বায়ান্নর পর ভাষার দাবিতে রাজপথে নেমেছিল যেসব দেশ

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ গুলি চালিয়েছিল। রাষ্ট্রভাষা বাংলাকে স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছিল শিক্ষার্থীরা। ওইদিন রক্তাক্ত হয়ে রাজপথে লুটিয়ে পড়েন আবুল বরকত, আব্দুস সালাম, রফিক, শফিক ও আব্দুল জব্বারসহ আরো অনেকে। পরবর্তী-সময়ে তাদের আমরা শনাক্ত করেছি ভাষাশহীদ হিসেবে। শুধু ভাষার প্রসঙ্গে একটি সাংবিধানিক দাবি সেদিন রূপ নেয় নৈতিক অভিঘাতে। বায়ান্নতে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের ভেতর এক গভীর ফাটল সৃষ্টি হয়, সেটিও ভাষার প্রশ্নে। বিষয়টি কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ ভাষা কেবল নীতিনির্ধারণের বিষয় নয়। ভাষা আত্মপরিচয় ও অস্তিত্বের প্রশ্নও বটে।

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের আরো অনেকদিন পর অর্থাৎ ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সরকার বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের নানা প্রচেষ্টার ফলে ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালে এ দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। জাতিসংঘের এ সংস্থা ওই বছরই জানায়, প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারিকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ভাষার অধিকার রক্ষার স্মৃতিস্মারক হিসেবে উদযাপন করা হবে। সেই ধারাবাহিকতায় ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, নেপাল, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের আরো অনেক দেশে আজকের দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে নানা কর্মপরিকল্পনা থাকে। যেহেতু ভাষাকে ঠিক আবদ্ধ করা যায় না, সেহেতু ভাষার প্রশ্নে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তেই দেখা গেছে সংগ্রাম। শুধু এ ভূখণ্ডেই নয়। বায়ান্নর পর বিগত কয়েক দশকে বহু দেশেই ভাষা বিষয়ক জটিলতা নিয়ে সংকট দেখা দিয়েছে। কোনো কোনো দেশে ভাষার প্রশ্নে সংঘাত রক্তক্ষয়ী সহিংসতার রূপ নিয়েছে, আবার কোথাও রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্গঠিত হয়েছে। অথবা কোথাও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয়েছে। সে দেশগুলো কোনগুলো? দেখে নেয়া যাক।

শ্রীলংকা

প্রথমেই আলোচনায় আসে দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্র শ্রীলংকা। ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে যখন স্বাধীনতা অর্জন করে তখন ভূখণ্ডটি পরিচিত ছিল সিলন বলে। পরবর্তী সময়ে ১৯৭২ সালে সিলন নামটি পালটে রাখা হয় শ্রীলংকা। ভূখণ্ডটিতে সিনহালা ভাষাভাষী গোষ্ঠীই সংখ্যাগরিষ্ঠ। অথচ স্বাধীনতার বহু আগে থেকেই ব্রিটিশ শাসনের অধীনে জনপ্রশাসন ও রাষ্ট্র পরিচালনার একটি বড় অংশ দখল করে রেখেছিল সংখ্যালঘু তামিল ভাষাগোষ্ঠী। স্বাধীনতা অর্জনের পরও রাষ্ট্রকাঠামোতে এ অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। তাতে বেড়েছিল অসন্তোষ। সে অসন্তোষ ১৯৫৬ সালে দেশটিতে রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে ওঠে। এমন এক সময়ে আন্দোলন গড়ে ওঠে যখন সিলনে সংসদীয় নির্বাচন আয়োজনের তোরজোর চলছে। এমন এক সময়ে সিলনের বিরোধী জোটের গুরুত্বপূর্ণ নেতা এসডব্লিউআরডি বান্দারানায়কে ‘সিনহালা অনলি ইন টুয়েন্টি ফোর আওয়ার্স’ স্লোগানে নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে শুরু করেন। এভাবে বিপুল জনসমর্থনও আদায় করে ক্ষমতায় আসেন। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েই তিনি ‘অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাক্ট নাম্বার ৩৩’ পাস করেন, যা ‘সিনহালা অনলি অ্যাক্ট’ নামে পরিচিত। এ আইনে সিনহালা ভাষাকেই শ্রীলংকার একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ ওই সময় থেকে সরকারি চাকরি, প্রশাসনিক পরীক্ষা, আদালত ও রাষ্ট্রীয় যেকোনো কাজে সিনহালা ভাষা ব্যবহারই বাধ্যতামূলক। ওই সময় শ্রীলংকায় অবস্থানরত প্রায় ২০ শতাংশ তামিল জনগোষ্ঠীর জন্য এ সিদ্ধান্ত ছিল বড় ধাক্কা।

