ভ্রমণ করতে ভালোবাসেন না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। পরিবার, বন্ধু বা প্রিয়জনের সঙ্গে নতুন জায়গায় ঘুরে বেড়ানো এবং নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা মানুষের সহজাত আকাঙ্ক্ষার অংশ। তবে সময়ের সঙ্গে ভ্রমণের সেই পরিচিত ছবিতে পরিবর্তন এসেছে। এখন অনেকেই দলবেঁধে নয়, বরং একাই বেরিয়ে পড়ছেন নতুন জায়গা দেখতে।
বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে একা ভ্রমণ বা সোলো ট্রাভেলিং জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কাঁধে ব্যাগ নিয়ে তারা ঘুরে বেড়াচ্ছেন পাহাড়, সমুদ্র কিংবা প্রকৃতির বিভিন্ন প্রান্তে। নিজের সঙ্গে সময় কাটানো এবং পরিচিত জীবনের বাইরে নতুন অভিজ্ঞতা নেয়ার সুযোগই এই ভ্রমণের প্রতি তাদের আগ্রহ বাড়াচ্ছে।
একসময় বেড়াতে যাওয়ার অর্থ ছিল পরিবার, বন্ধু ও প্রিয়জনদের সঙ্গে আনন্দের সময় কাটানো। কিন্তু এখন একা ভ্রমণও সেই আনন্দের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। হাতে হাতে স্মার্টফোন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তৃত সুযোগ থাকার পরও মানুষ কেন একা ভ্রমণকে বেছে নিচ্ছে, সেটি ভাবার মতো বিষয়।
জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের জীবনও এক ধরনের ভ্রমণ। এই পথ প্রত্যেক মানুষকে একাই পাড়ি দিতে হয়। জীবনের এই যাত্রায় নানা সম্পর্ক তৈরি হয়। কিছু সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে বদলে যায়, আবার কিছু সম্পর্ক আজীবন থেকে যায়। একা ভ্রমণ মানুষকে জীবনের এই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। এই সত্য মেনে নিতে পারলে জীবনের নানা পরিস্থিতিতে সামনে এগিয়ে যাওয়ার মনোবলও বাড়ে।
কর্মক্ষেত্রের চাপ, ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং প্রতিদিনের ব্যস্ততায় মানুষ অনেক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তখন একা ভ্রমণ জীবনে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি করে। অপরিচিত জায়গায় গেলে কাউকে খুশি রাখা বা কারও প্রত্যাশা পূরণ করার চাপ থাকে না। অন্যের বিচার বা সমালোচনার ভয়ও তুলনামূলক কম থাকে।
ফলে মানুষ নিজের সামাজিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে নিজের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পায়। নিজের প্রকৃত সত্তাকে নতুন করে বোঝার এই অভিজ্ঞতা আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে ব্যক্তি আরো স্বনির্ভর হয়ে উঠতে পারে।
এ ধরনের ভ্রমণে অনেক সময় গন্তব্যের চেয়ে পথই বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। অচেনা পথ, অপরিচিত মানুষ এবং প্রতিটি নতুন জায়গা ভ্রমণকারীর সামনে নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করে। এসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নিজের দুর্বলতা ও সক্ষমতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। এতে আত্মোন্নতির সুযোগও তৈরি হয়।
একা ভ্রমণের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা। কোথায় যাওয়া হবে, কতক্ষণ থাকা হবে কিংবা কী খাওয়া হবে, সবকিছুই নিজের ইচ্ছায় ঠিক করা যায়। অন্য কারো পছন্দ-অপছন্দের সঙ্গে মানিয়ে চলার প্রয়োজন হয় না।
পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে ভ্রমণ করলে পুরো পরিকল্পনাই অনেকের মতামতের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু একা ভ্রমণে ব্যক্তি নিজের সঙ্গে সময় কাটাতে পারেন। নতুন জনপদ, সেখানকার মানুষ ও সংস্কৃতিকে কাছ থেকে দেখার সুযোগও তৈরি হয়। প্রকৃতি, মানুষ ও জীবনকে একাগ্রভাবে উপলব্ধি করার এই সময় প্রতিদিনের জীবনের বাইরে ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা দেয়।
স্বল্প সময়ের জন্য নিজের ইচ্ছামতো জীবনযাপন করার সুযোগ এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার এই আকর্ষণই তরুণদের মধ্যে একা ভ্রমণকে জনপ্রিয় করে তুলছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এই প্রবণতা বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবের ভ্রমণবিষয়ক বিভিন্ন পাতায় ভ্রমণকারীরা একা ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরছেন। একই সঙ্গে তারা ভ্রমণের নানা পরামর্শও দিচ্ছেন। এসব অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ তরুণ-তরুণীদের একা ভ্রমণে উৎসাহিত করছে।
তবে একা ভ্রমণের ধারণা যতটা আধুনিক মনে হয়, এর ইতিহাস ততটাই পুরনো। ইবনে বতুতা, হিউয়েন সাং কিংবা অতীশ দীপঙ্করের ভ্রমণকে এক অর্থে একা ভ্রমণের ঐতিহাসিক রূপ বলা যায়। তাদের যাত্রার পেছনে ছিল জ্ঞান অর্জন, আধ্যাত্মিকতা কিংবা নতুন কিছু জানার কৌতূহল।
আজকের তরুণদের একা ভ্রমণের উদ্দেশ্য অবশ্য ভিন্ন। কেউ নিজের জন্য সময় বের করতে চান, কেউ নতুন অভিজ্ঞতা নিতে চান, আবার কেউ পরিচিত জীবনের ব্যস্ততা থেকে কিছু সময়ের জন্য দূরে থাকতে চান। কিন্তু উদ্দেশ্য ভিন্ন হলেও ভ্রমণের মৌলিক আকাঙ্ক্ষা একই রয়ে গেছে। সেটি হলো পরিচিত সীমানার বাইরে গিয়ে নতুন কিছু দেখা এবং সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নিজেকেই নতুনভাবে আবিষ্কার করা।