আজ ২১ ডিসেম্বর, বছরের সবচেয়ে ছোট দিন ও সবচেয়ে দীর্ঘ রাত। বিশ্বজুড়ে বিশেষত উত্তর গোলার্ধে পালিত হচ্ছে শীতকালীন অয়নকাল বা অয়নান্ত (উইন্টার সলস্টিস)। অনেকের কাছে এটি ‘সূর্যের দক্ষিণায়ন’ নামেও পরিচিত।
এ দিনে পৃথিবীর উত্তর মেরু সূর্য থেকে সবচেয়ে বেশি দূরে হেলে থাকে। এর প্রভাবে দিনের দৈর্ঘ্য কমে গিয়ে রাত সবচেয়ে দীর্ঘ হয়। জ্যোর্তিবিজ্ঞানে শীত নির্ধারণ করা হয় পৃথিবীর সূর্যকে ঘিরে অবস্থান ও অক্ষের ঝোঁকের ওপর ভিত্তি করে। সে হিসেবে উত্তর গোলার্ধে সাধারণত ২১ ডিসেম্বর থেকেই শীতকাল শুরু হয়।
আমাদের কাছে দিনটি কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ হলেও, ইতিহাসে দীর্ঘ সময়জুড়ে এই দিনটি ছিল মানুষের টিকে থাকার লড়াইয়ের প্রতীক। সূর্যের আলো কমে যাওয়া মানে শীত, খাদ্যসংকট ও মৃত্যুর আশঙ্কা। তাই উষ্ণতা ফিরে পাওয়ার আশায় মানুষ এ দিনকে ঘিরে গড়ে তুলেছে উৎসব, আচার ও বিশ্বাস। আজও বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতিতে সেই ঐতিহ্যের ছাপ রয়ে গেছে।
ইউরোপের ‘ইউল’ থেকে ক্রিসমাসের জন্ম
উত্তর ইউরোপে শীতকালীন অয়নান্ত ঘিরে উদ্যাপনের নাম ছিল ইউল। ইংরেজি শব্দ ‘হুইল’ থেকে ইউল শব্দটি এসেছে। ইউরোপীয়দের বিশ্বাস এ উৎসব পালনের মাধ্যমে তারা সূর্যের গতিপথের চাকার প্রত্যাবর্তন করতে সক্ষম। প্রাচীনকালে উৎসবটি ১২ দিন ধরে চলত। এ সময় তুষারপাতের কারণে কৃষিকাজ বন্ধ থাকায় আগে থেকেই তারা খাবার মজুত করে রাখে। চিরসবুজ বৃক্ষ যেমন পাইন, ফারের শাখা দিয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে তোলে ‘ইউল ট্রি’। কনকনে ঠাণ্ডায় ঘরকে গরম রাখতে আস্ত একটা ওক গাছের গুঁড়ি বাড়িতে নিয়ে এসে চুলার আগুনে জ্বলতে দেয়। তাদের বিশ্বাস যত তাড়াতাড়ি এই গুঁড়ি জ্বলবে, সূর্য তত তাড়াতাড়ি পৃথিবীকে উষ্ণ করবে। আবার তারা চাষাবাদ করতে সক্ষম হবে।
ইউল উদযাপনের একটি চিরাচরিত পানীয় হলো ওয়াসল। যা সাধারণত মধু, দারুচিনি, আদা, লবঙ্গ, আপেল সাইডার, জায়ফল ও কমলালেবুর টুকরোকে কম আঁচে ৬-৮ ঘণ্টা ফুটিয়ে বানানো হয়। পরস্পরের মধ্যে উপহার আদান প্রদানের মাধ্যমে পৌত্তলিকদের এ ইউল, সমাপ্তি ঘটায় ফেলে আসা বছরের সমস্ত দুঃখকে। নবম শতাব্দীতে খ্রিস্টধর্ম বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ইউল ধীরে ধীরে রূপ নেয় ক্রিসমাসে।
রোমানদের স্যাটার্নালিয়া
প্রাচীন রোমে শীতকালীন অয়নান্ত মানেই ছিল স্যাটার্নালিয়া। রোমান দেবতা স্যাটার্ন–এর সম্মানে এ দিনটি উদযাপন করা হয়। এ উৎসবের সবচেয়ে মজার দিক ছিল সমাজের নিয়ম উল্টে দেয়া।
