ইসরায়েলের পুরস্কার মঞ্চে প্রতিবাদ

হারুকি মুরাকামির ‘ডিম ও দেয়াল’ তর্ক এবং লেখকের দায়

পুরস্কার গ্রহণের মঞ্চকে তাই শুধু সৌজন্য বক্তব্যের জায়গা হিসেবে ব্যবহার করেননি হারুকি মুরাকামি। বরং কথাসাহিত্যিক হিসেবে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। ভাষায় সত্য ও মিথ্যার সম্পর্ক দিয়ে বক্তব্য শুরু করেছিলেন। রসিকতা করে বলেন, ঔপন্যাসিক হিসেবে তিনি পেশাদার মিথ্যাবলিয়ে। তবে ঔপন্যাসিকের মিথ্যা আসলে কল্পনার মাধ্যমে সত্যকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়ার একটি পদ্ধতি। আর আজ তিনি মিথ্যা বলবেন না; যতটা সম্ভব সৎ থাকার চেষ্টা করবেন

ডিম ও কংক্রিটের অসম লড়াইয়ে কার পক্ষ নেবেন? এমন প্রশ্নে হারুকি মুরাকামি ডিমেরই পক্ষ নেবেন। ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘কাফকা অন দ্য শোর’-খ্যাত এ লেখক সেই কথা সাফ সাফ জানিয়েছে দেন। জেরুজালেম আন্তর্জাতিক বইমেলার আলোকোজ্জ্বল মঞ্চে দাঁড়িয়ে রূপকের ছলে বৈশ্বিক রাজনীতির অন্ধকার এক দিক হাজির করেন তিনি। ইসরায়েলের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট শিমন পেরেজ ও জেরুজালেমের মেয়র নির বারকাতের উপস্থিতিতে উচ্চারিত সেই বক্তব্য সাহিত্য, রাজনীতি এবং লেখকের নৈতিক দায় নিয়ে পুরোনো বিতর্ককে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।

সদ্য শেষ হয়েছে ‘অপারেশন কাস্ট লিড’। আগের বছরের ডিসেম্বর থেকে ২০০৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত গাজায় চলা ওই সামরিক অভিযানের রক্ত তখনো শুকায়নি। এমন পরিস্থিতিতে জেরুজালেম পুরস্কার গ্রহণ করতে ইসরায়েলে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি মুরাকামির জন্য সহজ ছিল না। জাপানে অনেকে তাকে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন; কেউ কেউ সতর্ক করেছিলেন যে বই বয়কটের উদ্যোগ নেয়া হবে। ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠন ও সাংস্কৃতিক বয়কটের পক্ষের গোষ্ঠীগুলোও তাকে পুরস্কার গ্রহণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছিল। সমসাময়িক এক খোলা চিঠিতে কয়েকশ আন্তর্জাতিক লেখক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের পক্ষ থেকে একই ধরনের আহ্বান আসে।

তাদের যুক্তি ছিল—এমন সময়ে পুরস্কার গ্রহণ ইসরায়েলের নীতিকে পরোক্ষ বৈধতা দেয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। মুরাকামি নিজেও এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাননি। কারণ তিনিও মনে করেন—পুরস্কার গ্রহণ থেকে এমন ধারণা হতে পারে যে সংঘাতের একটি পক্ষকে সমর্থন করছেন কিংবা বিপুল সামরিক শক্তি ব্যবহারের নীতিকে অনুমোদন করছেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তিনি জেরুজালেমে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

পুরস্কার গ্রহণের মঞ্চকে তাই শুধু সৌজন্য বক্তব্যের জায়গা হিসেবে ব্যবহার করেননি হারুকি মুরাকামি। বরং কথাসাহিত্যিক হিসেবে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। ভাষায় সত্য ও মিথ্যার সম্পর্ক দিয়ে বক্তব্য শুরু করেছিলেন। রসিকতা করে বলেন, ঔপন্যাসিক হিসেবে তিনি পেশাদার মিথ্যাবলিয়ে। তবে ঔপন্যাসিকের মিথ্যা আসলে কল্পনার মাধ্যমে সত্যকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়ার একটি পদ্ধতি। আর আজ তিনি মিথ্যা বলবেন না; যতটা সম্ভব সৎ থাকার চেষ্টা করবেন।

