ইবনে মুকলা। পুরো নাম আবু আলি মুহাম্মদ ইবনে আলি ইবনে মুকলা। নবম শতাব্দীর শেষদিকে আব্বাসীয় খেলাফতের অধীনে বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তিনি একাধারে ছিলেন ক্যালিগ্রাফার, গণিতবিদ ও রাজনীতিক। একাধিকবার তিনি আব্বাসীয় খলিফাদের উজির হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে তিনি ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন রাজনীতিক হিসেবে নয় বরং কলমের মাধ্যমে, নিজের সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে।
ইবনে মুকলার জন্মের অন্তত পাঁচশো বছর আগে বিকশিত হওয়া আরবি ক্যালিগ্রাফিকে গাণিতিক জ্ঞান দিয়ে তিনি নতুন রূপ দিয়েছিলেন। তখন ক্যালিগ্রাফিতে একটি ধারাই প্রচলিত ছিল। সেটা হলো কুফিক লিপি। বাগদাদের কুফা শহরের নামানুসারে অষ্টম শতাব্দীতে এ লিপির নামকরণ করা হয়। এর আগে নাবাতীয় লিপি থেকে বিবর্তিত হয়ে যে লিপি প্রচলিত ছিল তাতে সংরক্ষিত হতো কুরআনের বিভিন্ন পান্ডুলিপি, বিভিন্ন লেখা। ইবনে মুকলা এ ব্যবস্থার সংস্কার করেন। বিশেষ করে কুফিক লিপির।
কুফিক লিপি মূলত কোণাকৃতি ও জ্যামিতিক বৈশিষ্ট্যের জন্য পরিচিত হলেও, এর ব্যবহারে কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম ছিল না এবং সর্বজনস্বীকৃত কোনো মানদণ্ডও গড়ে ওঠেনি। ফলে এ লিপির নানা রকম রূপ দেখা যেত। এ মানদণ্ডহীনতার অবসান ঘটে ইবনে মুকলার হাত ধরে।
ইবনে মুকলা পুরোনো ধারা বাদ দিয়ে ক্যালিগ্রাফিতে আল-খাত-আল-মানসুব অর্থাৎ অনুপাতভিত্তিক লিপি প্রণয়ন করেন। এ নীতিমালায় দুধরনের বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, একটা হলো, জ্যামিতিক বিন্যাস। অন্যটা হলো, এ লিপির মাধ্যমে তিনি খোদায়ী বিশ্বাস প্রতিফলিত করতেন।
এ নীতিমালার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো আরবি অক্ষরকে একটি নির্দিষ্ট মাপে বেঁধে দেন। ‘আলিফ’-এর দৈর্ঘ্যকে মানদণ্ড ধরে তিনি বাকি অক্ষরগুলোর উচ্চতা, প্রস্থ ও বাঁক নির্ধারণ করেন। বৃত্ত, সরলরেখা ও বিন্দুর সাহায্যে অক্ষরের কাঠামো নির্মাণ ছিল তার যুগান্তকারী চিন্তা। এর ফলে ক্যালিগ্রাফি শুধু শিল্প নয়, এক ধরনের দৃশ্যমান গণিতে পরিণত হয়।
এ অনুপাত নির্ধারণ করা হতো তিনটি পরিমাপক এককের মাধ্যমে। ক্যালিগ্রাফারের কলমের নিব দিয়ে তৈরি রম্বসাকৃতির নোকতা, আরবি বর্ণমালার প্রথম অক্ষর আলিফের দৈর্ঘ্য, এবং একটি বৃত্ত-যার ব্যাস আলিফের উচ্চতার সমান। এককগুলোর ভিত্তিতেই সব অক্ষরের আকার নির্ণয় করা হতো। এ পদ্ধতি ছয়টি ক্যালিগ্রাফিক লিপিতে মানা হতো।