এদিন দাসদের সাময়িকভাবে মুক্তির মতো স্বাধীনতা দেয়া হতো। প্রভুরা অনেক সময় দাসদের খাবার পরিবেশন করতেন। অন্যান্য সময় নিষিদ্ধ হলেও এদিন জুয়া খেলা বৈধ ছিল। সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে, সেদিন একজন ‘নকল রাজা’ নির্বাচন করা হতো, যিনি মজা করে নির্দেশ দিতেন।
দিনটি উদযাপন করতে মানুষ একে অন্যকে উপহার দিত। ভোজ হতো, গান–নাচ আর হাসি–আনন্দ চলত। মোমবাতি উপহার দেয়ার চল ছিল, যা আলো ও নতুন দিনের প্রতীক। ইতিহাসবিদদের মতে, এ উৎসবের অনেক উপাদান পরবর্তীতে ক্রিসমাসে মিশে গেছে।
চীনে ‘ডংঝি’
চীন ও তাইওয়ানে শীতকালীন অয়নান্ত পরিচিত ‘ডংঝি’ নামে, যার অর্থ ‘শীতের আগমন’। প্রাচীন বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিন থেকে ‘ইয়াং’ শক্তির পুনর্জাগরণ শুরু হয়। উৎসবটি চীনের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ইয়িন ও ইয়াং ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। যা মূলত সম্প্রীতি ও ভারসাম্যের প্রতীক।
যখন দিন ছোট হয়, তখন ইয়াং শক্তি অর্থাৎ উষ্ণতার ঘাটতি দেখা দেয় বলে মনে করা হয়।
তাই ডংঝিতে, মানুষ ইয়াং জাতীয় খাবার অর্থাৎ গরম খাবার খায়, যাতে তারা শীতের (ইয়িন) ঠাণ্ডাকে সামাল দিতে পারে। খাবারের মধ্যে থাকে ট্যাংইউয়ান নামে আঠালো চালের বল জাতীয় খাবার, যা পুনর্মিলন ও সমৃদ্ধির প্রতীক। সেইসঙ্গে থাকে চালের ময়ানে মোড়ানো মাংসের ডাম্পলিং, মাটন স্টু বা ভেড়ার মাংসের স্যুপ এবং বাবাও পরিজ যা বীজ, বাদাম ও শুকনো ফল দিয়ে তৈরি করা হয়।
প্রচলিত মিথ অনুযায়ী, ঠাণ্ডাজনিত অসুখ সারাতেই এ গরম খাবারের প্রচলন।
জাপানের ‘তোজি’ আর ইউজু স্নান
জাপানের ‘তোজি’ হলো শীতকালীন অয়নান্ত বা বছরের সবচেয়ে ছোট দিনের উৎসব। সাধারণত ২১ বা ২২ ডিসেম্বর দিনটি পালিত হয়। জাপানিদের বিশ্বাস, এ দিন থেকে ধীরে ধীরে দিন বড় হতে শুরু করে, অর্থাৎ আলো ফিরে আসে।
তোজির সবচেয়ে জনপ্রিয় রীতি হলো ইউজু স্নান। ইউজু একটি সুগন্ধি সাইট্রাস ফল, দেখতে লেবুর মতো। তোজি দিনে গরম পানিতে ইউজু ভাসিয়ে স্নান করা হয়। জাপানিদের ধারণা, এতে
- ঠাণ্ডাজনিত অসুখ কম হয়
- শরীর উষ্ণ থাকে
- ত্বক ভালো থাকে
- আর সারা বছর ভালো ভাগ্য আসে
অনেকে মনে করেন, ইউজুর তীব্র সুগন্ধ শরীর ও মনকে সতেজ করার পাশাপাশি শীতের ক্লান্তি দূর করে। এ দিনে জাপানে অনেক স্পা, পাবলিক বাথ ও ঘরেও ইউজু স্নানের আয়োজন করা হয়। পাশাপাশি শীত সহনশীলতার প্রতীক হিসেবে খাওয়া হয় কাবোচা কুমড়া।
ইরানের ‘শবে ইয়ালদা’