এরপর তামিল নেতা এসজেভি চেলভানায়াকম এর নেতৃত্বে ‘ইলঙ্কাই তামিল আরাসু কাচ্চি’ (ফেডারেল পার্টি) শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন কর্মসূচি শুরু করে। ১৯৫৬ সালের জুন মাসে কলম্বোতে তামিল প্রতিবাদকারীদের ওপর সিনহালা জনতা আক্রমণ করে যা ছিল দেশটির ইতিহাসে স্বাধীনতার পর প্রথম বড় জাতিগত দাঙ্গা। আন্দোলন চলাকালীন অবস্থায় ১৯৫৭ সালে বান্দারানায়েকে ও চেলভানায়াকমের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে তামিল ভাষাকে আঞ্চলিকভাবে স্বীকৃতি দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু সিনহালা জাতীয়তাবাদীদের চাপে ১৯৫৮ সালে এ চুক্তি বাতিল করা হয়। একই বছরে ভয়াবহ এক দাঙ্গায় শত শত তামিল নিহত হন। এরও পরে ১৯৮৭ সালে ‘ইন্দো লংকা অ্যাকর্ড’ এর মাধ্যমে তামিল ভাষা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়।

ভারত

১৯৫০ সালে গৃহীত ভারতের সংবিধানের ধারা ৩৪৩ অনুযায়ী হিন্দিকে (দেবনাগরী লিপিতে) কেন্দ্রের সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সঙ্গে এও উল্লেখ করা হয় যে সরকারি ভাষা হিসেবে ইংরেজি আরো ১৫ বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। মূল উদ্দেশ্য ছিল, হিন্দিকে ধীরে ধীরে ইংরেজির স্থলাভিষিক্ত করা। ১৯৬৫ সালের মধ্যে হিন্দিই হবে ভারতের রাষ্ট্রীয় ভাষা। কিন্তু ভারতের দক্ষিণের রাজ্যগুলো, বিশেষত মাদ্রাজ স্টেট (যার নাম ১৯৬৯ সালে পরিবর্তিত হয়ে তামিলনাড়ু হয়), হিন্দির এ আধিপত্যকে ভয় পেয়েছিল। তামিল বুদ্ধিজীবীরা এটিকে হিন্দিভাষী উত্তর ভারতের সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের প্রয়াস হিসেবে দেখেছেন। তারা বিশ্বাস করতেন, ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; তা হলো সংস্কৃতি, স্বাতন্ত্র্য, এবং রাজনৈতিক প্রভাবের প্রতীক।

১৯৬৫ সালের ২৬ জানুয়ারি তামিলনাড়ুজুড়ে তাই ছাত্রবিক্ষোভ শুরু হয়। সহিংস সংঘর্ষ, আত্মদাহের চেষ্টাসহ পুলিশি নির্যাতন, সড়ক অবরোধ—ভাষার অধিকার আদায়ের প্রশ্নে এ সবই ঘটতে থাকে। একই বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসের দাঙ্গায় অন্তত ৬০ থেকে ৭০ জন প্রাণ হারায়। এরপর তামিলনাড়ুতে ভাষার দাবি রাজনৈতিক রূপ নেয়। পরবর্তী সময়ে এ ভাষা আন্দোলনের প্রভাব পড়ে ১৯৬৭ সালে তামিলনাড়ুর বিধানসভা ও লোকসভার নির্বাচনে। ওই সময় দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝগম ও সিএন আন্নাদুরাইয়ের নেতৃত্বে কংগ্রেসের প্রভাব তামিলনাড়ুতে শেষ হয়ে যায়। এরপর কেন্দ্রীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদূর শাস্ত্রী এবং পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাধ্য হয়ে অ-হিন্দিভাষী রাজ্যগুলোকে আশ্বস্ত করেন যে হিন্দিকে জোর করে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়া হবে না। ১৯৬৭ সালের কেন্দ্রীয় সরকারি ভাষা (সংশোধনী) আইন অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় কাজে হিন্দির পাশাপাশি ইংরেজির অনির্দিষ্টকালীন ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়। এতে ভারতের অন্য ভাষাভাষী গোষ্ঠীর ওপর হিন্দি আর রাজনৈতিক প্রভাব খাটাতে পারেনি।

