পাবলো নেরুদা— কবিতায় প্রেম, জীবনে অন্ধকার

কূটনৈতিক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে এক নারী গৃহকর্মীর ওপর যৌন সহিংসতার ঘটনা বর্ণনা করেন। পরবর্তী সময়ে তার নিজের এই বর্ণনাই যৌন নির্যাতন হিসেবে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। এখানেই নেরুদাকে নিয়ে সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি ফিরে আসে— যে কবি প্রেমকে এত সুন্দর করে লিখেছেন, ব্যক্তিগত জীবনে তিনি নারীদের কীভাবে দেখতেন?

১৯৩০-এর দশকে কূটনীতিক হিসেবে স্পেনে থাকার সময় তিনি প্রত্যক্ষ করেন গৃহযুদ্ধ, ফ্যাসিবাদ ও অনিবার্য ধ্বংস। কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার হত্যাও তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। স্পেনের অভিজ্ঞতার পর তার কবিতা ব্যক্তিগত প্রেমের ঘর থেকে বেরিয়ে রাজনীতি ও ইতিহাসের দিকে হাঁটতে শুরু করে। জন্ম নেয় 'España en el corazón'। নেরুদা তখন আর শুধু প্রেমের কবি নন। তিনি হয়ে উঠছেন একটি মহাদেশের কণ্ঠস্বর

২৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৩। মাত্র ১২ দিন আগে চিলির ক্ষমতা দখল করেছে সামরিক জান্তা। এ কয়টা দিনে কতকিছু ঘটে গেছে। প্রেসিডেন্ট সালভাদর আয়েন্দে মৃত। গ্রেফতার হচ্ছে বামপন্থীরা। আর রাজধানী সান্তিয়াগোর এক হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত কবিদের অন্যতম পাবলো নেরুদা। এদিন ৬৯ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান তিনি। সরকারি ব্যাখ্যা ছিল। ক্যানসারের কারণে মৃত্যু। কিন্তু কয়েক দশক পর তার কবর খোঁড়া হলো। মরদেহ পরীক্ষা করা হলো। পাওয়া গেল এমন কিছু ফরেনসিক প্রমাণ যা পুরোনো ব্যাখ্যাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাল। সত্যিই কি তার মৃত্যুর কারণ ক্যান্সার ছিল, নাকি অন্যকিছু?

১৯৩০-এর দশকে কূটনীতিক হিসেবে স্পেনে থাকার সময় তিনি প্রত্যক্ষ করেন গৃহযুদ্ধ, ফ্যাসিবাদ ও অনিবার্য ধ্বংস। কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার হত্যাও তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। স্পেনের অভিজ্ঞতার পর তার কবিতা ব্যক্তিগত প্রেমের ঘর থেকে বেরিয়ে রাজনীতি ও ইতিহাসের দিকে হাঁটতে শুরু করে। জন্ম নেয় 'España en el corazón'। নেরুদা তখন আর শুধু প্রেমের কবি নন। তিনি হয়ে উঠছেন একটি মহাদেশের কণ্ঠস্বর।

১৯৪৫ সালে নেরুদা চিলির সিনেটর হন এবং কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। রাজনৈতিক নিপীড়নের কারণে তাকে আত্মগোপনে যেতে হয়, পরে গোপনে চিলি ছাড়েন। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নেরও প্রকাশ্য সমর্থক ছিলেন এবং ১৯৫৩ সালে পান ‘স্টালিন শান্তি পুরস্কার’— এখানেই আসে তার জীবনের একটি বড় অন্তর্দ্বন্দ। যে কবি নিপীড়িত মানুষের স্বাধীনতার পক্ষে লিখেছেন, তিনিই এমন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমর্থক ছিলেন, যার নিজের দমন-পীড়নের ইতিহাস ছিল।