ইয়ালদা বা জায়েশমেহর হলো পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো একটি ইরানি উৎসব। ইয়ালদা নামটি পুরনো সিরিয়াক শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘জন্ম’। প্রাচীন পারস্যের জরথুস্ট্রবাদ ধর্মে, সূর্যদেবতা মিথ্রার পুনর্জন্ম পালনে এ উৎসব পালন করা হতো। মিথ্রা পৃথিবীতে আলো, মঙ্গল ও শক্তির প্রতীক।
ইসলাম প্রতিষ্ঠার আগের পারস্যে ইয়ালদা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসবগুলোর একটি। আজও ইরান ও বিশ্বজুড়ে জরথুস্ট্রবাদীরা দিনটি উদযাপন করে থাকে। অতীতে, ইয়ালদা উৎসবে বিভিন্ন উপহার দেয়া হতো, সবুজ গাছপালা দিয়ে ঘর সাজানো হতো। একদিনের জন্য চাকরদের বানানো হতো প্রভু। সেদিন চাকররা প্রভুদের শাসন করার অনুমতি পেতো।
ধারণা করা হয়, রোমানরা তাদের শীতকালীন অয়নকালের উৎসব স্যাটার্নালিয়া পালনের সময় এ প্রথাগুলো গ্রহণ করেছিল। পরে এসব প্রথা ক্রিসমাসের ঐতিহ্যে যুক্ত হয়।
বর্তমানে দিনটি উদযাপনে দীর্ঘ রাত জেগে গল্প বলা, কবিতা পাঠ ও তরমুজ-ডালিম খাওয়ার রীতি আছে। ইরানের বাসিন্দাদের কাছে লাল রঙ সূর্যোদয়ের প্রতীক, অন্ধকার কাটিয়ে আলো ফিরে আসার বিশ্বাসই এর কেন্দ্রবিন্দু।
স্টোনহেঞ্জে সূর্যের অপেক্ষা
স্টোনহেঞ্জ, ইংল্যান্ডে অবস্থিত প্রাচীন সুবিন্যস্ত পাথরগুলো হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। শীতকালীন সূর্যগ্রহণ বা ‘উইন্টার সলস্টিস’-এ এই স্থানে হাজার বছরের পুরনো রীতি অনুযায়ী মানুষ সূর্য ওঠার দিকে তাকিয়ে থাকে। এখানকার প্রস্তরবৃত্ত এমনভাবে নির্মিত যে এই দিনে সূর্যের আলো নির্দিষ্ট রেখা ধরে প্রবেশ করে।
পৃথিবীর এই অংশে শীতকালে দিনটি সবচেয়ে ছোট হয়, আর সেই ছোট দিনের সূর্যের যখন পূর্ণভাবে উত্থান ঘটে, তখন প্রাচীন নিলোটিক মানুষ এটিকে নতুন সূচনার প্রতীক হিসেবে উদযাপন করত। সেই সময়ের মানুষদের খাদ্যাভ্যাস ও উৎসবের প্রমাণ মিলেছে আশপাশের খোলা এলাকায় পাওয়া পশুর হাড় ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষে। ইতিহাসবিদদের মতে, এটি ছিল প্রাগৈতিহাসিক মানুষের আলো ফেরার প্রতীক্ষার নিদর্শন।
আজকের দিনে, নব্য-ড্রুইড, নব্য-প্যাগান ও অন্যান্য ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক অনুসারীরা স্টোনহেঞ্জে এসে মুহূর্তটি উদযাপন করেন। এখান আর সাঁতার ও মন্ত্রচর্চা হয় না, তবে সূর্যের দিকে তাকিয়ে নতুন বছরের শুরু, আলো ও আশার উদযাপন করা হয়।
সভ্যতা, ধর্ম ও ভূগোল ভিন্ন হলেও শীতকালীন অয়নান্তকে ঘিরে মানুষের অনুভূতি প্রায় এক—অন্ধকার যত দীর্ঘই হোক, আলো ফিরে আসবেই। হাজার বছরের পুরোনো এ উৎসবগুলো মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক শুধু বৈজ্ঞানিক নয়, গভীরভাবে সাংস্কৃতিক ও আবেগেরও।