শিশুকে সবকিছু দেয়া হচ্ছে— শুধু বাদ পড়ছে ‘না’ শোনার শিক্ষা

শিশুরা আমাদের নীতিবাক্য যতটা শোনে, আমাদের আচরণ তার চেয়ে বেশি দেখে

এখন প্যারেন্টিংয়ের সমীকরণের মধ্যে ঢুকে পড়েছে আরেকটি শক্তিশালী চরিত্র— সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। একটি শিশু এখন শুধু পাশের বাড়ির শিশুটির সঙ্গে নিজেকে তুলনা করে না। তার সামনে প্রতিদিন শত শত জীবনের নির্বাচিত সংস্করণ হাজির হয়— নতুন ফোন, বিদেশ ভ্রমণ, দামি পোশাক, বিশাল জন্মদিন, সুন্দর ঘর, আরো সুন্দর জীবন। সে জানে না কোনটি বাস্তব, কোনটি সাজানো। কিন্তু তার মনের প্রশ্নটি বাস্তব: ‘ওর আছে, আমার নেই কেন?’

রাত তখন প্রায় এগারোটা। একটি বাচ্চা ঘরে বসে কাঁদছে। নতুন খেলনাটি চা-ই তার। ঘরে এরই মধ্যে অনেকগুলো খেলনা পড়ে আছে। মা বোঝাচ্ছেন, বাবা বিরক্ত হয়ে বলছেন, ‘কাল কিনে দেব।’ কিন্তু কান্না বেড়েই যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত বাবা মোবাইলটা এগিয়ে দিলেন। কান্না থেমে গেল।

ওপরের দৃশ্যটি খুব সাধারণ। এত সাধারণ যে এর ভেতর কোনো বিপদ আছে বলে মনেই হয় না। এখানেই গল্পটি ‘অবাধ্য শিশু’র নয়। বরং বড়দের এক ধরনের ভালোবাসার গল্প, যে ভালোবাসা কখনো কখনো সন্তানকে কষ্ট থেকে দূরে রাখতে গিয়ে কষ্ট সামলানোর ক্ষমতাটিই শেখাতে পারে না। তাহলে কি দোষটা প্যারেন্টিংয়ের?

শিশুকে ভালো রাখা আর সবসময় ভালো লাগার মধ্যে রাখা এক জিনিস নয়। পার্থক্যটি যত ছোট মনে হয়— প্যারেন্টিংয়ের জগতে তার প্রভাব তত গভীর। ‘না’ একটি ছোট শব্দ। কিন্তু একটি শিশুর জন্য সেটিই হয়তো পৃথিবীর প্রথম বড় বাস্তবতা। সব খেলনা পাওয়া যাবে না। সব বন্ধু আপনাকে পছন্দ করবে না। সব সম্পর্ক টিকবে না। সব দরজা খুলবে না। কেউ আপনার সঙ্গে একমত হবে না। কখনো কখনো আপনি ভালো মানুষ হয়েও হেরে যাবেন।

শৈশবের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো— এই ছোট ছোট অস্বস্তির সঙ্গে পরিচিত হওয়া, অপেক্ষা করা, না পাওয়া, হেরে যাওয়া, রাগ সামলানো, নিজের ভুলের পরিণতি দেখা। মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশন রেগুলেশন’ বা আবেগ নিয়ন্ত্রণের বিকাশের সঙ্গে পরিবারে বাবা-মায়ের প্রতিক্রিয়া, আচরণের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। অর্থাৎ শিশু শুধু কীভাবে আচরণ করতে হবে তা শেখানো না, বড়রা নিজেদের আবেগ কীভাবে সামলায়, সেটিও শিশুরা দেখে শেখে।

তাই প্রতিটি কান্নার শেষে যদি ‘হ্যাঁ’ আসে, প্রতিটি ব্যর্থতার পরে যদি বাবা-মা এসে সমস্যাটি মিটিয়ে দেন, প্রতিটি ভুলের পর যদি শিশুকে দায় থেকে সরিয়ে নেয়া হয়— তাহলে শিশুটি হয়তো ধীরে ধীরে একটি অদৃশ্য ধারণা তৈরি করে ফেলতে পারে। আমার অস্বস্তি সহ্য করার দায়িত্ব আমার নয়, অন্য কারও।

