- বইয়ের নাম ‘র্যাপ-চার: জুলাই অভ্যুত্থানের র্যাপসঙ্গীত’
- সম্পাদনা মিজানুর রহমান নাসিম
- সম্পাদনা সহযোগী এস এম জামিল বখতিয়ার
- প্রকাশক গ্রন্থিক
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে চব্বিশের জুলাই-অভ্যুত্থান কেবল একটি রেজিম পরিবর্তনের ঘটনা বা রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং এটি একই সঙ্গে একটি গভীর সাংস্কৃতিক ও ভাষিক বিচ্যুতি। এই অভূতপূর্ব গণজাগরণে প্রতিবাদের চিরচেনা বয়ান রাজনৈতিক বক্তৃতার চর্বিতচর্বণ বা ঐতিহ্যবাহী মিছিলের স্লোগানের গণ্ডি অতিক্রম করে সঙ্গীতের এক প্রান্তিক ধারার মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছিল। মূলধারার স্পটলাইটের বাইরে থাকা একদল তরুণ শিল্পীর হাত ধরে বাংলা র্যাপসঙ্গীত রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, স্বৈরতন্ত্র ও প্রশাসনিক ফ্যাসিবাদের বিপরীতে এক দুঃসাহসী উচ্চারণের প্রধান বাহন হয়ে উঠেছিল- এই বৈপ্লবিক রূপান্তরের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করাই আলোচ্য গ্রন্থ ‘র্যাপ-চার: জুলাই অভ্যুত্থানের র্যাপসঙ্গীত’-এর মূল উপজীব্য।
গ্রন্থটির প্রাথমিক ও সবচেয়ে মৌলিক তাৎপর্য এই জায়গায় যে, এটি র্যাপসঙ্গীতকে তারুণ্যের নিছক বিনোদন-চর্চা বা পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ হিসেবে না দেখে, একে একটি গভীর পাঠযোগ্য রাজনৈতিক টেক্সট হিসেবে বিবেচনা করেছে। র্যাপের প্রতিটি ভার্স এখানে হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক পাঠের এক তাৎপর্যপূর্ণ অনুষঙ্গ। যেখানে শিল্পীর ব্যক্তিগত আত্মকথন, ভাষা-ব্যবহারের রাজনীতি এবং শোষণের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক শক্তি নির্মাণের মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া—এই তিন স্তর একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে থাকে। ফলে গ্রন্থটি একাধারে সমকালীন এক উত্তাল সময়ের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অমূল্য দলিল এবং ভবিষ্যৎ প্রতিরোধ-রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের জন্য একটি অনিবার্য রেফারেন্স-বুক বা আকর গ্রন্থ।
‘র্যাপ-চার: জুলাই অভ্যুত্থানের র্যাপসঙ্গীত’ বইটি কেবল একটি মিউজিক্যাল ঘরানার বর্ণনামূলক বা ক্রনিক্যাল ইতিহাস নয়; বরং এটি প্রতিরোধের ভাষা, সাংস্কৃতিক বিকেন্দ্রীকরণ, রাজনৈতিক অভিপ্রায় এবং নেতৃত্ব-নির্মাণ প্রক্রিয়া—এই জটিল ও বহুমুখী বিষয়গুলোকে আন্তঃসম্পর্কযুক্তভাবে পাঠ করার এক সাহসী বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়াস। বাংলাদেশের দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা রাজধানী-কেন্দ্রিক ও এলিট শ্রেণির আধিপত্যশীল সাংস্কৃতিক শিল্প কীভাবে হঠাৎ করে রাজপথের ধুলোবালি থেকে উঠে আসা একটি প্রান্তিক সাংগীতিক ধারার কাছে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে এবং সেই ধারা কীভাবে জনগণের মূল কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়, তার একটি অনন্য বিশ্লেষণ এখানে পাওয়া যায়। এই কেন্দ্র-প্রান্তের মনস্তাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক টানাপড়েনকে গ্রন্থটি কেবল সাংস্কৃতিক শিল্প-ইতিহাসের ফ্রেমে না বেঁধে, সাংস্কৃতিক পুঁজির পুনর্বণ্টনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ঘটনা হিসেবেও পাঠ করার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে দেয়।
বিশ্বজুড়ে হিপ-হপ সংস্কৃতির চিরায়ত চারটি মূল ভিত্তি বা ধারা স্বীকৃত—এমসিইং বা কথ্য-ছন্দ, ডিজেইং, ব্রেকড্যান্সিং এবং গ্রাফিতি। চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের উত্তাল প্রেক্ষাপটে এই চারটির ভেতর থেকে মূলত এমসিইং ও গ্রাফিতিই রাজপথে প্রধান অস্ত্র হিসেবে প্রাধান্য পেয়েছিল। আলোচ্য গ্রন্থটিতে গবেষক ও লেখকদের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের ভেতর দিয়েই এই বস্তুনিষ্ঠ সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, বৈশ্বিক হিপ-হপ ঐতিহ্যের কোন উপাদানগুলো একটি স্থানীয় ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি কার্যকর হয়ে উঠবে, তা নির্ভর করে মূলত সেখানকার রাজনৈতিক তাৎক্ষণিকতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক অভিগম্যতার শর্তাবলীর ওপর। কারফিউ, টিয়ারগ্যাস এবং স্নাইপারের ভয়ের মুখে দাঁড়িয়ে দ্রুততম সময়ে শব্দ এবং দেয়ালকেই জনমানসে দ্রোহের আগুন জ্বালানোর সবচেয়ে সহজ ও দূরগামী তরিকা হিসেবে বেছে নিয়েছিল আন্দোলনকারী তরুণ প্রজন্ম।
তাবিব মাহমুদ
গ্রন্থটির বিশ্লেষণাত্মক সূত্রপাত ঘটেছে র্যাপ সংগীতের ঐতিহাসিক সূতিকাগার নিউ ইয়র্কের ব্রংক্স অঞ্চলের সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে। সত্তরের দশকে যেখানে চরম দারিদ্র্য, প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদ, বিরামহীন পুলিশি নিপীড়ন এবং চরম রাষ্ট্রীয় অবহেলা এক বিস্ফোরক সামাজিক ও মানবিক বাস্তবতা তৈরি করেছিল। তৎকালীন মার্কিন সমাজের শ্বেতাঙ্গ ও অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাভোগী শ্রেণির কাঠামোগত আধিপত্যের বিপরীতে কৃষ্ণাঙ্গ ও হিস্পানিক জনগোষ্ঠীর নিত্যদিনের বৈষম্য ও কানাগলি থেকেই জন্ম নিয়েছিল র্যাপ, যেখানে প্রতিটি গান হয়ে উঠেছিল এক-একটি দ্রোহের ঘোষণাপত্র। মূলধারার প্রাতিষ্ঠানিক মিডিয়া যখন তাদের দৈন্যদশা ও ক্ষোভকে চেপে যেতে চেয়েছিল, তখন সেই নিপীড়িত জনগোষ্ঠী নিজেদের বিকল্প রেডিও, দেয়াল-গ্রাফিতি, গ্যাং কালচার এবং সর্বোপরি র্যাপের মধ্য দিয়ে একটি সমান্তরাল সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিসর গড়ে তুলেছিল।
