চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ পরিচিত অনেক উদ্ভিদ হয়তো আর টিকে থাকবে না। জলবায়ু পরিবর্তন ক্রমেই এসব উদ্ভিদ প্রজাতি বিলুপ্তির বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে। বদলে দিচ্ছে তাদের টিকে থাকার উপযোগী আবাসস্থল ও অনেক ক্ষেত্রে সংকুচিত করছে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
ভবিষ্যতে অসংখ্য ভাসকুলার উদ্ভিদের বিস্তৃতি কেমন হতে পারে তা নিয়ে সম্প্রতি মডেল তৈরি করেছেন গবেষকরা। এখানে এমন উদ্ভিদ বোঝানো যাচ্ছে, পানি ও পুষ্টি পরিবহনের জন্য যাদের দেহে বিশেষ টিস্যু থাকে। পৃথিবীর প্রায় সব উদ্ভিদই এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। গবেষণায় ৬৭ হাজারের বেশি প্রজাতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যা বিশ্বের পরিচিত ভাসকুলার উদ্ভিদের প্রায় ১৮ শতাংশ।
গবেষণায় দেখা গেছে, এসব উদ্ভিদের ৭-১৬ শতাংশই বিস্তৃতির ৯০ শতাংশেরও বেশি সংকুচিত হতে পারে, যা প্রজাতিগুলোকে বিলুপ্তির উচ্চ ঝুঁকিতে ফেলবে। এর মধ্যে রয়েছে ক্যালিফোর্নিয়ার বিরল ক্যাটালিনা আয়রনউড বা আইল্যান্ড আয়রনউড গাছ, যার বংশধারা ৪০ কোটিরও বেশি বছর পুরোনো। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে পরিচিত উদ্ভিদগোষ্ঠীগুলোর একটি ইউক্যালিপটাসের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রজাতিও বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
গবেষকরা লাখ লাখ উদ্ভিদের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য এবং ২০৮১ থেকে ২১০০ সাল পর্যন্ত গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ পরিস্থিতির সম্ভাব্য চিত্র বিশ্লেষণ করে এ মডেল দাঁড় করিয়েছেন।
একটি উদ্ভিদের আবাসস্থল শুধু মানচিত্রে চিহ্নিত কোনো জায়গা নয়। বরং উদ্ভিদটির বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন এমন সব পরিবেশগত উপাদানের সমষ্টি। এর মধ্যে রয়েছে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, মাটি, ভূমি ব্যবহার এবং ছায়ার মতো ভূদৃশ্যগত বৈশিষ্ট্য।
ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্টডক্টরাল গবেষক জুনা ওয়াং ও ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া ডেভিসের পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতি বিভাগের অধ্যাপক শিয়াওলি ডং যৌথ মন্তব্যে বলেন, ‘পরিস্থিতিটি কল্পনা করার একটি উপায় হলো উদ্ভিদগুলো যেন একটি চলমান “বেঁচে থাকার উপযোগী জলবায়ু বলয়” অনুসরণের চেষ্টা করছে। তাপমাত্রা বাড়লে অনেক প্রজাতি ঠান্ডা পরিবেশে থাকতে উত্তর দিকে বা উঁচু এলাকায় সরে যেতে পারে। কিন্তু শুধু তাপমাত্রাই পুরো গল্প নয়।’
ওয়াং ও ডং গবেষণাটির নেতৃত্বদানকারী দলের অংশ ছিলেন। গবেষণাটি বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্সে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তন এমন পরিবেশগত সমন্বয়কে সংকুচিত করছে। ফলে একটি প্রজাতির টিকে থাকতে প্রয়োজনীয় সব শর্ত একসঙ্গে বিদ্যমান এমন এলাকা কমে যাচ্ছে।
উদ্ভিদের ক্ষেত্রে বিস্তার বা স্থানান্তর অর্থ হলো বীজ বা স্পোর বাতাস, পানি, প্রাণী বা মাধ্যাকর্ষণের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে গবেষকরা বাস্তবসম্মত বিস্তার পরিস্থিতির সঙ্গে কল্পিত পরিস্থিতির তুলনা করে দেখছেন, উদ্ভিদ যেকোনো নতুন বিস্তান উপযোগী এলাকায় পৌঁছালেও বিলুপ্তির হার প্রায় একই পাওয়া যায়।
