিষয়টি নিয়ে এর বেশি কিছু প্রকাশ করতে চাই না। শুধু এটুকু বলা যায়, অনিচ্ছাকৃতভাবেই সেটি সিনেমাটিকে এমন মনে করায় যে ‘ডিগার’ আসলে আর কিছু নয়, টম ক্রুজ এ চরিত্রে অভিনয় করছেন এবং ইনারিতু তার দাঁড়ানোর জন্য বিশাল এক মঞ্চ তৈরি করেছেন।

এটাই সিনেমাটির বড় ভুল। কারণ এর ফলে একটি বিষয় আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে—জলবায়ু পরিবর্তনের সংকটের সমাধান করা সম্ভব হবে না, যতক্ষণ না আমরা এই সংকটকে নিজেদের নিয়ে আত্মতুষ্টি এবং আত্মপ্রচারের ফাঁপা কথাবার্তা থেকে আলাদা করতে পারছি।

ভ্যারাইটিতে প্রকাশিত ওয়েন গ্লাইবারম্যানের রিভিউ অবলম্বনে

আরও