র্যাপের ঐতিহাসিক চরিত্রই হলো যেকোনো ধরনের কাঠামোগত বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র কণ্ঠস্বর নির্মাণ করা। চব্বিশের জুলাই-অভ্যুত্থানও যেহেতু দেড় দশকের দীর্ঘস্থায়ী বৈষম্য, ফ্যাসিবাদ ও রাষ্ট্রীয় একচেটিয়াবাদের বিরুদ্ধে এক সম্মিলিত সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল, তাই এই দুটি ভিন্ন ইতিহাস একটি সার্বজনীন বৈষম্যবিরোধী ঐতিহাসিক ‘পালস’-এর মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। এভাবে র্যাপ সঙ্গীত একটি বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক ভাষা থেকে বাংলাদেশের স্থানীয় রাজনৈতিক বয়ানের হিস্যা হয়ে ওঠে।
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে প্রতিবাদের কাব্যিক ও সাংগীতিক ঐতিহ্য একেবারেই কোনো আচানাক ঘটনা নয়। কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ ও ‘প্রলয়োল্লাস’ থেকে শুরু করে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের অগ্নিঝরা গণসঙ্গীত, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের উদ্দীপনামূলক গান, কিংবা ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের রাজপথের স্লোগান-সঙ্গীত—এই দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে হিপ-হপ বা র্যাপের সম্পর্ক ঠিক কোথায় গিয়ে মেলে কিংবা কোথায় বিচ্ছিন্ন হয়, সে বিষয়ে আরও দীর্ঘ তাত্ত্বিক আলোচনা হতে পারে। তবে, র্যাপকে আকাশ সংস্কৃতি থেকে হঠাৎ ঝরে পড়া সম্পূর্ণ আমদানীকৃত বৈশ্বিক মাধ্যম হিসেবে না দেখে, বরং বাংলা ভূখণ্ডের নিজস্ব প্রতিরোধী স্বর-ঐতিহ্যের এক আধুনিকতম ও প্রযুক্তিগত কড়ি হিসেবে পাঠ করাটাই হবে সর্বাধিক বস্তুনিষ্ঠ ও সহিহ তরিকা।
G State Mob
এই কিতাবের অন্যতম একটি কৌতুহলদ্দীপক ও মনস্তাত্ত্বিক অংশ হলো র্যাপের ছান্দিক ও শরীরবৃত্তীয় গঠনের গাণিতিক বিশ্লেষণ। সাধারণত ৯০ থেকে ১১০ বিপিএম-এর মধ্যে থাকা র্যাপের টেম্পো মানুষের স্বাভাবিক হৃদস্পন্দনের তাল ও ছন্দের খুব কাছাকাছি বলে গবেষকরা দাবি করেছেন। এই বিপিএম শ্রোতার স্নায়ুতন্ত্রের ভেতর এক অদ্ভূত মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরবৃত্তীয় সংযোগ তৈরি করে দ্রোহ ও ক্ষোভের অনুভূতির তীব্রতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে। ফরাসি দার্শনিক ও তাত্ত্বিক জাক আতালি বলেছিলেন, সঙ্গীত কেবল বিদ্যমান সমাজের নিছক প্রতিফলন ঘটায় না, বরং তা অনাগত রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের পূর্বাভাস বহন করে এবং নতুন বিপ্লবের পথ প্রস্তুত করে। বিপিএম-নির্ভর এই বৈজ্ঞানিক দাবিকে যদি একটি চিত্তাকর্ষক নন্দনতাত্ত্বিক অনুমান হিসেবেও বিবেচনা করা হয়, তবুও এই আলোচনা থেকে উঠে আসা মূল অন্তর্দৃষ্টিটি অত্যন্ত গভীর: র্যাপ শ্রোতাকে যতটা না বাহ্যিকভাবে আন্দোলিত করে, তারচেয়ে বেশি আন্দোলিত করে তার মনস্তত্ত্ব, মগজ ও চিন্তাপ্রক্রিয়াকে। এই অর্থে র্যাপকে নিছক আবেগ-উদ্দীপক গান না বলে, সমকালীন রাজনৈতিক চিন্তার এক শাণিত হাতিয়ার হিসেবে রূপায়িত করাই এই গ্রন্থের আসল সাফল্য।