ওয়াং ও ডং বলেন, ‘যদি ধীরগতির বিস্তারই প্রধান সমস্যা হতো, তাহলে উদ্ভিদকে অবাধে নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে দিলে বিলুপ্তির ঝুঁকি নাটকীয়ভাবে কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু আমরা তা পাইনি।’
এটি সংরক্ষণ কৌশলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে তারা উল্লেখ করেন।
তাদের ভাষায়, ‘যদি বিস্তারের সীমাবদ্ধতাই মূল কারণ হতো, তাহলে অ্যাসিস্টেড মাইগ্রেশন বা প্রজাতিকে শারীরিকভাবে নতুন এলাকায় স্থানান্তর করার মতো কৌশল অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারত। কিন্তু যদি জলবায়ু পরিবর্তন সামগ্রিকভাবেই উপযোগী আবাসস্থলের পরিমাণ কমিয়ে দেয়, তাহলে শুধু স্থানান্তরে সহায়তা করাই যথেষ্ট হবে না।’
অঞ্চলভেদে সম্ভাব্য প্রভাবও ভিন্ন হবে। আর্কটিক অঞ্চলের ঠান্ডা-নির্ভর উদ্ভিদগুলো চরম শীতল জলবায়ুর এলাকা সংকুচিত হওয়ায় আবাসস্থল হারাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চল ও ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চলসহ শুষ্ক এলাকাগুলোতে তীব্র খরা, মাটির আর্দ্রতা কমে যাওয়া এবং ঘন ঘন দাবানলের ঝুঁকি বাড়বে। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ ও পূর্ব উপকূলে সমুদ্রতট উত্তর বা দক্ষিণ মেরুমুখী বিস্তারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তবে একই সঙ্গে গবেষকরা দেখেছেন, পৃথিবীর প্রায় ২৮ শতাংশ স্থলভাগে স্থানীয় উদ্ভিদের বৈচিত্র্য বাড়তেও পারে। বিশেষ করে উষ্ণমণ্ডলীয় ও উপ-উষ্ণমণ্ডলীয় কিছু এলাকায় বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন কিছু প্রজাতির জন্য পরিবেশ উপযোগী হয়ে উঠতে পারে।
গবেষকরা এ পরিবর্তনকে ‘বৈশ্বিক পুনর্বিন্যাস’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এতে কিছু উদ্ভিদ তাদের ঐতিহাসিক বিস্তৃতির অংশ থেকে হারিয়ে যাবে, আবার অন্যরা নতুন এলাকায় প্রবেশ করবে। তবে স্থানীয়ভাবে প্রজাতি বাড়লেও সামগ্রিকভাবে উদ্ভিদজগতের অবস্থার উন্নতি হচ্ছে এমন নয় বলে তারা সতর্ক করেছেন।
এ পরিবর্তনের ফলে ‘নতুন ধরনের উদ্ভিদ সমাজ’ও গড়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ এমন সব উদ্ভিদের সমন্বয়, যারা অতীতে কখরো একসঙ্গে বাস করেনি, ভবিষ্যতে প্রথমবারের মতো একে অপরের সংস্পর্শে আসবে। তবে এসব পারস্পরিক সম্পর্ক কীভাবে কাজ করবে, তা এখনো জানা যায়নি বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।
স্থলভিত্তিক প্রায় সব বাস্তুতন্ত্রের ভিত্তি হলো উদ্ভিদ। কার্বন সংরক্ষণ, মাটির স্থিতিশীলতা, বন্যপ্রাণীকে সহায়তা এবং খাদ্য, কাঠ, ওষুধসহ নানা উপকরণ সরবরাহ করে উদ্ভিদ। ফলে তাদের বৈচিত্র্যের পরিবর্তন প্রকৃতি ও মানুষের ওপর ধারাবাহিক প্রভাব ফেলতে পারে।
ওয়াং ও ডং বলেন, ‘যদি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উদ্ভিদের আচ্ছাদন কমে যায়, তাহলে বাস্তুতন্ত্র বায়ুমণ্ডল থেকে কম কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করবে, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা আরো বাড়াতে পারে। এতে একটি প্রতিক্রিয়াশীল চক্র তৈরি হয়। জলবায়ু পরিবর্তন উদ্ভিদকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং উদ্ভিদের আচ্ছাদন বা উৎপাদনশীলতা কমে গিয়ে আবার জলবায়ু পরিবর্তনকে আরো তীব্র করে তোলে।’
তারা আরো বলেন, ‘সবশেষে, উদ্ভিদ বৈচিত্র্য রক্ষা শুধু প্রকৃতিকে সংরক্ষণের বিষয় নয়; এটি মানবসমাজকে টিকিয়ে রাখতে পরিবেশগত ব্যবস্থাগুলোকে রক্ষা করারও প্রশ্ন।’
রয়টার্স অবলম্বনে