সাল ১৯৭১, পেলেন সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার। এর ঠিক দুই বছর পর, নেরুদা আক্রান্ত হন ক্যান্সারে। কয়েক দিনের মধ্যেই তাকে সান্তিয়াগোর হাসপাতালে নেয়া হয়। দেশজুড়ে শুরু হয়েছে দমন-পীড়ন। মেক্সিকো যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু তার আগেই জীবনের কাছে হেরে যান তিনি।

২৩ সেপ্টেম্বর। নেরুদার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াও নিছক ব্যক্তিগত শোকের অনুষ্ঠান হয়ে থাকেনি। সামরিক শাসনের কঠোর নজরদারির মধ্যেও মানুষ তার শেষযাত্রায় জড়ো হয়। নেরুদার মৃত্যু তখন হয়ে ওঠে নতুন শাসনের বিরুদ্ধে এক নীরব রাজনৈতিক প্রতীক। তারপর শুরু হয় তার দ্বিতীয় জীবন— মৃত নেরুদার জীবন।

২০১১ সালে নেরুদার সাবেক গাড়িচালক ম্যানুয়েল আরায়া দাবি করেন, হাসপাতালে নেরুদাকে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল। ২০১৩ সালে তার মরদেহ কবর থেকে তোলা হয়। প্রথম পরীক্ষায় বিষপ্রয়োগের নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পরে তার দেহাবশেষে ক্লস্ট্রিডিয়াম বটুলিনাম ব্যাকটেরিয়ার চিহ্ন পাওয়া যায়। তবে ব্যাকটেরিয়া পাওয়া মানেই যে ইচ্ছাকৃতভাবে বিষ দেয়া হয়েছিল, এমন সিদ্ধান্তে তদন্তকারীরা পৌঁছাননি। কেটে যায় অনেকগুলো বছর। শেষ ২০২৪ সালে চিলির আপিল আদালত আবার তদন্ত চালানোর নির্দেশ দেয় এবং আরো পরীক্ষা ও প্রমাণ যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা জানায়। কিন্তু নেরুদার মৃত্যুর রহস্য কোনদিন জানা যায়নি।

নেরুদাকে নিয়ে বিতর্ক শুধু রাজনীতি কিংবা মৃত্যুতে থেমে নেই। 'Memoir I Confess That I Have Lived'-এ তিনি ১৯২৯ সালে তৎকালীন সিলন (বর্তমান শ্রীলংকা)-এ কূটনৈতিক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে এক নারী গৃহকর্মীর ওপর যৌন সহিংসতার ঘটনা বর্ণনা করেন। পরবর্তী সময়ে তার নিজের এই বর্ণনাই যৌন নির্যাতন হিসেবে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। এখানেই নেরুদাকে নিয়ে সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি ফিরে আসে—যে কবি প্রেমকে এত সুন্দর করে লিখেছেন, ব্যক্তিগত জীবনে তিনি নারীদের কীভাবে দেখতেন?

তিনি 'Twenty Love Poems'-এ প্রেমের শরীর লিখেছেন। 'Canto General'-এ একটি মহাদেশের ইতিহাসকে কবিতায় ধরতে চেয়েছেন। কমিউনিজমে বিশ্বাস করেছেন, স্ট্যালিনের প্রশংসা করেছেন, এ্যলেন্ডের পাশে দাঁড়িয়েছেন। আবার নিজের 'memoir'-এই এমন একটি ঘটনার বর্ণনা রেখে গেছেন, যা আজ তার বিরুদ্ধে গুরুতর নৈতিক প্রশ্ন তোলে। শেষ পর্যন্ত তার জীবন তাই শুধু একজন মহান কবির জীবন নয়।এটি একজন মানুষের গল্প-যিনি একই সঙ্গে সুন্দর এবং অস্বস্তিকর, মহৎ এবং পরস্পরবিরোধী।

পাবলো নেরুদার মৃত্যুদিবসে আজ তার দুটো কবিতার লাইন মনে করিয়ে দিতে চাই—

Tonight I can write the saddest lines.
I loved her, and sometimes she loved me too.
Through nights like this one I held her in my arms.
I kissed her again and again under the endless sky.

আরও