এরপরই আসে সেই বহুল আলোচিত রূপক—‘ডিম ও দেয়াল’। মুরাকামি বলেন, ‘একটি উঁচু, শক্ত দেয়াল এবং তার গায়ে আছড়ে পড়ে ভেঙে যাওয়া একটি ডিমের মধ্যে—দেয়ালটি যতই সঠিক হোক না কেন এবং ডিমটি যতই ভুল হোক না কেন, আমি সব সময় ডিমের পাশে দাঁড়াব।’

কথাগুলো বলেই তিনি রূপকের ব্যাখ্যায় যান। মুরাকামির কাছে আমরা প্রত্যেকেই একেকটি ডিম—জাতীয়তা, ধর্ম কিংবা বর্ণের সীমা ছাড়িয়ে থাকা ভঙ্গুর, অনন্য ও অপূরণীয় মানবসত্তা। আর সেই ডিমের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শক্ত দেয়ালের নাম ‘দ্য সিস্টেম’। তার ভাষায়, এই সিস্টেমের নিজস্ব কোনো আত্মা নেই; অথচ মানুষই সেটি তৈরি করেছে। ফলে সেই সিস্টেমকে মানুষের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে দেয়া যায় না।

গাজার তৎকালীন বাস্তবতার সঙ্গে এই রূপকের সম্পর্কও মুরাকামি স্পষ্ট করেছিলেন। তার বক্তব্যে বোমারু বিমান, ট্যাংক, রকেট ও ফসফরাস বোমার মতো সামরিক শক্তিকে সেই উঁচু ও শক্ত দেয়ালের সঙ্গে তুলনা করা হয়; বিপরীতে সেসব অস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত বেসামরিক মানুষ হয়ে ওঠে ভঙ্গুর ডিমের প্রতীক। অর্থাৎ ‘ডিম ও দেয়াল’ নিছক বিমূর্ত কোনো দার্শনিক উপমা নয়; গাজার যুদ্ধের বাস্তবতার সঙ্গেও সেটি যুক্ত।

মুরাকামির নৈতিক অবস্থানের অনন্যতা নিয়ে একটি তুলনা টানা যায় সমকালীন ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ ও চিন্তাবিদ ইউভাল নোয়া হারারির সঙ্গে। হারারি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকারের সমালোচক হিসেবে পরিচিত। কিন্তু ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের ব্যাখ্যায় তার লেখায় নিরাপত্তা, জাতীয় অস্তিত্ব ও রাষ্ট্রের বাস্তবতার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি এমন যুক্তি তুলে ধরেন যে, অনেক ইসরায়েলির কাছে পশ্চিম তীর থেকে সরে যাওয়ার মতো পদক্ষেপ নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে—কারণ তাদের আশঙ্কা, সেখান থেকে চরমপন্থীরা ইসরায়েলি শহরগুলোয় হামলা চালাতে পারে

হারুকি মুরাকামি ও ইসরায়েলের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট শিমন পেরেজ। ছবি: রয়টার্স

শিমন পেরেজকে ঘিরে ছিল তার রসিকতা। বলেন, ‘পেশাদার রাজনীতিবিদ বা কূটনীতিকদের মতোই ঔপন্যাসিকরাও মাঝে মাঝে মিথ্যা বলেন, সরি মিস্টার প্রেসিডেন্ট!’ উপস্থিত অতিথিরা হাসলেও এর ভেতরে ছিল তার সাহিত্যদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা—ঔপন্যাসিকের বানানো মিথ্যার মধ্য দিয়েও কখনো কখনো এমন সত্যকে সামনে আনা যায়, যা সরাসরি ধরা কঠিন। তার কাছে উপন্যাসের কাজ ব্যক্তিমানুষের আত্মমর্যাদাকে সামনে আনা এবং ‘সিস্টেম’-এর দিকে আলো ফেলা, যাতে সেই ব্যবস্থা মানুষের আত্মাকে নিজের জালে আটকে ফেলতে না পারে।

