জোনাকির আলো জ্বলে আর নেভে, শাল মহুয়ার বনে...
শুধু শাল মহুয়ার বন নয়; লেবু কিংবা বাঁশঝাড়, মেঠোপথ, ধানক্ষেত সর্বত্রই ছিল জোনাকির রাজত্ব। এমনকি নব্বই দশকের রাজধানী ঢাকার অনেক এলাকাতেও জোনাকির দেখা মিলত। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামলে সে ক্ষুদ্র সবুজাভ আলোর ঝিলিককে মনে হতো আকাশের ছোট ছোট তারা মাটির কাছাকাছি নেমে এসেছে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে ক্রমেই ম্লান হয়ে এসেছে জোনাকির আলো, আর সেই সঙ্গে নিভে গেছে আমাদের শৈশবের সবচেয়ে সুন্দর রঙিন অধ্যায়। নব্বইয়ের দশক বা তার আগের প্রজন্মে যারা শৈশব পার করেছেন, জোনাকি ছিল তাদের রাতের সঙ্গী। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকের সঙ্গে লোডশেডিংয়ের ঘন অন্ধকারে থমকে যেত চারপাশ, তখনই শুরু হতো জোনাকি ধরার উৎসব। হাত বাড়িয়ে আলতো করে জোনাকি ধরে দেশলাইয়ের খালি বাক্স কিংবা কাঁচের পরিষ্কার বয়ামে বন্দী করার আনন্দ ছিল শৈশবের অন্যতম সুখের সময়। বিছানার পাশে জোনাকি ভরা বয়াম নিয়ে রূপকথার গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ার স্মৃতি আজও বহু মানুষকে নস্টালজিক করে তোলে। সেই ছোট্ট আলোর বিন্দুগুলোই ছিল শিশুদের কল্পনা জগতের প্রথম আলোক উৎস। আজকের ডিজিটাল প্রজন্মের কাছে এমন অভিজ্ঞতা প্রায় রূপকথার মতো।
বিজ্ঞান বলে, জোনাকির আলো কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়। তাদের পেটের নীচে থাকা লুসিফেরিন নামের রাসায়নিক পদার্থ অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে এ আলো তৈরি করে। যা দিয়ে তারা মূলত সঙ্গীকে আকর্ষণ করে, নিজেদের পরিচয় জানায় এবং কখনো শিকারিদের সতর্ক করে। অর্থাৎ মানুষের ভাষার মতোই জোনাকিরও একটি নিজস্ব আলোক-ভাষা রয়েছে। কিন্তু আধুনিক সভ্যতার কৃত্রিম আলোর ভিড়ে সেই ভাষাই আজ হারিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে জোনাকির সংখ্যা দ্রুত কমে যাওয়ার পেছনে চারটি কারণ উল্লেখ করেছেন কীটতত্ত্ববিদরা।
প্রথমত, বাসস্থান ধ্বংস। জোনাকির লার্ভা আর্দ্র মাটি, ঘাসবন, ঝোপঝাড় ও জলাশয়ের আশপাশে বেড়ে ওঠে। কিন্তু নগরায়ণ, বন উজাড়, কৃষিজমির সম্প্রসারণ ও অবকাঠামো নির্মাণে এসব প্রাকৃতিক আবাস দ্রুত বিলীন হচ্ছে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন)-এর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বেথনি বিচ ফায়ারফ্লাই ইতোমধ্যে চরম সংকটাপন্ন প্রজাতিতে পরিণত হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার। কৃষিজমি ও বাগানে ব্যবহৃত রাসায়নিক কীটনাশক শুধু ক্ষতিকর পোকাই নয়, জোনাকির ডিম, লার্ভা এবং পূর্ণাঙ্গ পতঙ্গকেও ধ্বংস করছে। বিষাক্ত মাটি, পানি কিংবা শিকার খাওয়ার মাধ্যমেও তারা আক্রান্ত হয়।
তৃতীয়ত, আলোক দূষণ। শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই এখন এলইডি ও নিয়ন আলোর আধিপত্য। তীব্র কৃত্রিম আলোর কারণে জোনাকির নিজস্ব আলোর সংকেত আর স্পষ্ট থাকে না। ফলে সঙ্গী খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে এবং বংশবিস্তার ব্যাহত হয়।
চতুর্থত, জলবায়ু পরিবর্তন। তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও ঋতুচক্রের পরিবর্তন জোনাকির জীবনচক্রকে ব্যাহত করছে। আকস্মিক খরা, অতিবৃষ্টি কিংবা বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাদের লার্ভা।
জোনাকি শুধু রাতের সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; কৃষির বন্ধুও। বাস্তুতন্ত্রেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। জোনাকি প্রাকৃতিক বালাইনাশক হিসেবে কাজ করে। এর লার্ভা শামুক, স্লাগসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে কৃষির উপকার করে। অন্যদিকে জোনাকি নিজেও অনেক পাখি, ব্যাঙ ও অন্যান্য প্রাণীর খাদ্য। অর্থাৎ জোনাকির বিলুপ্তি পুরো খাদ্যশৃঙ্খলের ওপর বড় ধরণের আঘাত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জোনাকি রক্ষায় বড় কোনো প্রযুক্তির প্রয়োজন নেই। ঝোপঝাড় ও জলাভূমি সংরক্ষণ, অপ্রয়োজনীয় কৃত্রিম আলো কমানো, রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করলেই তাদের জন্য নিরাপদ আবাস তৈরি করা সম্ভব।