সেখান থেকেই ‘আমি চাই’ কখনো কখনো বদলে যায় ‘আমার পাওয়াই উচিত’-এ।

অবশ্য একটি খেলনা, একটি ফোন বা কয়েকটি আবদার পূরণ করলেই কোনো শিশু এমন হয়ে যায় না। শিশুর ব্যক্তিত্ব অনেক জৈবিক, পারিবারিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তৈরি হয়। গবেষণাও প্যারেন্টিং এবং আচরণের সম্পর্ককে সরল কারণ-ফল হিসেবে দেখে না। কিন্তু অতিরিক্ত আদরের সঙ্গে শিশু-কিশোরদের বাহ্যিক এবং অন্তর্গত সমস্যার ছোট কিন্তু পরিমাপযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া গেছে। অর্থাৎ বিপদটি ‘বেশি আদর’ নয়। বিপদ হতে পারে আদরের সঙ্গে সীমার অনুপস্থিতি।

বাংলাদেশে গল্পটির আরো একটি অস্বস্তিকর দিক আছে। আমাদের অনেক বাবা-মা সন্তানকে সবকিছু দিতে চান শুধু বিলাসিতার কারণে নয়, কখনো নিজের না-পাওয়ার ক্ষত থেকেও। যে বাবা ছোটবেলায় নতুন জুতা পাননি, তিনি সন্তানের জন্য জুতার তাক ভরে দিতে চান। যে মা নিজের ইচ্ছামতো পড়তে পারেননি, তিনি সন্তানের সামনে পৃথিবীর সব দরজা খুলে দিতে চান। যে পরিবার অভাবের মধ্যে বড় হয়েছে, তারা সন্তানের জীবনে কোনো অভাব দেখতে চায় না। এটি ভালোবাসারই একটি ভাষা। কিন্তু ‘আমার সন্তান আমার মতো কষ্ট পাবে না’— এই স্বপ্ন কখনো কখনো অজান্তেই বদলে হয়ে যায় ‘আমার সন্তান কোনো কষ্টই পাবে না’। দুটির মধ্যে বিশাল পার্থক্য। প্রথমটি সন্তানের জীবনকে ভালো করতে চায়। দ্বিতীয়টি তাকে জীবনের জন্য অপ্রস্তুত করতে পারে।

বাংলাদেশের প্যারেন্টিং নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এখানেই আবার সাবধান হতে হয়। কারণ ‘শিশুকে না বলতে শেখানো’কে যদি আমরা ‘আরো কঠোর হওয়া’ বলে বুঝি, তাহলে আমরা সমস্যাটির উল্টো প্রান্তে চলে যাব। বাংলাদেশের সর্বশেষ ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫’বলছে, ১-১৪ বছর বয়সী ৮৫ দশমিক ৭ শতাংশ শিশু জরিপের আগের এক মাসে কোনো না কোনো ধরনের শারীরিক শাস্তি এবং/অথবা ‘সাইকোলোজিক্যাল এগ্রেশন’ অভিজ্ঞতা করেছে। ২০১৯ সালে এই হার ছিল ৮৮ দশমিক ৮ শতাংশ। অবস্থার উন্নতি হয়েছে, কিন্তু ব্যবধানটি এখনো বিপুল। অর্থাৎ বাংলাদেশের শিশুরা শুধু অতিরিক্ত প্রশ্রয়ের সমস্যায় নেই। একই সমাজে বিপুলসংখ্যক শিশু এমন শাসনের মধ্যেও বড় হচ্ছে যেখানে ‘না’ মানে কখনো চিৎকার, অপমান কিংবা আঘাত। এই দুইপ্রান্ত— অতিরিক্ত প্রশ্রয় ও অতিরিক্ত কঠোরতা দেখতে বিপরীত হলেও তাদের একটি জায়গায় মিল আছে। দুটিই শিশুকে নিজের আবেগ সামলানোর সুযোগ কম দিতে পারে।