বেলজিয়াম

বেলজিয়ামের ভাষাগত সংঘাত ১৯৫২ সালের আগের সময় থেকেই ছিল। তবে ভাষা আন্দোলনের কাঠামোগত রূপান্তর ঘটে বায়ান্নর পর। ফ্রেঞ্চ উপনিবেশের অধীনে থাকায় বেলজিয়ামে ফরাসি ভাষা প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা এবং উচ্চবিত্ত সংস্কৃতি উনিশ শতক থেকেই প্রাধান্য বজায় রেখেছিল। অথচ ফ্ল্যান্ডার্সে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী ডাচ (ফ্লেমিশ) ভাষাভাষী ছিল।

১৯৬২-৬৩ সালে আইন প্রণয়ন করে ভাষাকে সীমাবদ্ধ করা হয় এবং ভাষাকে কেন্দ্র করে বেলজিয়ামকে চারটি অঞ্চলে ভাগ করা হয়। সেগুলো হলো: ডাচভাষী ফ্ল্যান্ডার্স, ফরাসিভাষী ওয়ালোনিয়া, দ্বিভাষিক ব্রাসেলস-রাজধানী অঞ্চল এবং একটি ছোট জার্মানভাষী এলাকা। এ আইন দেশের ভাষাগত বিভাজনকে আনুষ্ঠানিক কাঠামো দেয়। ১৯৬৮ সালে ‘ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব লুভেন’ একটি উত্তপ্ত কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ফ্ল্যান্ডার্সে ফরাসি-ভাষাতেই পাঠদানের প্রতিবাদে ফ্লেমিশ আন্দোলনকারীরা ‘লুভেন ফ্লেমিশ’ নামে আন্দোলনের স্লোগান তোলেন। সহিংস বিক্ষোভের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়কে দুটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানে বিভক্ত করতে হয়। একটি ‘কু লুভেন’ এবং অন্যটি ‘ইউনিভারসাইত ক্যাথলিক দে লুভেন (যা ওয়ালোনিয়ায় স্থানান্তরিত হয়)। ফলে ১৯৭০ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত ধারাবাহিক সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে বেলজিয়াম একক রাষ্ট্র থেকে ভাষাভিত্তিক ফেডারেল রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়। রাজনৈতিক দলগুলোও ভাষাকে কেন্দ্র করেই বিভক্ত হয়।

স্পেন

ফ্রান্সিস্কো ফ্রাঙ্কোর দমনাত্মক শাসনকাল (১৯৩৯-১৯৭৫) চলাকালে স্পেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কাতালান, বাস্ক এবং গ্যালিসিয়ানের মতো আঞ্চলিক ভাষাগুলোকে জনপ্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি যোগাযোগমাধ্যমে নানাভাবে দমন-পীড়ন করা হতো। কাতালান ভাষা ব্যক্তিগত এবং ধর্মীয় চর্চায় টিকে থাকলেও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবহারে ছিল প্রান্তিক পর্যায়ে।

১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসে ফ্রাঙ্কোর মৃত্যু এবং স্পেনের গণতন্ত্রে রূপান্তরের পর পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়। আন্দোলনের মুখে ১৯৭৮ সালের সংবিধান ‘জাতীয়তা ও অঞ্চল’কে স্বীকৃতি দেয় এবং স্বায়ত্তশাসিত সম্প্রদায়ের গঠনকে সামনে আনে। ১৯৭৯ সালে কাতালোনিয়ার ‘স্বায়ত্তশাসন আইন’ কাতালানকে স্প্যানিশের সঙ্গে সহসরকারি ভাষা হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে।

১৯৮০-এর দশক থেকে শিক্ষা ব্যবস্থায় ভাষা-অবগাহন নীতি চালু হয়, যেখানে সরকারি বিদ্যালয়ে কাতালান ভাষা প্রধান শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং স্প্যানিশ ভাষা একটি বিষয় হিসেবে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে। এ পুনর্জাগরণ কাতালান আঞ্চলিক পরিচয়ের একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে গড়ে ওঠে।

