উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। এর প্রভাবে মার্কিন শহর নিউ অরলিন্স চলতি শতকেই সমুদ্রবেষ্টিত হয়ে পড়তে পারে। নতুন এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি এড়াতে এখনই বাসিন্দাদের অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার কাজ শুরু করা প্রয়োজন।
গবেষণাপত্রটির উপসংহার উদ্বেগজনক হলেও নিউ অরলিন্স নিয়ে এ আশঙ্কা পুরোপুরি নতুন নয়। উপকূলীয় লুইজিয়ানা বিশ্বের সবচেয়ে নিচু অঞ্চলগুলোর একটি। এখানে প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার মানুষের শহর নিউ অরলিন্স বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। একটি বাটির মতো অববাহিকায় অবস্থিত শহরটি। এর বেশির ভাগ এলাকাইই সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে এবং দ্রুত সংকুচিত হয়ে যাওয়া একটি বদ্বীপের মাঝখানে অবস্থিত।
শহরটি প্রায় পুরোপুরি জলাভূমি দিয়ে ঘেরা, যা ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক সুরক্ষা দেয়। কিন্তু উন্নয়নকাজের জন্য জলাভূমি শুকিয়ে ফেলা, জ্বালানি তেল ও গ্যাস শিল্পের জন্য খাল খনন এবং নদীর তীরে বাঁধ নির্মাণের ফলে এসব এলাকা দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে নতুন পলি জমা বন্ধ হয়ে স্থানগুলো ডুবে যাচ্ছে। ১৯৩০-এর দশক থেকে লুইজিয়ানা প্রায় ২ হাজার বর্গমাইল জলাভূমি হারিয়েছে।
চলতি মাসে নেচার সাসটেইনেবিলিটি সাময়িকী প্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উপকূলীয় লুইজিয়ানায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ১০-২৩ ফুট পর্যন্ত বাড়তে পারে। ফলে হারিয়ে যেতে পারে অবশিষ্ট জলাভূমির প্রায় ৭৫ শতাংশ। উপকূলরেখা সর্বোচ্চ ৬২ মাইল পর্যন্ত সরে আসতে পারে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।
আরো বলাহচ্ছে, অঞ্চলটি স্বাভাবিক অবস্থায় ‘ফিরে আসার সীমা অতিক্রম করেছে’ এবং চলতি শতাব্দী শেষ হওয়ার আগেই ‘মেক্সিকো উপসাগরে বেষ্টিত’ হয়ে যেতে পারে নিউ অরলিন্স।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি শুধু নিউ অরলিন্স নয় নিউইয়র্ক, লন্ডন, ব্যাংকক ও সাংহাইসহ বিশ্বের বহু উপকূলীয় শহরের জন্য হুমকি। জলবায়ু গবেষণা সংস্থা ক্লাইমেট সেন্ট্রালের প্রধান নির্বাহী ও প্রধান বিজ্ঞানী বেনজামিন স্ট্রাউস বলেন, ‘মূল প্রশ্ন হলো এ ভবিষ্যৎ কত দ্রুত আসবে এবং কীভাবে তা বাস্তবে রূপ নেবে।’
লুইজিয়ানার ভবিষ্যৎ বোঝার জন্য গবেষকরা অতীত বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষণার এক লেখক নিউ অরলিন্সের প্রায় ৩০ মাইল উত্তরে একটি প্রাচীন উপকূলরেখা শনাক্ত করেন, যা প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার বছর আগে তৈরি হয়েছিল। তখন পৃথিবীর তাপমাত্রা বর্তমানের মতো ছিল, কিন্তু সমুদ্রের উচ্চতা অন্তত ১০ ফুট বেশি ছিল।
গবেষণার লেখক ও তুলেন ইউনিভার্সিটির ভূতত্ত্বের অধ্যাপক টর্বিয়র্ন টোর্নকভিস্ট বলেন, ‘ভবিষ্যতে সমুদ্রপৃষ্ঠ ওই উচ্চতায় পৌঁছানোর আশঙ্কা খুবই বেশি।’ এখন প্রশ্ন হলো, কী করা উচিত এবং কখন।
লুইজিয়ানার উপকূলীয় অঞ্চলে থেকে এরই মধ্যে চলে যেতে শুরু করেছেন অনেক বাসিন্দা। বহু দশক ধরেই এ স্থানান্তর চলছে বলে জানিয়েছেন গবেষণার আরেক লেখক ও ইয়েল স্কুল অব দ্য এনভায়রনমেন্টের নগর টেকসই উন্নয়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ব্রায়ানা কাস্ত্রো।
গবেষণাপত্রের লেখকদের মতে, পরিকল্পিত পুনর্বাসন না হলে পরিস্থিতি বিশৃঙ্খল হয়ে উঠবে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে। জনসংখ্যা কমতে থাকলে বিদ্যমান বৈষম্য আরো গভীর হবে বলে মন্তব্য করেন টর্নকভিস্ট। করভিত্তি কমে যাবে, সরকারি সেবার মান খারাপ হবে, উড়োজাহাজ খরচ আকাশছোঁয়া হবে এবং বাড়িঘরের মূল্য পড়ে যাবে
২০০৫ সালের ভয়াবহ হারিকেন ক্যাটরিনার পর নিউ অরলিন্স জনসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশ হারিয়েছে। ওই ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছিলেন। কাস্ত্রোর ভাষায়, প্রতিটি বড় ঝড় বা বন্যার পরই এই জনপলায়নের ঢেউ বেড়ে যায়।
ধারণা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে শহরটিকে আরো কঠিন ঝড় মোকাবিলা করতে হবে। সাম্প্রতিক এক গবেষণা অনুযায়ী, নিউ অরলিন্সের প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষ উচ্চ বন্যাঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। ওই গবেষণার লেখক ও ইউনিভার্সিটি অব আলাবামার ভূগোল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ওয়ানুন শাও বলেন, ‘ক্যাটরিনার মতো আরেকটি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানলে প্রায় সবাই বন্যাজনিত ক্ষতির মুখে পড়বে।’