একটিতে বলা হয়, ‘তোমার অস্বস্তি আমি সরিয়ে দেব।’ অন্যটিতে বলা হয়, ‘তোমার অস্বস্তি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।’ সুস্থ প্যারেন্টিংয়ের ভারসাম্য সম্ভবত এর মাঝখানে। সেখানে বাবা-মা বলতে পারেন—‘আমি বুঝতে পারছি তুমি রাগ করেছ। কিন্তু উত্তরটা না’। এই একটি বাক্যের মধ্যে অদ্ভুত এক ভারসাম্য আছে। শিশুর অনুভূতিকে স্বীকার করা হচ্ছে, কিন্তু অনুভূতিকে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার দেয়া হচ্ছে না। কারণ রাগ করা যায়। অন্যায় করা যায় না। কষ্ট পাওয়া যায়। অন্যকে আঘাত করা যায় না। কিছু চাইতে পারা যায়। অন্যের অধিকার কেড়ে নেয়া যায় না। এই সীমারেখাগুলোই ধীরে ধীরে সহামুভূতির ভিত্তি তৈরি করে— আমার অনুভূতি যেমন সত্যি, অন্য মানুষের অনুভূতিও তেমন সত্যি। এখানেই প্যারেন্টিংয়ের সঙ্গে শিশুর ভবিষ্যৎ সামাজিক আচরণের একটি গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়।

এম্প্যাথি বা সহানুভূতি অনেক সময় বড় কোনো নৈতিক বক্তৃতা দিয়ে শেখানো যায় না। শেখানো যায় ছোট ছোট দৃশ্যে, বাড়ির সহায়তাকারীর সঙ্গে বাবা-মা কেমন কথা বলছেন, রিকশাচালককে কীভাবে সম্বোধন করছেন, কেউ ভুল করলে তাকে নিয়ে হাসছেন কিনা, নিজের ভুল হলে ক্ষমা চাইছেন কিনা। শিশুকে বলা হয়, ‘অন্যকে সম্মান করবে।’ কিন্তু সে যদি প্রতিদিন দেখে বড়রা দুর্বল মানুষকে অপমান করছে, তাহলে কথার চেয়ে দৃশ্যটাই বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

শিশুরা আমাদের নীতিবাক্য যতটা শোনে, আমাদের আচরণ তার চেয়ে বেশি দেখে। ইউনিসেফ বাংলাদেশও ‘প্যারেন্টিং গাইডেন্স'-এ এ্যক্টিভ লিসেনিং, এম্প্যাথি, পারষ্পরিক কথোপকথন এবং বাবা-মায়ের নিজেদের আচরণ দিয়ে উদাহরণ তৈরি করার ওপর জোর দেয়।

এখন প্যারেন্টিংয়ের সমীকরণের মধ্যে ঢুকে পড়েছে আরেকটি শক্তিশালী চরিত্র— সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। একটি শিশু এখন শুধু পাশের বাড়ির শিশুটির সঙ্গে নিজেকে তুলনা করে না। তার সামনে প্রতিদিন শত শত জীবনের নির্বাচিত সংস্করণ হাজির হয়— নতুন ফোন, বিদেশ ভ্রমণ, দামি পোশাক, বিশাল জন্মদিন, সুন্দর ঘর, আরো সুন্দর জীবন। সে জানে না কোনটি বাস্তব, কোনটি সাজানো। কিন্তু তার মনের প্রশ্নটি বাস্তব: ‘ওর আছে, আমার নেই কেন?’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে ‘না’ তাই শুধু বাবা-মায়ের বলা শব্দ নয়। এটি হয়ে উঠেছে তুলনার বিরুদ্ধে একটি ছোট্ট যুদ্ধ। এখানে সন্তানকে শুধু ‘কম চাইতে’ শেখানো যথেষ্ট নয়। তাকে শেখাতে হবে— অন্যের জীবন দেখে নিজের জীবনকে ছোট মনে না করা। কারণ ‘কনসিউমার কালচার’-এর সবচেয়ে বিপজ্জনক শিক্ষা হয়তো ‘আরো চাই’ নয়— বরং ‘যা আছে, তা যথেষ্ট নয়’। আর যে শিশু প্রতিটি অস্বস্তির দ্রুত সমাধান হিসেবে নতুন কিছু পেতে শেখে, তার কাছে অপেক্ষা, প্রত্যাখ্যান কিংবা বঞ্চনা আরো কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাই প্যারেন্টিংয়ের সবচেয়ে কঠিন কাজ হয়তো সন্তানকে কিছু না দেয়া নয়। বরং কখন না দিতে হবে, সেটি জানা।

আরও