২০১০ সালে স্পেনের সংবিধান আদালত কাতালোনিয়ার সংশোধিত ‘স্ট্যাটাস অব অটোনমি’র কিছু অংশ বাতিল করে, তখন ভাষা আবারো রাজনৈতিক সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলন (২০১২-২০১৭) ভাষাকে পুনরায় রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় হিসেবে রূপান্তরিত করে। এভাবেই স্পেন দ্বিভাষিক স্বায়ত্তশাসনকে সংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়। তবে কাতালান ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয় স্বাধীনতার রাজনৈতিক প্রশ্ন থেকে অবিচ্ছেদ্য। ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি কাতালান জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আঞ্চলিক স্বাতন্ত্র্যের প্রতীক।

পাকিস্তান

১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ হওয়ার পর পাকিস্তান এক গভীর আত্মসমীক্ষার মুহূর্তে দাঁড়ায়। রাষ্ট্রভাষা প্রশ্ন একবার দেশভাগ ডেকে এনেছে, এবার কি পশ্চিম পাকিস্তান নিজের ভেতরের ভাষাগত বৈচিত্র্যকে স্বীকার করবে? এ প্রশ্নই ১৯৭২ সালে সিন্ধ প্রদেশে এক তীব্র ভাষা-সংকটের জন্ম দেয়।

সিন্ধ ছিল ঐতিহাসিকভাবে সিন্ধি ভাষাভাষীদের আবাসভূমি। কিন্তু ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর বিপুলসংখ্যক উর্দুভাষী মুহাজির করাচি ও হায়দ্রাবাদে এসে বসতি গড়েন। সময়ের সঙ্গে প্রশাসন, ব্যবসা ও শিক্ষায় উর্দুভাষীদের প্রভাব বাড়তে থাকে। সিন্ধি জনগোষ্ঠীর একাংশ মনে করতে থাকে, নিজেদের প্রদেশেই তারা প্রান্তিক হয়ে পড়ছে।

এ পটভূমিতে ৭ জুলাই ১৯৭২ সালে সিন্ধ প্রাদেশিক পরিষদে ‘সিন্ধি ল্যাংগুয়েজ বিল’ পাস হয়। আইনটি ১৬ জুলাই স্বাক্ষরিত হলে সিন্ধি ভাষা প্রাদেশিক সরকারি ভাষার মর্যাদা পায় এবং স্কুলে সিন্ধি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়। আইনটির উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় ভাষাকে প্রশাসনিক স্বীকৃতি দেওয়া, কিন্তু নগরাঞ্চলের উর্দুভাষী মুহাজিরদের একাংশ এটিকে নিজেদের কর্মসংস্থান ও সাংস্কৃতিক অবস্থানের প্রতি হুমকি হিসেবে দেখেন। আইন পাসের সঙ্গে সঙ্গেই করাচি ও হায়দ্রাবাদে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ৭-১৭ জুলাই, ১৯৭২—এ ১০ দিন ছিল সংঘর্ষ, বিক্ষোভ ও দাঙ্গায় ভরা। রাস্তায় মিছিল, পাল্টা মিছিল, সরকারি স্থাপনায় হামলা, পুলিশি হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সরকারি হিসাবে অন্তত ১৯ জন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হন। ভাষা সেখানে মুহূর্তেই রূপ নেয় নগর-রাজনীতি ও জাতিগত পরিচয়ের সংঘাতে।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো পরিস্থিতি সামাল দিতে হস্তক্ষেপ করেন। শেষ পর্যন্ত এক আপসে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় সিন্ধি তার প্রাদেশিক মর্যাদা বজায় রাখবে, তবে প্রশাসনে উর্দুর ব্যবহারও অব্যাহত থাকবে। একক ভাষার আধিপত্য নয়, বরং দ্বিভাষিক ব্যবস্থাই হয়ে ওঠে সমঝোতার ভিত্তি।

তুরস্ক

‘কুর্দি ভাষা আন্দোলন’ তুরস্কে তখনই জন্ম নেয় যখন রাষ্ট্র কেবল তুর্কি ভাষাকেই সরকারি ও জনসাধারণের ভাষা হিসেবে প্রচলিত করার নীতি গ্রহণ করে। ১৯২৩ সালে মুস্তাফা কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে তুরস্ক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে, রাষ্ট্রীয় একীভূতকরণের অংশ হিসেবে সংখ্যালঘু ভাষাগুলোর ব্যবহার সীমিত করা শুরু হয়। ১৯৩৪ সালের ‘সেটলমেন্ট আইনসহ’ পরবর্তী নীতিমালাগুলো কুর্দিসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু ভাষার প্রকাশ ও শিক্ষাকে প্রভাবিত করে।