গবেষণাপত্রের লেখকদের মতে, পরিকল্পিত পুনর্বাসন না হলে পরিস্থিতি বিশৃঙ্খল হয়ে উঠবে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে। জনসংখ্যা কমতে থাকলে বিদ্যমান বৈষম্য আরো গভীর হবে বলে মন্তব্য করেন টর্নকভিস্ট। করভিত্তি কমে যাবে, সরকারি সেবার মান খারাপ হবে, উড়োজাহাজ খরচ আকাশছোঁয়া হবে এবং বাড়িঘরের মূল্য পড়ে যাবে।
মানুষ হয়তো থেকে গিয়ে নিজেদের মতো করে অভিযোজনের চেষ্টা করবে। কিন্তু বন্যা প্রতিরোধে যত বেশি অর্থ ব্যয় করবে, ভবিষ্যতে স্থানান্তরের জন্য তাদের হাতে তত কম সম্পদ থাকবে বলে মন্তব্য করেন কাস্ত্রো।
অবশ্য এ ধরনের পরিস্থিতিতে পুনর্বাসনের নজিরও রয়েছে। লৌহ আকরিক খনির কারণে গড়ে উঠেছিল সুইডেনের শহর কিরুনা। কিন্তু ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছে সেই শহর। কারণ খনির বিস্তার ঘটার সঙ্গে সঙ্গে ভবনে ফাটল দেখা দেয়, কিছু ভবন ধসেও পড়ে।
বিশেষ ট্রফির মাধ্যমে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে কিরুনার গির্জা। ছবি: রয়টার্স
২০০৪ সালে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কিরুনাকে কয়েক দশক ধরে ধাপে ধাপে স্থানান্তর করা হচ্ছে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে সেই কাজ শেষ হওয়ার কথা। ২০২৫ সালে শহরের শত বছরেরও বেশি পুরোনো গির্জাটিকে বিশেষ ট্রলির মাধ্যমে নতুন স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়।
কাস্ত্রো আশাবাদী যে নিরাপদ স্থানে ‘নিউ অরলিন্স ২.০’ গড়ে তুললেও শহরের সংস্কৃতি হারাবে না। তার ভাষায়, ‘একটি চমৎকার শহর গড়ে তুলতে পারলে মানুষ আসবেই। নিউ অরলিন্সের আত্মাকে হারাতে হবে না।’
তবে সবাই এতটা আশাবাদী নন। নিউ অরলিন্সে আট প্রজন্ম ধরে বসবাসকারী ডিপ সাউথ সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট জাস্টিসের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক রেভারলি রাইট মনে করেন, পুনর্বাসন শহরটির সামাজিক বন্ধন ভেঙে দিতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিকে অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে দেখেন তিনি। কিন্তু পুনর্বাসন বাস্তবে কীভাবে হবে, তা নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগে আছেন।
তার ভাষায়, ‘প্রতিষ্ঠানগুলো কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের প্রতি সংবেদনশীল হবে, এমন আশা আমার নেই। ক্যাটরিনার পর আমাদের সঙ্গে কী করা হয়েছিল, আমি তা দেখেছি।’
তার আশঙ্কা, ভূমি হারালে বহু প্রজন্মের কৃষ্ণাঙ্গ মানুষকে ‘শূন্য থেকে আবার শুরু করতে হবে।’
টর্নকভিস্ট স্বীকার করেন, এখন পর্যন্ত নীতিনির্ধারকদের মধ্যে পুনর্বাসন নিয়ে বাস্তব আলোচনা শুরু করার বড় ধরনের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না।
তবে সবাই এতটা আশাবাদী নন। নিউ অরলিন্সে আট প্রজন্ম ধরে বসবাসকারী ডিপ সাউথ সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট জাস্টিসের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক রেভারলি রাইট মনে করেন, পুনর্বাসন শহরটির সামাজিক বন্ধন ভেঙে দিতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিকে অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে দেখেন তিনি। কিন্তু পুনর্বাসন বাস্তবে কীভাবে হবে, তা নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগে আছেন
অঞ্চলটিকে আরো কিছু সময় টিকিয়ে রাখার উদ্যোগ অবশ্য নেয়া হয়েছিল। ২০২৩ সালের আগস্টে জলাভূমিতে পলি ফিরিয়ে এনে দক্ষিণ লুইজিয়ানাকে ঝড় ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হাত থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে বড় একটি পলি-বণ্টন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়।
কিন্তু ২০২৫ সালে লুইজিয়ানার রিপাবলিকান গভর্নর জেফ লান্ড্রি উচ্চ ব্যয় ও মৎস্যসম্পদের ক্ষতির আশঙ্কা দেখিয়ে প্রকল্পটি বাতিল করেন। গবেষণাপত্রের লেখকদের মতে, এ সিদ্ধান্ত কার্যত ‘উপকূলীয় লুইজিয়ানার বিস্তীর্ণ অংশ, এমনকি নিউ অরলিন্স অঞ্চলকেও ছেড়ে দেয়ার’ সমান।
টর্নকভিস্ট ও কাস্ত্রো জোর দিয়ে বলেন, তাদের গবেষণা পুরোপুরি হতাশাব্যঞ্জক নয়। পরিকল্পিত পুনর্বাসন বিশ্বকে পথ দেখাতে পারে নিউ অরলিন্স। শহরটি নেতৃত্ব দিতে পারে টেকসই উন্নয়ন ও উপকূল পুনরুদ্ধারে।
সিএনএন অবলম্বনে