ভাষাতাত্ত্বিক দিক থেকেও র্যাপের রাজনৈতিক গুরুত্ব লক্ষণীয়। ঢাকাইয়া কুট্টি ভাষা, পুরান ঢাকার আঞ্চলিক শব্দভাণ্ডার, ইংরেজি-বাংলার সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা কোড-সুইচিং, এবং প্রমিত ভাষার শাসন থেকে সরে আসা রুক্ষ, বেপরোয়া উচ্চারণভঙ্গি—এই সবকিছু মিলিয়ে র্যাপ একধরনের ভাষিক বিদ্রোহও বটে। মিখাইল বাখতিনের হেটেরোগ্লোসিয়া ধারণার আলোকে দেখলে, র্যাপের এই বহুস্বরিক, অপ্রমিত ভাষা-ব্যবহার আসলে প্রমিত বাংলার সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করার একটি কৌশল। যে মুলুকে শুদ্ধ ভাষা ও মার্জিত উচ্চারণ বহুদিন ধরে শ্রেণি-মর্যাদার সূচক হিসেবে কাজ করেছে, সেখানে গলিঘুঁজির খিস্তি-খেউড়মিশ্রিত র্যাপ-বাচন একটি সচেতন শ্রেণি-রাজনৈতিক অবস্থান নির্মাণ করে।
কিতাবটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক অবদান হলো র্যাপ ও গ্রাফিতির ভাষিক সংযোগ নিয়ে আলোচনা। জুলাই-অভ্যুত্থানকালে পুলিশি বাধার মধ্যেও কাঁপা হাতে আঁকা দেয়ালচিত্রগুলোতে কোনো বিমূর্ত রূপক বা উপমার আশ্রয় না নিয়ে সরাসরি ‘স্ল্যাং’ ও প্রত্যক্ষ ভাষা ব্যবহার করা হয়েছিল—যা র্যাপের চিরায়ত বাচনভঙ্গির সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। ‘গণতন্ত্র চাই’ বা ‘আমিই বাংলাদেশ’-এর মতো দেয়াল-লিখন, গান আর রাজনৈতিক পোস্টারের প্রচলিত সীমারেখা ভেঙে একটি নতুন ভিজ্যুয়াল-রাজনৈতিক ভাষা নির্মাণ করেছিল। গ্রন্থকারের লেখকরা এই গ্রাফিতিকে র্যাপেরই একটি ভিজ্যুয়াল রূপ হিসেবে পাঠ করেছেন— যা সঙ্গীত ও দৃশ্যভাষাকে মিলিয়ে একটি সামগ্রিক বিকল্প প্রতিবাদী ন্যারেটিভ তৈরি করে। সেমিওটিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই দুই মাধ্যমের মিলিত শক্তি মূলত ‘কোড থেকে সরাসরি উচ্চারণে’ উত্তরণের একটি প্রক্রিয়া—যেখানে রূপকের আশ্রয় ছেড়ে ক্ষোভ তার প্রত্যক্ষ সুরতেই হাজির হয়।
চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে মূলধারার ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া যখন রাষ্ট্রীয় ভয়, সেন্সরশিপ ও ব্ল্যাকআউটের মুখে স্থবির হয়ে পড়েছিল, তখন ইউটিউব, ফেসবুক ও টিকটকের মতো ডিজিটাল প্লাটফর্মে র্যাপ গানগুলো দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এটি প্রচলিত মিডিয়া-গেটকিপিং ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করে দিয়ে একটি বিকল্প অ্যালগরিদমিক পাবলিক স্ফিয়ার তৈরি করেছিল। মিডিয়া তত্ত্ববিদ জিনাসি পাপাচারিসির ‘অ্যাফেক্টিভ পাবলিকস’ কিংবা ন্যান্সি ফ্রেজারের ‘কাউন্টার-পাবলিক’ তত্ত্বের নিরিখে এই সামাজিক ঘটনাটি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা যায়, র্যাপের রাজনৈতিক কার্যকারিতা কেবল লিরিকস বা সুরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির বিতরণ-ব্যবস্থার সঙ্গেও গভীরভাবে সংযুক্ত ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমই এখানে শোষিত জনতার বিকল্প বার্তা পরিবেশক হিসেবে কাজ করেছে।
