বিশ্ব নদী দিবস

নদীর বুকে পানি, প্রবাহে নেই প্রাণ

নদীকে কেবল পানির আধার হিসেবে দেখলে এ সংকটের গভীরতা বোঝা কঠিন। নদী একটি জীবন্ত প্রতিবেশব্যবস্থা। তার প্রবাহের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মাছ, জলজ উদ্ভিদ, পলি, তীর, কৃষি এবং নদীনির্ভর মানুষের জীবন। ফলে তাতে কী পরিমাণ পানি আছে—এ প্রশ্নের পাশাপাশি আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কখন সেই পানি প্রবাহিত হচ্ছে এবং প্রবাহের পরিমাণ নদী তার নিজের পরিবেশগত প্রয়োজন মেটাতে পারছে কিনা

বর্ষায় ভরে ওঠে নদী। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, পানিই যেন তার একমাত্র পরিচয়। স্রোতের শব্দে মুখর হয়ে ওঠে দুই তীর, নৌকা ছুটে চলে, জল ছড়িয়ে পড়ে কূল ছাপিয়ে। কয়েক মাস পর সেই নদীর বুকেই জেগে উঠে চর। কোথাও হাঁটুসমান পানি, কোথাও কাদামাটির ওপর পড়ে থাকে নৌকা। একই নদীর এমন দুই রূপ বাংলাদেশের পরিচিত দৃশ্য।

কিন্তু নদীর গল্প কেবল পানি বাড়া-কমার নয়। নদীর বুকে পানি থাকলেই কেবল নদী বেঁচে থাকে না। তারও প্রয়োজন হয় নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রবাহ। যে প্রবাহে জলজ প্রাণী টিকে থাকে, মাছের আবাস বজায় থাকে, পলি সরে যায়, পানির স্বাভাবিক গুণাগুণ রক্ষা হয় এবং নদীর প্রতিবেশব্যবস্থা সচল থাকে। নদীর প্রয়োজনীয় এ প্রবাহই পরিবেশগত বা ইনভায়রনমেন্টাল ফ্লো।

২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা সম্মেলনে উপস্থাপিত বাংলাদেশের প্রধান নদীগুলোর ওপর একটি পর্যালোচনায় উঠে আসে, শুষ্ক মৌসুমে বহু নদী প্রয়োজনীয় পরিবেশগত প্রবাহ থেকে বঞ্চিত। বর্ষায় আবার কোনো কোনোটিতে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি প্রবাহ। ফলে নদীর স্বাভাবিক ছন্দে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের অমিল—কোথাও পানি কম, কোথাও বেশি। অর্থাৎ দুই ক্ষেত্রেই নদীর স্বাভাবিক ছন্দে তৈরি হচ্ছে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য।

নদীকে কেবল পানির আধার হিসেবে দেখলে এ সংকটের গভীরতা বোঝা কঠিন। নদী একটি জীবন্ত প্রতিবেশব্যবস্থা। তার প্রবাহের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মাছ, জলজ উদ্ভিদ, পলি, তীর, কৃষি এবং নদীনির্ভর মানুষের জীবন। ফলে তাতে কী পরিমাণ পানি আছে—এ প্রশ্নের পাশাপাশি আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কখন সেই পানি প্রবাহিত হচ্ছে এবং প্রবাহের পরিমাণ নদী তার নিজের পরিবেশগত প্রয়োজন মেটাতে পারছে কিনা।

বিশ্বজুড়ে নদীর পরিবেশগত প্রবাহ নির্ধারণে ২০০টির বেশি পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে রয়েছে জলবিদ্যাগত, হাইড্রলিক রেটিং, আবাসস্থল সিমুলেশন এবং সমন্বিত বা হোলিস্টিক পদ্ধতি। এসবে মূলত নদীর পানি, জীববৈচিত্র্য, আবাসস্থল ও মানুষের ব্যবহারসহ বিভিন্ন দিক বিবেচনায় নেয়া হয়।

দেশের নদীগুলোর মৌসুমি চরিত্র এমনিতেই প্রবল। বর্ষায় উজান ও বৃষ্টির পানিতে নদী ফুলে ওঠে, শুষ্ক মৌসুমে কমে আসে প্রবাহ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পানি প্রত্যাহার, প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, বাঁধ ও জলাধার নির্মাণ, ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন, বন উজাড় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব।

প্রধান নদীগুলোর দিকে তাকালে প্রবাহের এ সংকট আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পদ্মার কথাই ধরা যাক। ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের গড় বার্ষিক প্রবাহের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারি থেকে মার্চে নদীটির প্রয়োজনীয় পরিবেশগত প্রবাহ প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১ হাজার ৮৩ ঘনমিটার। অথচ আগস্ট-সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২১ হাজার ৬৭৬ ঘনমিটারে। অর্থাৎ নদীর প্রয়োজন ঋতুভেদে ব্যাপকভাবে বদলায়। শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ গড়ের ১০ শতাংশেরও নিচে নেমে যেতে পারে, আবার বর্ষার চূড়ায় প্রয়োজন হয় গড় প্রবাহের প্রায় দ্বিগুণ পানি।