এ ছয় লিপিকে একসঙ্গে আল-আকলাম আল-সিত্তা বলা হয়। সেগুলো হলো, নাসখ, মুহাক্কাক, রাইহানি, সুলুস, রিকা এবং তাওকী। মুহাক্কাক লিপিতে আলিফের উচ্চতা আট বিন্দু, সুলুসে সাত বিন্দু এবং তাওকীতে ছয় বিন্দু। এ কারণেই ইবন মুকলাকে অনেকেই "লেখার প্রকৌশলী" বলে অভিহিত করেন। অক্ষরগুলো প্রতিলিপি করার ক্ষেত্রে তিনি গাণিতিক নির্ভুলতা আনেন এবং জ্যামিতিক নকশার নির্ভুলতা আনেন।
যদিও তার নিজের হাতে লেখা কোনো পূর্ণাঙ্গ পাণ্ডুলিপি আজও পাওয়া যায় না, তবু তার প্রবর্তিত নিয়ম অনুসরণ করেই পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে ইবন আল-বাওয়াব ও ইয়াকুত আল-মুস্তাসিমির মতো শিল্পীরা ক্যালিগ্রাফিকে চূড়ান্ত উৎকর্ষে নিয়ে যান। এ অর্থে, ইবনে মুকলা হলেন এমন এক স্থপতি, যার তৈরি নকশার ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠেছে আরবি ক্যালিগ্রাফির সংস্কৃতি।
ইবনে মুকলার প্রণীত নীতিমালা কুরআনের পান্ডুলিপি লেখার ক্ষেত্রে, রাজকীয় আদেশ ও দরবারের নথিপত্র, মসজিদের খোদাই, স্থাপত্য খোদাই, ইসলামী শিল্পের শৈল্পিক পরিচয়, ক্যালিগ্রাফি স্কুলের প্রশিক্ষণ পদ্ধতি এবং আধুনিক আরবি ফন্ট ও ডিজিটাল টাইপোগ্রাফি—সব ক্ষেত্রে গভীর প্রভাব ফেলে। বর্তমান সময়ের ক্যালিগ্রাফাররা এখনও তার নীতিমালা অধ্যয়ন করেন, এবং মিউজিয়াম ও শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো ইসলামী শিল্প শেখানোর সময় তার জ্যামিতিক পদ্ধতিকে প্রায়শই উল্লেখ করে।
ইবনে মুকলার উজ্জ্বল শিল্পজীবনের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ছিল এক অন্ধকার রাজনৈতিক বাস্তবতা। সেই সময়ের আব্বাসীয় দরবার ছিল ষড়যন্ত্রে ভরা। ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে তিনি একাধিকবার অপসারিত হন, কারাবন্দি হন এবং পুনরায় ক্ষমতায় ফেরেন। শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বীরা জয়ী হন। নানা অভিযোগের দায়ে তার ডান হাত কেটে কারাগারে পাঠানো হয়। সেখানে অবস্থা ক্রমশ খারাপ হওয়ায় তাকে একজন ডাক্তার দেখতে যান। তখন তিনি ক্রন্দনরত অবস্থায় বলেন, ‘তারা আমার হাত কেটে ফেলেছে যে হাত দিয়ে আমি দুবার কুরআন লিপিবদ্ধ করেছি। এমন ভেবে কেটেছে যেন আমি চোর।’ এরপর তিনি বাঁ হাত দিয়ে লেখা চালিয়ে যান। পরে তার জিহ্বাও কেটে নেয়া হয়। শেষ জীবন কাটে কারাগারে। সেখানেই ৯৪০ খ্রিস্টাব্দে তিনি মারা যান।
ইরাকি ক্যালিগ্রাফার ও শিল্পী হাসান মাসউদি বলেন, ইবনে মুকলার ওপর আব্বাসীয় সমাজের নিপীড়ন আমাদের হতবাক করে। মুকলা মনে করতেন, আব্বাসীয় সমাজ ও শাসকগোষ্ঠী ভোগবিলাস ও অবক্ষয়ে নিমগ্ন হওয়ায় কুফিক লিপির কঠোর ও গম্ভীর শৈলী তাদের জন্য প্রযোজ্য নয়; বরং তাদের জন্য প্রয়োজন ছিল তুলনামূলকভাবে কোমল ক্যালিগ্রাফিক শৈলী।