বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস

পোষা প্রাণীর মানসিক স্বাস্থ্যও গুরুত্বপূর্ণ

বছরের পর বছর আমরা পোষা প্রাণীদের যত্ন বলতে বুঝেছি সঠিক খাবার, নিরাপদ আশ্রয় আর সময়মতো টিকা। কিন্তু নতুন গবেষণাগুলো দেখাচ্ছে, পোষা প্রাণীদের জন্য মানসিক সুস্থতাও ততটাই জরুরি।

আধুনিক আচরণবিজ্ঞান অনেক আগেই প্রমাণ করেছে, আবেগ কেবল মানুষের একার সম্পত্তি নয়। হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৭২ শতাংশ কুকুরের মধ্যে অন্তত একটি উদ্বেগজনিত আচরণ রয়েছে— যেমন অপরিচিত মানুষ বা শব্দকে ভয় পাওয়ার মতো আচরণ।

পোষা প্রাণীর সঙ্গে মানুষের বন্ধুত্ব নতুন কিছু নয়। একাকিত্বের এ সঙ্গী সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবনের বিশাল অংশ হয়ে দাঁড়ায়। তাদের যত্ন নিয়ে তাই বেশ সচেতন থাকেন পালকরা। আর সাধারণত এ যত্ন বলতে বোঝায় তাদের খাবার, নিরাপদ আশ্রয় আর সময়মতো টিকা দেয়াকে।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে নতুন কিছু গবেষণা এক ভিন্ন বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। এসব গবেষণার ফল বলছে, পোষা প্রাণীদের মানসিক সুস্থতা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তাদের প্রতি ভালোবাসা মানে শুধু খাবার দেয়া নয়, বরং তাদের নীরব অনুভূতিগুলো বুঝতে শেখা।

আধুনিক আচরণবিজ্ঞান অনেক আগেই প্রমাণ করেছে, আবেগ কেবল মানুষের একার সম্পত্তি নয়। হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৭২ শতাংশ কুকুরের মধ্যে অন্তত একটি উদ্বেগজনিত আচরণ রয়েছে— যেমন অপরিচিত মানুষ বা শব্দকে ভয় পাওয়ার মতো আচরণ।

একইভাবে, ওরেগন স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষণায় দেখা গেছে, বিড়ালরা তাদের মালিকদের সঙ্গে এমন সম্পর্ক গড়ে তোলে যা শিশুর মায়ের প্রতি আসক্তির মতোই গভীর। আর পাখিদের ক্ষেত্রে— তোতা, কাক, বা কাকাতুয়ার মধ্যে দেখা গেছে, প্রিয় সঙ্গী হারালে তারা শোক করে, একাকীত্বে তাদের রাগ কিংবা অভিমানের অনুভূতি হয়। এক্ষেত্রে তারা নিজের পালক ছিঁড়ে ফেলে।

স্নায়ুবিজ্ঞান প্রমাণ করেছে, উদ্বেগে থাকলে মানুষের মতো প্রাণিদের মধ্যেও কর্টিসল অর্থাৎ স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ হয়। আর অক্সিটোসিন অর্থাৎ ভালোবাসার হরমোন তৈরি হয় যখন তারা নিরাপদ ও আদরে থাকে।

আজকের পোষা প্রাণীরা এক বৈপরীত্যে বেঁচে আছে। কুকুররা, যারা স্বভাবে দলবদ্ধ প্রাণী, তাদের যখন পোষা প্রাণী হিসেবে আনা হচ্ছে, তখন দীর্ঘ সময় একা ঘরে বন্দি থাকছে। বিড়ালরা, যাদের প্রকৃতি অনুযায়ী অনুসন্ধান আর স্বাধীনতা ভালো লাগে, বন্দিদশায় তারা ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। আর পাখিরা, যারা খুব সামাজিক প্রাণী, ছোট খাঁচায় একা থেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার মত ঘটনাও ঘটছে।

কভিড-১৯ মহামারির সময় বিশ্বজুড়ে পোষা প্রাণী দত্তক নেয়ার হার বেড়েছিল, কিন্তু মানুষ যখন আবার কাজে ফিরল, তখনই দেখা গেল বিপরীত চিত্র। আমেরিকান ভেটেরিনারি মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন জানায়, ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে কুকুরের বিচ্ছিন্নতা-জনিত উদ্বেগের হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

বিভিন্ন গবেষণা বলছে, প্রাণীদের বিষণ্ণতা প্রকাশ পায় আচরণে। এক সময়ের চঞ্চল কুকুর হঠাৎ নিস্তেজ হয়ে যায়, প্রিয় খাবার খাওয়া বন্ধ করে দেয়। বিড়াল এ অনুভূতি প্রকাশ করে অকারণে অতিরিক্ত হারে নিজের লোম চাটতে থাকে বা বাড়ির এক কোণে লুকিয়ে থাকে। তোতা পাখি হঠাৎ নিজের পালক ছিঁড়তে শুরু করে বা গান বন্ধ করে দেয়।

ভেটেরিনারি আচরণবিশেষজ্ঞ ড. ক্যারেন ওভারঅল বলেন, প্রাণীর আচরণে পরিবর্তন মানেই সে অবাধ্য হয়েছে, এমন নয়। বরং এটি তার যোগাযোগের ভাষা। অনেক সময় এটা সাহায্যের আকুতিও।

২০২৩ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার এক প্রাণী পুনর্বাসন কেন্দ্রে ম্যাক্স নামের এক গোল্ডেন রিট্রিভারের ঘটনা সবাইকে নাড়া দেয়। তার বৃদ্ধ মালিক মারা যাওয়ার পর সে খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। প্রতিদিন বসে থাকত মালিকের চেয়ারের পাশে। মাসের পর মাসের থেরাপি আর অন্য কুকুরের সঙ্গ তাকে ধীরে ধীরে ফিরিয়ে আনে স্বাভাবিক জীবনে।

ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, কুকুর ও তাদের মালিকদের হৃদস্পন্দন এবং স্ট্রেসের মাত্রা প্রায় একসঙ্গে ওঠানামা করে। মালিক দুঃখ পেলে চুপচাপ হয়ে যায় বিড়ালরা। পাখিরা অস্থির হয়ে ওঠে টানটান পরিবেশে।

তবে স্বস্তির বিষয় হলো, পোষা প্রাণীর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এখন সচেতনতা বাড়ছে। ভেটেরিনারি সাইকিয়াট্রি বা প্রাণী মনোবিজ্ঞান এখন দ্রুত বিকাশমান এক শাখা, যেখানে উদ্বেগ, জটিল আচরণ বা ট্রমা-জনিত সমস্যার চিকিৎসা করা হয়।

তাই অধিকাংশ পোষা প্রাণীকে যত্নে রাখার সবচেয়ে উপায় হলো তার প্রতি ভালোবাসা ও বোঝাপড়া। নিয়মিত রুটিন, পর্যাপ্ত খেলা, মানসিক উদ্দীপনা, সঙ্গ, আর প্রশান্ত পরিবেশ- এগুলোই তাদের মানসিকভাবে সুস্থ রাখতে বড় ভূমিকা রাখে। সকালে হাঁটতে যাওয়া, কিছু বাড়তি আদর, খাঁচা থেকে বের করে পাখিকে একটু উড়তে দেয়া — এগুলোই তাদের পৃথিবীকে বদলে দিতে পারে।

আরও