মুরাকামি এ আলাপ চিন্তার জগতে পুরোপুরি নতুন নয়। বরং কেন, কোথায় ও কখন তিনি কথাগুলো বলেছেন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

মুরাকামির চার দশক আগে ফরাসি সাহিত্যিক ১৯৫৭ সালে নোবেল পুরস্কার গ্রহণের বক্তৃতায় লেখকের দায় নিয়ে বলেছিলেন অ্যালবেয়ার কামু। তার মতে, একজন লেখককে ইতিহাসের নির্মাতাদের নয়, বরং ইতিহাসের অধীন হয়ে থাকা মানুষের সেবা করতে হবে। অর্থাৎ ক্ষমতার কেন্দ্রের বদলে ইতিহাসের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতি লেখকের দায়বদ্ধতাই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী নেতা ডেসমন্ড টুটুর বহুল উদ্ধৃত বক্তব্যও এখানে প্রাসঙ্গিক। তার মতে, অন্যায় পরিস্থিতিতে নিরপেক্ষ থাকা শেষ পর্যন্ত নিপীড়কের পক্ষ নেয়ারই নামান্তর। একইভাবে উরুগুয়ের লেখক এদুয়ার্দো গালিয়ানোর সঙ্গে যুক্ত একটি বহুল প্রচলিত উপমায় বলা হয়, শক্তিশালী চিল ও অসহায় মুরগির ছানার মধ্যে নিরপেক্ষ থাকা মানে চিলটির অন্যায়কে পরোক্ষভাবে মেনে নেয়া হয়। মুরাকামি জেরুজালেমের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বৃহত্তর নৈতিক প্রশ্নটিকেই নিজের ‘ডিম ও দেয়াল’ রূপকে নতুন ভাষা দিয়েছিলেন।

বয়কটের তীব্র চাপ উপেক্ষা করে কেন হারুকি মুরাকামি ইসরায়েলে গিয়েছিলেন—এর উত্তরও তিনি নিজেই দিয়েছেন। বক্তৃতায় মুরাকামি বলেন, অনেকেই তাকে সেখানে না যেতে বলেছিলেন; কেউ কেউ বই বয়কটের হুমকিও দিয়েছিলেন। কিন্তু উপন্যাসিক হিসেবে তিনি এমন কিছু বিশ্বাস করতে চাননি, যা নিজের চোখে দেখেননি কিংবা নিজের হাতে স্পর্শ করেননি। তাই তিনি অনুপস্থিত থাকার বদলে সেখানে যাওয়া, না দেখার বদলে নিজের চোখে দেখা এবং নীরব থাকার বদলে কথা বলার সিদ্ধান্ত নেন।

হারুকি মুরাকামির হাতে পুরস্কার তুলে দেন জেরুজালেমের মেয়র নির বারকাত। ছবি: এপি

মুরাকামির এ রূপক ও সরাসরি সমালোচনা ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের জন্যও অস্বস্তিকর ছিল। তার বক্তব্যকে ঘিরে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়। তবে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ সরাসরি বিরোধিতায় না গিয়ে মতপ্রকাশের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়ার বুলি দিয়ে কাজ সারে। একইসঙ্গে হারুকি মুরাকামির মধ্যপ্রাচ্য-সংক্রান্ত মন্তব্যের সঙ্গে তারা দ্বিমত পোষণ করেছিল, তাকে ফের ইসরায়েলে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়।