একই বৈপরীত্য দেখা যায় যমুনায়। ফেব্রুয়ারি-মার্চে নদীটির প্রয়োজনীয় প্রবাহ ৮ হাজার ৫৭৭ ঘনমিটার প্রতি সেকেন্ড। কিন্তু ওই সময়ে বাস্তব প্রবাহ ৬ হাজার ৯০৫ ঘনমিটার। অর্থাৎ নদীর প্রয়োজনের তুলনায় পানি কম। জুলাইয়ে আবার প্রয়োজনের চেয়ে বেশি প্রবাহ। এ সময় ৪২ হাজার ৮৮৫ ঘনমিটার প্রয়োজন হলেও ৪৬ হাজার ১১৭ থাকে বলে গবেষণায় উঠে আসে।

উত্তরের নদী তিস্তার চিত্র আরো উদ্বেগের। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত নদীটির প্রয়োজনীয় প্রবাহ ৩২২ ঘনমিটার প্রতি সেকেন্ড। কিন্তু ডালিয়া পয়েন্টে ওই সময়ে প্রবাহ ১০৪ থেকে ২১৩ ঘনমিটার। জুলাইয়ে প্রয়োজনীয় প্রবাহ ১ হাজার ৬১৪ ঘনমিটার, যেখানে ১ হাজার ৫৯১ ঘনমিটার পাওয়া যায়। গবেষণাটিতে প্রবাহের এ পরিস্থিতির সঙ্গে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে পানির অসম বণ্টনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

দেশের নদী নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ভাষাটিও হয়তো বদলানো দরকার। আর এ জায়গাতেই পরিবেশগত প্রবাহের ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে নদী ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য যদি শুধু বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি প্রত্যাহার কিংবা শুষ্ক মৌসুমে পানির জোগান নিশ্চিত করা হয়, তাহলে তার নিজস্ব পরিবেশগত প্রয়োজনটি আড়ালে থেকে যেতে পারে

ছবি: রয়টার্স

বড় নদীর বাইরে ছোট নদীগুলোর চিত্রও স্বস্তিদায়ক নয়। বাংলাদেশ ও ভারতের গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃসীমান্ত নদী আত্রাইয়ে ফেব্রুয়ারিতে প্রয়োজনীয় প্রবাহ ৬০ ঘনমিটার প্রতি সেকেন্ড হলেও থাকে ৪৯ ঘনমিটার বা তারও কম। জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রয়োজনীয় প্রবাহ ৩০১ ঘনমিটার হলেও গবেষণায় পাওয়া গেছে ২৩৫ দশমিক ২৫ ঘনমিটার। বুড়িগঙ্গায় ন্যূনতম প্রয়োজনীয় প্রবাহ ৫০ ঘনমিটার, অথচ ২০০৯ থেকে ২০১৮ সময়ে প্রবাহ ছিল মাত্র ১৭ ঘনমিটার। গড়াই নদীর ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় প্রবাহ ও বাস্তব প্রবাহের মধ্যে ব্যবধান রয়েছে।

হালদার ক্ষেত্রে নদীর প্রবাহের সঙ্গে পরিবেশগত ভারসাম্যের সম্পর্ক আরো স্পষ্ট। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, শুষ্ক মৌসুমে কাপ্তাই জলাধার থেকে অন্তত ২০০ ঘনমিটার প্রতি সেকেন্ড মিঠা পানির প্রবাহ বজায় রাখা গেলে হালদায় লবণাক্ততার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। অন্যদিকে জোয়ারের প্রভাবে বালি ও পলি পরিবহন, নদীতীরের আকৃতি পরিবর্তন এবং পানির স্তর কমে যাওয়াও নদীর প্রবাহ পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করে।

এ সংখ্যাগুলো আসলে নদীর একটি নীরব পরিবর্তনের গল্প বলে। নদীর জন্য প্রয়োজনীয় পানি নিশ্চিত করা মানে শুধু নদীকে বাঁচানো নয়; একে ঘিরে থাকা অর্থনীতি ও পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাও রক্ষা করা। বাংলাদেশের মতো নদীনির্ভর দেশে পানি ব্যবস্থাপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় সে বাস্তবতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

দেশের নদী নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ভাষাটিও হয়তো বদলানো দরকার। আর এ জায়গাতেই পরিবেশগত প্রবাহের ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে নদী ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য যদি শুধু বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি প্রত্যাহার কিংবা শুষ্ক মৌসুমে পানির জোগান নিশ্চিত করা হয়, তাহলে তার নিজস্ব পরিবেশগত প্রয়োজনটি আড়ালে থেকে যেতে পারে।

বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আজ রোববার পালিত হচ্ছে বিশ্ব নদী দিবস। নদী রক্ষার অঙ্গীকারে দিনটি ঘিরে থাকবে নানা আয়োজন, আলোচনা ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি। কিন্তু দিনটি পেরিয়ে গেলে সে অঙ্গীকারও যেন হারিয়ে না যায় আনুষ্ঠানিকতার ভিড়ে। কারণ নদীর জন্য একটি দিন যথেষ্ট নয়। নদী বাঁচাতে হলে সারা বছরই দেখতে হবে তার প্রবাহ, তার জীববৈচিত্র্য ও তার স্বাভাবিক ছন্দ। মনে রাখতে হবে, নদীকে বাঁচানো মানে শুধু নদীর বুকে পানি ধরে রাখা নয়, তার প্রবাহে প্রাণ ফিরিয়ে রাখা।

নদী শুকিয়ে গেলে তার মৃত্যু চোখে পড়ে। কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রবাহের ঘাটতিতে তার যে ধীর ক্ষয়, তা অনেক সময় দৃশ্যমান হয় না। পানির মধ্যে স্রোত থাকে, নদীর চেহারাও থাকে; শুধু ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে তার প্রাণ।

আরও