RAAFKY
গবেষণাগত দিক থেকে এই গ্রন্থের সবচেয়ে মূল্যবান ভিত্তি লুকিয়ে রয়েছে এর বিস্তৃত সাক্ষাৎকারভিত্তিক অধ্যায়গুলোতে। তাবিব মাহমুদ, G State Mob, RAAFKY, Mc Mugz-এর মতো তরুণ হিপ-হপ শিল্পীদের সরাসরি সাক্ষাৎকার এই গ্রন্থটিকে মৌখিক ইতিহাসের এক প্রামাণ্য দলিলে রূপান্তরিত করেছে। এই সাক্ষাৎকারগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাদের অনেকেই আন্দোলনের সময় সরাসরি রাজপথে যুক্ত ছিলেন, এবং তাদের সঙ্গীত রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি সচেতন রাজনৈতিক ভাষা নির্মাণের হাতিয়ার ছিল। এই অধ্যায়গুলোর অভিন্ন সুর হলো—শিল্পীদের কাছে র্যাপ কোনো নিছক পারফরম্যান্স নয়, বরং একটি প্রশ্ন-করার প্রক্রিয়া, যার মধ্য দিয়ে তারা রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়কেই জবাবদিহির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন। এভাবে কিতাবটি কেবল আর বিশ্লেষণাত্মক প্রবন্ধের সংকলন থাকে না, বরং একটি প্রাথমিক সূত্রনির্ভর ঐতিহাসিক আর্কাইভেও রূপান্তরিত হয়, যা ভবিষ্যৎ গবেষকদের জন্য অমূল্য রসদ হয়ে থাকবে।
এই সাক্ষাৎকারমূলক তরতিব বাংলাদেশ স্টাডিজের জন্য একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ঊনসত্তর কিংবা একাত্তরের সাংস্কৃতিক কর্মীদের মৌখিক জবানবন্দি সংরক্ষণের কাজ এ দেশে যে পরিমাণে হওয়া উচিত ছিল, ততটা হয়নি বলেই ইতিহাসবিদদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ। সেই জায়গা থেকে দেখলে, ‘র্যাপ-চার’-এর সাক্ষাৎকার-অধ্যায়গুলো নিছক কোনো সাংস্কৃতিক সাংবাদিকতা নয়— বরং এটি একটি ঐতিহাসিক জিমেদারি পালনের চেষ্টা, যেখানে ঘটনার তাৎক্ষণিকতা স্মৃতিতে অম্লান থাকা অবস্থাতেই তা লিপিবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের প্রেক্ষাপটে শিল্পীর ব্যক্তিগত ঝুঁকি ও নিরাপত্তাহীনতার প্রশ্নটিও এখানে বিশেষ বিবেচনার দাবি রাখে। যে মুলুকে গোয়েন্দা নজরদারি ও দলীয় ক্যাডার-নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সাহসী কণ্ঠস্বর দমিত হচ্ছিল, সেখানে প্রকাশ্যে রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্যসংবলিত গান প্রকাশ করা নিছক সৃজনশীল অভিব্যক্তি নয়, বরং এক ধরনের রাজনৈতিক ঝুঁকি-গ্রহণও বটে। এই বেপরোয়া অবস্থান একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন শিল্পী-সাহিত্যিকদের ঝুঁকি-গ্রহণের ঐতিহ্যের সঙ্গেই একধরনের ধারাবাহিকতা তৈরি করে।
Mc Mugz