পরিস্থিতি আরো কঠোর হয় ১৯৮০ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর। ১৯৮৩ সালে প্রবর্তিত আইন নং ২৯৩২ কেবল তুর্কি ভাষার ব্যবহারকে অনুমোদন করে এবং প্রকাশনা ও সম্প্রচারের ক্ষত্রে অন্য ভাষার ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। এ আইন বিশেষভাবে কুর্দি ভাষার ওপর প্রভাব ফেলে। এক সময়ে রাষ্ট্র ও ‘কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি’র (পিকেকে) মধ্যে সশস্ত্র সংঘর্ষ চলার কারণে, কুর্দি ভাষার প্রকাশ্য ব্যবহার প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

১৯৯১ সালে আইনটি বাতিল করা হয়, যার ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে কুর্দি ভাষার ওপর বিধিনিষেধ উঠে যায়। তবে শিক্ষা ক্ষেত্র এবং গণমাধ্যমে কুর্দির অবস্থান তখনো সীমিত থাকে। ২০০০-এর দশকে, তুরস্কের ইউরোপীয় ইউনিয়নের সংযোজন প্রক্রিয়া এবং সংস্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবে কিছু অগ্রগতি হয় ২০০৯ সালে চালু হয় ‘টি আর টি কুর্দি’, কুর্দি ভাষার সরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এবং কিছু স্কুলে কুর্দি ভাষার পাঠক্রমও দেয়া হয়। তবু কুর্দি ভাষা এখনো দেশের সর্বজনীন শিক্ষায় সম্পূর্ণ স্বীকৃতি পায়নি। এ আন্দোলন আজও চলমান এবং এটি সংখ্যালঘু অধিকার, সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি এবং রাজনৈতিক স্থানীয়করণের বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত।

ইউক্রেন

ইউক্রেনে ভাষার দাবি ইতিহাসের গভীরে নিহিত। সোভিয়েত শাসনের সময় রাশিয়ান ভাষা প্রশাসন, উচ্চ শিক্ষা ও সরকারি জীবনে প্রাধান্য পেয়েছিল, যদিও সাধারণ মানুষ প্রায় সর্বত্র ইউক্রেইনিয়ান ভাষা ব্যবহার করত।

একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে অক্টোবর ১৯৮৯ সালে, যখন ইউক্রেইনিয়ান এসএসআর ‘ভাষা আইন’ গ্রহণ করে এবং ইউক্রেইনিয়ানকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর ১৯৯১ সালে স্বাধীনতা লাভের পরও ভাষা নীতি একটি বিতর্কিত বিষয় হিসেবে রয়ে যায়, বিশেষ করে দেশটির পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে যেখানে রাশিয়ান-ভাষাভাষী জনগণদের মাঝে।

২০১২ সালে একটি বিতর্কিত আইন আনা হয়, যা সংখ্যালঘুদের সংখ্যা ১০ শতাংশ অতিক্রম করলে ওই অঞ্চলে তাদের ভাষাকে সরকারি মর্যাদা দেয়ার কথা বলে। এর ফলে পূর্ব ইউক্রেনের কিছু অংশে রাশিয়ান ভাষার প্রভাব আরো শক্তিশালী হয়। তবে ২০১৪ সালের বিপ্লবের পর ভাষার বিষয়টি জাতীয় পরিচয় ও নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

ইউক্রেনীয় সার্বভৌমত্বকে শক্তিশালী করতে, ২০১৯ সালে ইউক্রেন ‘‌রাষ্ট্রভাষা আইন’ পাস করে, যা সরকারি প্রশাসন, মিডিয়া ও শিক্ষায় ইউক্রেইনিয়ান ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত ও স্থানীয় ব্যবহারে সংখ্যালঘু ভাষার অধিকারও রক্ষা করা হয়। এ আন্দোলন প্রমাণ করে যে, ইউক্রেনের ভাষা সমস্যা শুধুই শিক্ষার বা যোগাযোগের নয়, এটি দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় পরিচয় এবং ভূরাজনৈতিক অবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

ভাষার দাবি মানে কেবল উচ্চারণের ভিন্নতা নয়, এটি ক্ষমতার বণ্টন, ইতিহাসের ব্যাখ্যা ও ভবিষ্যতের দিকনির্দেশ। একটি জাতির ভাষা তার দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে শিল্প, সাহিত্য, পরিচয় এবং অস্তিত্বের সাক্ষী। তাই যখনই ভাষার ওপর আঘাত এসেছে, তখনই মানুষ সোচ্চার হয়েছে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে।

আরও