ভারতের হারানো মিশর: মিজোরামের মেঘের নিচে বিস্মৃত সভ্যতা

এ স্থানের চারপাশে ছড়িয়ে আছে শত শত খোদাই করা পাথরের স্তম্ভ। স্থানীয়রা এগুলোকে ডাকে কাওৎছুয়া রোপুই, অর্থাৎ ‘মহান প্রবেশদ্বার’। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ পাথরগুলো বন ও শিকড়ে আচ্ছন্ন ছিল, কিন্তু আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব তাদের রহস্য উদঘাটন করেছে।

মিজোরামের পূর্বপ্রান্তে, দূরবর্তী চমফাই জেলার কাছাকাছি এক পাহাড়ি উপত্যকা। সেখানকার পাহাড় যেন মিয়ানমারের দিকে মিলিয়ে যায়। কুয়াশা তৈরি করে রাখে অদ্ভুত বিষন্নতা। পৃথিবী প্রায় ভুলেই গিয়েছিল এ উপত্যকার কথা। সবুজ পাহাড়, বাঁশঝাড়ে বাতাসের প্রতিধ্বনি এবং মেঘের নরম ঢেউয়ের মাঝে এখনো হাজার বছরের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভাংছিয়া নামে একটি শহর।

এ স্থানের চারপাশে ছড়িয়ে আছে শত শত খোদাই করা পাথরের স্তম্ভ। স্থানীয়রা এগুলোকে ডাকে কাওৎছুয়া রোপুই, অর্থাৎ ‘মহান প্রবেশদ্বার’। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ পাথরগুলো বন ও শিকড়ে আচ্ছন্ন ছিল, কিন্তু আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব তাদের রহস্য উদঘাটন করেছে। ২০১১ সালে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া (এএসআই)-এর একটি দল, স্থানীয়দের মুখে এ পাথরগুলোর গল্প শুনে, ভাংছিয়ার গভীরে প্রবেশ করে। তারা আবিষ্কার করল ৪৫ বর্গকিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত এক জটিল সভ্যতা, যেখানে মেনহির, সিঁড়ি, সমাধি, জলাধার সবই রয়েছে। এটিকে বলা হয় ভারতের অন্যতম বৃহত্তম নেক্রোপলিস। ঐতিহাসিক ও গবেষকদের কাছে এটি পেয়েছে কাব্যিক নাম 'ভারতের হারানো মিশর'

ভাংছিয়ার মানুষ শতাব্দী ধরে বিশ্বাস করত, এ পাথরগুলো পবিত্র, পাহাড়ের প্রহরী। প্রতিটি পাথরেই খোদাই করা আছে যোদ্ধা, শিকারি, নর্তকী, আকাশ এবং অজানা প্রতীক।

২০১১–২০১৫ সালের মধ্যে এক খনন কার্যক্রমে এএসআই আবিষ্কার করল ১৭০টিরও বেশি মেনহির, নিখুঁত নকশায় ঘেরে টেরেস, সমাধি, জলাধার, এবং পাহাড়ে খোদাই করা সিঁড়ি। এটি এলোমেলো নয়, এটি ছিল কোন শহর স্থাপনের নিখুঁত পরিকল্পনা।

প্রত্নতত্ত্ববিদরা আরো দেখেছে, পাথরের খোদাই করা জলনালার জটিল ব্যবস্থা। সেখানে পাওয়া যায় জলসংরক্ষণ ও মনুষ্য প্রযুক্তির প্রমাণ। তার কাছেই পাওয়া গেছে পূণ্যস্থান ও পশুর হাড়, যা মৃত্যুর পর পুনর্জন্ম এবং আধ্যাত্মিক আচার নির্দেশ করে। এখানকার প্রতিটি খোদাই, প্রতিটি স্তম্ভ দেখায় যে এ মানুষগুলো প্রকৃতি, জ্যোতির্বিদ্যা, এবং আত্মার সঙ্গে গভীর সংযোগ ছিল।
ধারণা করা হয়, এ প্রতীকগুলো মিজো বা প্রোটো-টিবেটো-বুর্মা গোত্রের অংশ, যারা খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০–৫০০ সালের মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে মিজোরামে এসেছিল।
তাদের সমাজ ছিল সম্প্রদায়ভিত্তিক। আর পরিচালিত হতো প্রধান, পুরোহিত ও কারিগরের নেতৃত্বে। তারা ছিল অত্যন্ত আধ্যাত্মিক, সূর্য, চাঁদ, নদী, এবং পাহাড়কে দেবতা হিসেবে পূজো করত খোদাই করা ছবি থেকে ধারণা করা হয়, তারা মৃত্যুর পর জীবনের প্রতি বিশ্বাসী ছিল।

গবেষণায় উঠে এসেছে, ধান, তিল এবং সবজি চাষ করত এখানকার মানুষ। বন থেকে পশু শিকার করত। পাথর ও লোহার হাতিয়ার তৈরি করত। তাদের ছিল বাঁশের ঘর ও উঁচু স্তম্ভের বাড়ি, বৃষ্টির ঝড়ের প্রতিরোধী।

তাদের বিলুপ্তির ঘটনা বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত হয়ে বলতে পারেনি। হয়তো ভূমিকম্প কিংবা পাহাড় ধস হয়েছিল। অথবা কোনো দুর্ভিক্ষ বা রোগ সবকিছু শেষ করে দিয়েছিল। কেউ কেউ আবার ধারণা করেন, তারা ধীরে ধীরে নতুন গোত্রে মিশে গিয়েছিল। ধর্মবিশ্বাস, ভাষা, গল্প সবই মুছে গিয়েছিল, শুধু পাথরগুলো সাক্ষী হয়ে আজও রয়ে গেছে।
এ সভ্যতার নাম ভারতের হারানো মিশর দেয়ার পেছনেও রয়েছে নানা কারণ। যদিও এখানে মিশরীয় সভ্যতার সঙ্গে সরাসরি কোনো সংযোগ পাওয়া যায়নি, তবুও এ ভূ‑সম্পদের সঙ্গে মিশরের সমৃদ্ধ পাথর‑শিল্প, কৃষি‑শাসন ও স্মৃতিস্তম্ভ তৈরির ঐতিহ্যের মিল রয়েছে। এ কারণে স্থানীয় ও প্রত্নতাত্ত্বিকরা এটিকে উল্লেখ করেন 'ভারতের হারানো মিশর' হিসেবে।

আরও