গ্রন্থটি কেবল জুলাইয়ের সাফল্যকেই উদযাপন করে থামেনি, বরং এটি এক দূরদর্শী তুলনামূলক বৈশ্বিক পর্যালোচনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। তিউনিসিয়ার আরব বসন্তে এল জেনারেলের বিখ্যাত ‘রাইস লেব্লাদ’, ইরানের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে জীবন বাজি রাখা তুমাজ সালেহির র্যাপ, কিংবা চিলির সামাজিক আন্দোলনে হিপ-হপের দাবানল—এসব বৈশ্বিক উদাহরণের পাশাপাশি বাংলাদেশের র্যাপকে রেখে পাঠ করলে স্পষ্ট হয় যে, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে র্যাপের এই রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে ওঠা কোনো বিচ্ছিন্ন স্থানীয় ঘটনা নয়, বরং এটি বৈশ্বিক প্রতিরোধ সংস্কৃতির একটি সার্বজনীন ভাষা।
বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদী সংগীতের ইতিহাস দেখায় যে, আন্দোলন স্তিমিত হওয়ার পর মূলধারার বাণিজ্যিক শিল্প-কাঠামো প্রায়ই প্রতিরোধী ভাষাকে আত্তীকরণ করে তার রাজনৈতিক ধার ভোঁতা করে দেয়—যেমনটি ঘটেছিল যুক্তরাষ্ট্রে র্যাপের বাণিজ্যিকীকরণের ইতিহাসেও, যেখানে একসময়ের রাজনৈতিক প্রতিবাদের ভাষা ক্রমশ ভোগবাদী বিনোদন-শিল্পে রূপান্তরিত হয়েছিল। বাংলাদেশের র্যাপসঙ্গীত এই আত্তীকরণের ঝুঁকি কীভাবে মোকাবেলা করবে বা করছে, তা নিয়ে আরও গভীর তাত্ত্বিক অনুসন্ধান করবার ফুরসত রয়েছে। বিজ্ঞাপনী সংস্থা বা করপোরেট স্পনসরশিপের হাত ধরে যদি এই ধারা ক্রমেই মূলধারার শিল্প-বাণিজ্যে প্রবেশ করে, তবে তার রাজনৈতিক তীক্ষ্ণতা কতদিন অক্ষুণ্ণ থাকবে, সেই সব প্রশ্নের মীমাংসা আপাতত ভবিষ্যত গবেষণার এখতিয়ারেই রাখা যাক।
সামগ্রিক বিচারে, ‘র্যাপ-চার: জুলাই অভ্যুত্থানের র্যাপসঙ্গীত’ কেবল একটি সাংগীতিক ধারার বিবরণ নয়, বরং একটি প্রজন্মের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার হাতিয়ার হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া বিশ্লেষণের একটি প্রামাণ্য পাঠও বটে। ‘আওয়াজ উডা’, ‘কথা ক’, ‘ধ্বংস’, ‘চব্বিশের গেরিলা’-র মতো গান যখন কণ্ঠে কণ্ঠে উচ্চারিত হয়ে একটি অভ্যুত্থানের স্লোগানে রূপান্তরিত হয়, তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে র্যাপ বাংলাদেশের ইতিহাস-নির্মাণে একটি নতুন ভাষা যুক্ত করেছে।
সংশ্লিষ্ট প্রকাশনী ও লেখক-গবেষকদের এই সময়োপযোগী ও সাহসী প্রয়াস একাডেমিক ও সাংস্কৃতিক—উভয় পরিসরের জন্যই তাৎপর্যপূর্ণ অবদান। ইতিহাসবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংস্কৃতিক কর্মী—সকলের জন্যই এই কিতাবটি একটি অপরিহার্য পাঠ হয়ে থাকবে, এবং বাংলা ভাষায় র্যাপসঙ্গীত-বিষয়ক ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। জুলাই-অভ্যুত্থান কেবল একটি রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল না, এটি ছিল একটি সাংস্কৃতিক অভ্যুত্থানও বটে—যেখানে গণমানুষের প্রতিবাদী জবান হয়ে গর্জে উঠেছিল জুলাইয়ের র্যাপসঙ্গীত। এই গর্জনকে সময়োপযোগী দলিলে রূপান্তরিত করার মাকসাদেই ‘র্যাপ-চার: জুলাই অভ্যুত্থানের র্যাপসঙ্গীত’-এর মতো গ্রন্থের প্রকাশনা আগামী দিনের ইতিহাস-চর্চার জন্য একটি জরুরি নজির হয়ে থাকবে।
শহিদ ইসলাম: লেখক ও শিল্পী