বুনোফুলের চাদরে ঢেকে গেছে পৃথিবীর শুষ্কতম মরুভূমি

শীত থেকে বসন্তে রূপান্তরের সময় এ মরুভূমিতে ফুল ফোটা অস্বাভাবিক নয়। তবে এ বছর আতাকামার সাধারণত পাথুরে ও বাদামি বালিয়াড়ি রূপ বদলে বিশাল রঙিন বুনোফুলের চাদরে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়ভাবে এ ঘটনাকে ‘দেসিয়ের্তো ফ্লোরিদো’ বা ‘ফুলেল মরুভূমি’ বলা হয়..

দক্ষিণ গোলার্ধে বসন্ত এসেছে। রঙিন বুনোফুলে ছেয়ে গেছে চিলির আতাকামা মরুভূমি। পৃথিবীর সবচেয়ে শুষ্ক মরুভূমি হিসেবে পরিচিত এ অঞ্চলের বিশাল অংশে এ বছর লাখ লাখ ফুল ফুটেছে। খবর এপি।

চলতি বছরের শুরুর দিকে এল নিনোর প্রভাবে ভারী বৃষ্টিপাত দেখেছে আতাকামা। সেই বৃষ্টির পানিতে মরুভূমির মাটিতে থাকা লাখ লাখ বীজ ও কন্দ অঙ্কুরিত হয়ে ফুলে পরিণত হয়েছে। এসবের অনেকগুলো কয়েক দশক ধরে সুপ্ত অবস্থায় ছিল।

চিলির ন্যাশনাল ফরেস্ট করপোরেশনের (কনাফ) সংরক্ষিত এলাকা বিভাগের প্রধান হোর্হে কারাবান্তেস বলেন, এটি অনন্য ঘটনা। এখানে দুই শতাধিক প্রজাতির উদ্ভিদ দেখা যাচ্ছে। বিশ্বের অন্যত্র দেখা ফুল ফোটার ঘটনাগুলোর তুলনায় এ ঘটনা অস্বাভাবিক ও ব্যতিক্রমী।

প্রশান্ত মহাসাগর ও আন্দিজ পর্বতমালার মাঝখানে অবস্থিত আতাকামা মরুভূমি। চিলির উত্তর উপকূল ধরে এটি প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার বিস্তৃত। শীত থেকে বসন্তে রূপান্তরের সময় এ মরুভূমিতে ফুল ফোটা অস্বাভাবিক নয়। তবে এ বছর আতাকামার সাধারণত পাথুরে ও বাদামি বালিয়াড়ি রূপ বদলে বিশাল রঙিন বুনোফুলের চাদরে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়ভাবে এ ঘটনাকে ‘দেসিয়ের্তো ফ্লোরিদো’ বা ‘ফুলেল মরুভূমি’ বলা হয়।

অস্ট্রেলিয়ায় বেড়ে ওঠা চিলির নাগরিক ৫১ বছর বয়সী ফেলিক্স বান্দা প্রথমবার আতাকামা দেখতে এসে তার ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতার কথা জানালেন। তিনি বলেন, মরুভূমি বলতে সবসময় বাদামি রঙের বালুকাময় কোনো অঞ্চলের কথা ভাবতাম। প্রচুর বৃষ্টি হওয়ায় কিছু সবুজ দেখতে পাব বলে আশা করেছিলাম। কিন্তু এখন এখানকার দৃশ্য অবিশ্বাস্য।

রেকর্ড বৃষ্টিতে বদলে গেছে মরুভূমির চেহারা

চলতি বছরের জুলাই-আগস্টে চিলির কয়েকটি অঞ্চলে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে। ১৯৫০-এর দশকে বৃষ্টিপাতের পরিমাপ শুরুর পর কিছু এলাকায় এবারই সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড হয়েছে।

আতাকামা কনাফের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ বিভাগের প্রধান জীববিজ্ঞানী সেসার পিসারো বলেন, কোনো কোনো এলাকায় ১৬০, ১৮০ এমনকি ১৯০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে। এর পেছনে ‘সুপার এল নিনো’র প্রভাব রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

চিলির বিভিন্ন অঞ্চলে এবার ঝড় ও ভারী বৃষ্টিতে বন্যা ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দেশটির উত্তরে ঝরা এ বৃষ্টিই ঐতিহাসিক মরুভূমিতে ফুল ফোটার ঘটনা ঘটিয়েছে। এ বছর প্রায় ১৭ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় ফুলের বিস্তার ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আয়তনের দিক থেকে এটি চিলির সবচেয়ে বড় ও জনবহুল অঞ্চল সান্তিয়াগো মেট্রোপলিটন অঞ্চলের কাছাকাছি।

কনাফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পর এবারই সবচেয়ে তীব্র ও বিস্তৃত ‘দেসিয়ের্তো ফ্লোরিদো’ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পিসারো বলেন, ভারী বৃষ্টিপাত মরুভূমির মাটিতে থাকা জৈব উপাদান বা ‘জার্মপ্লাজম’ সক্রিয় করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বীজ, কন্দ ও বিভিন্ন ধরনের ভূগর্ভস্থ উদ্ভিদাংশ এবং বিভিন্ন অমেরুদণ্ডী প্রাণী ও সরীসৃপের ডিম।

ফলশ্রুতিতে আতাকামায় ২০০টিরও বেশি প্রজাতির উদ্ভিদ ও ফুলের এক অনন্য দৃশ্য তৈরি হয়েছে। লাল ও হলুদ নানুকা, বেগুনি রক পার্সলেন, সাদা সুসপিরোস, কমলা টেরসিওপেলোস এবং মরুভূমির অন্যতম পরিচিত স্থানীয় উদ্ভিদ ‘গাররা দে লেওন’—বিভিন্ন রঙ ও আকৃতির এসব ফুল মরুভূমির পাহাড়, সমতলভূমি ও গিরিখাত ঢেকে ফেলেছে।

পিসারো বলেন, এ অঞ্চলে এমন কিছু পাহাড় ও পর্বতমালা রয়েছে যেখানে ৩০ থেকে ৪০ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে কোনো সবুজ উদ্ভিদ বা ফুল দেখা যায়নি। মরুভূমির এই জৈব উপাদান বহু বছর, এমনকি কয়েক দশকও সুপ্ত থাকতে পারে। এ বছরের ফুলে ভরা পাহাড়গুলো তারই সবচেয়ে ভালো উদাহরণ।

পর্যটকের আনাগোনা বাড়ছে

বুনোফুলের চাদরে ডেকে থাকা আতাকামা দেখতে এর দুর্গম ও প্রতিকূল এলাকাগুলোয় ছুটছেন চিলির বিভিন্ন অঞ্চল এবং বিদেশ থেকে পর্যটকরা। বিশাল মরুভূমিজুড়ে ছড়িয়ে থাকা লাখ লাখ ফুল দেখতে তারা এলাকাগুলো ঘুরে দেখছেন।

চিলির জাতীয় পর্যটন সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রাকৃতিক এ ঘটনা নভেম্বরে শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত আতাকামা অঞ্চলে প্রায় ৩ লাখ পর্যটকের আগমণ হতে পারে। ফলে এ মৌসুমে ‘দেসিয়ের্তো ফ্লোরিদো’ অঞ্চলটির অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।

আরও