মুরাকামির নৈতিক অবস্থানের অনন্যতা নিয়ে একটি তুলনা টানা যায় সমকালীন ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ ও চিন্তাবিদ ইউভাল নোয়া হারারির সঙ্গে। হারারি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকারের সমালোচক হিসেবে পরিচিত। কিন্তু ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের ব্যাখ্যায় তার লেখায় নিরাপত্তা, জাতীয় অস্তিত্ব ও রাষ্ট্রের বাস্তবতার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি এমন যুক্তি তুলে ধরেন যে, অনেক ইসরায়েলির কাছে পশ্চিম তীর থেকে সরে যাওয়ার মতো পদক্ষেপ নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে—কারণ তাদের আশঙ্কা, সেখান থেকে চরমপন্থীরা ইসরায়েলি শহরগুলোয় হামলা চালাতে পারে।

এ দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে মুরাকামির অবস্থানের পার্থক্য এখানেই যে, মুরাকামি তার ‘ডিম ও দেয়াল’ রূপকে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, সামরিক শক্তি কিংবা রাজনৈতিক প্রয়োজনের হিসাবের আগে ব্যক্তিমানুষের ভঙ্গুরতাকে সামনে আনেন। হারারির আলোচনায় যেখানে নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের অস্তিত্বের বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যাকারী উপাদান, মুরাকামির রূপকে সেখানে মানুষের অনন্যতা ও নৈতিক মর্যাদা কেন্দ্রে থাকে।

মুরাকামির এ সর্বজনীনতার আরেকটি দিক দেখা যায় যখন তিনি নিজের মাতৃভূমির অতীতের দিকে তাকান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি সামরিক বাহিনীর আগ্রাসন ও নৃশংসতা তার সাহিত্যেও এসেছে। বিশেষ করে ‘দ্য উইন্ড-আপ বার্ড ক্রনিকল’ এবং পরে ‘কিলিং কমেন্ডাটোর’-এ নানকিং গণহত্যার প্রসঙ্গ রয়েছে। লেখায় জাপানের যুদ্ধকালীন ইতিহাস নিয়ে এমন আলোচনার কারণে জাতীয়তাবাদী মহলের বিরোধিতার মুখেও পড়তে হয়েছে তাকে।

মুরাকামি ২০১৫ সালের এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, জাপান অতীতে যেসব দেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তাদের কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়া উচিত। তার বক্তব্য ছিল, ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ ক্ষমা না করা পর্যন্ত এ প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া উচিত জাপানের। ফলে ‘ডিম ও দেয়াল’ রূপককে কেবল অন্য দেশের সমালোচনার হাতিয়ার হিসেবে দেখলে মুরাকামির অবস্থানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়।

এখানেই ‘লেখকের দায়’ ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একজন লেখক কি কেবল কাল্পনিক গল্পের রসদ জোগাবেন, নাকি ক্ষমতার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অবস্থানও জানাবেন? মুরাকামির জেরুজালেম বক্তৃতার উত্তর ছিল—লেখককে কোনো রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র হতে হবে না, কিন্তু মানুষের মর্যাদা ও ব্যক্তিসত্তার ওপর আঘাত এলে নীরবতাই একমাত্র পথ নয়।

জেরুজালেমের মঞ্চে দাঁড়িয়ে হারুকি মুরাকামি তাই শুধু একটি সাহিত্য পুরস্কার গ্রহণ করেননি; তিনি নিজের সাহিত্যিক বিশ্বাসের একটি সংক্ষিপ্ত রূপও বিশ্বের সামনে এনেছিলেন। যে বক্তব্য হয়ে উঠেছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের সামনে দাঁড়িয়ে সত্য উচ্চারণের এক মাস্টারক্লাস। সিস্টেম যতই শক্তিশালী হোক, তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি শেষ পর্যন্ত একটি ভঙ্গুর ডিম। আর সেই ডিমের ভঙ্গুরতাকেই দৃশ্যমান করা—হয়তো এটাই মুরাকামির কাছে সাহিত্যের সবচেয়ে বড় নৈতিক কাজ।

আরও