সভ্যতার শুরু থেকেই চাঁদ ও নক্ষত্রমণ্ডল ছিল মানুষের পথচলার সঙ্গী। নাবিকরা নক্ষত্র দেখে পথ চিনেছেন, কৃষকেরা অমাবস্যা-পূর্ণিমা দেখে ফসলের হিসাব মিলিয়েছেন। আর সাধারণ মানুষ বিস্ময়ে তাকিয়ে থেকেছে আকাশের দিকে। ২০২৬ সাল সেই তাকিয়ে থাকার কারণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ বছর আকাশে একের পর এক দেখা মিলবে উজ্জ্বল সুপারমুন, ঝলমলে উল্কাবৃষ্টি, চন্দ্রগ্রহণের নাটকীয় অন্ধকার আর গ্রহদের বিরল কাছাকাছি অবস্থানের।
এ বছরের শুরুতেই আকাশে দেখা গেছে ‘উলফ মুন’, যা এ বছরের তিনটি সুপারমুনের মধ্যে প্রথম। মহাজাগতিক নক্ষত্রের মেলায় সৌরজগতের সবচেয়ে বড় গ্রহ জুপিটারকেও চাঁদের খুব কাছাকাছি দেখা যাবে, যা রাতের আকাশকে করবে আরো মায়াবি। পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব গড়পড়তা ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৪৭২ কিলোমিটার হলেও ডিসেম্বরের সুপারমুনটির সময় চাঁদ আমাদের আরো অনেক কাছে চলে আসবে।
সুপারমুন ও ব্লু মুন
সাধারণত বছরে ১২টি পূর্ণিমা হয়, কিন্তু ২০২৬ সালে হবে ১৩টি। মে মাসে পড়বে দুটি পূর্ণিমা, যার দ্বিতীয়টিয় হবে ব্লু মুন। জানুয়ারির পর পরবর্তী দুটি সুপারমুন দেখা যাবে নভেম্বর ও ডিসেম্বরে, যার মধ্যে ডিসেম্বরেরটি হবে বছরের সবচেয়ে কাছের ও উজ্জ্বলতম।
নভেম্বরের এক সন্ধ্যায় পোল্যান্ডে সুপারমুনের উদয় হওয়ার দৃশ্য। ছবি: বিবিসি
এ বছরের বাকি পূর্ণিমাগুলো হলো— ফেব্রুয়ারিতে স্নো মুন, মার্চে ওয়ার্ম মুন, এপ্রিলে পিংক মুন, মে’র শুরুতে ফ্লাওয়ার মুন ও শেষে ব্লু মুন, জুনে স্ট্রবেরি মুন, জুলাইয়ে বাক মুন, আগস্টে স্টার্জন মুন, সেপ্টেম্বরে হারভেস্ট মুন, অক্টোবরে হান্টারস মুন, নভেম্বরে বিভার মুন এবং ডিসেম্বরে কোল্ড মুন।
উল্কাবৃষ্টি বা মেটিওর শাওয়ার
উল্কাবৃষ্টি শুনলেই অনেকের মাথায় প্রথম প্রশ্ন আসে—এগুলো আসলে কী, আর নামগুলো এত অদ্ভুত কেন? বিষয়টা খুব জটিল নয়। উল্কাবৃষ্টি ঘটে যখন পৃথিবী মহাকাশে ভেসে থাকা ধুলো–পাথরের মেঘের ভেতর দিয়ে যায়। সেগুলো বায়ুমণ্ডলে ঢুকে ঘর্ষণে জ্বলে ওঠে, আর আমরা আকাশে দেখি ছুটে চলা আলোর দাগ। যেগুলোকে আমরা সাধারণভাবে ‘শুটিং স্টার’ বলে থাকি। আসলে এগুলো তারা নয়, ধুলো–পাথরের ক্ষুদ্র কণা।
নামগুলোর রহস্যও সহজ। প্রতিটি উল্কাবৃষ্টির নাম রাখা হয় আকাশের যে নক্ষত্রমণ্ডল থেকে উল্কাগুলো ছুটে আসছে বলে মনে হয়, সেই নক্ষত্রমণ্ডলের নাম অনুযায়ী। তাই জানুয়ারির ‘কোয়াড্রানটিডস’, এপ্রিলের ‘লিরিডস’ বা আগস্টের ‘পারসেইডস’—সবই আকাশের মানচিত্রের নাম। আকাশ চেনার জন্য জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এই নামকরণ করেছেন, যাতে সবাই বুঝতে পারে উল্কাগুলো আকাশের কোন দিক থেকে আসছে।
২০২৬ সালে উল্কাবৃষ্টির মৌসুম শুরু হবে জানুয়ারিতে ‘কোয়াড্রানটিডস’ দিয়ে। শীতের রাত হলেও এটি বেশ সক্রিয় একটি উল্কাবৃষ্টি। এপ্রিলের ‘লিরিডস’ তুলনামূলক শান্ত—ঘণ্টায় কম উল্কা দেখা যায়, কিন্তু মাঝেমধ্যে হঠাৎ উজ্জ্বল আলোর ঝলক চোখে পড়ে। মে মাসের ‘ইটা অ্যাকোয়ারিডস’ বিশেষ কারণ এটি হ্যালির ধূমকেতুর ফেলে যাওয়া ধুলোর অংশ; ভোরের দিকে তাকালে এই উল্কাগুলো সবচেয়ে ভালো দেখা যায়।
তবে আকাশপ্রেমীদের আসল অপেক্ষা থাকবে আগস্টের জন্য। ১২–১৩ আগস্টের ‘পারসেইডস’কে বলা হয় সবচেয়ে জনপ্রিয় উল্কাবৃষ্টি। কারণ এই সময় আবহাওয়া তুলনামূলক ভালো থাকে। আর ২০২৬ সালে বড় সুবিধা হলো—চাঁদের আলো প্রায় বাধা হবে না। ফলে গ্রামাঞ্চল বা শহরের বাইরে খোলা আকাশে বসে থাকলে আগুনের গোলার মতো উল্কাগুলো ছুটে যেতে দেখা যাবে একের পর এক।
বছরের শেষ বড় চমক আসে ডিসেম্বরে। ১৩–১৪ ডিসেম্বরের ‘জেমিনিডস’কে অনেক জ্যোতির্বিজ্ঞানী উল্কাবৃষ্টির “রাজা” বলে থাকেন। কারণ ভালো পরিস্থিতিতে ঘণ্টায় ১৩৫টি পর্যন্ত উল্কা দেখা যেতে পারে। শীতের রাত হওয়ায় একটু কষ্ট আছে ঠিকই, কিন্তু আকাশ পরিষ্কার থাকলে এই উল্কাবৃষ্টি সত্যিই চোখ ফেরানো দায়।
ভালো খবর হলো—এই দৃশ্যগুলো দেখতে কোনো টেলিস্কোপ লাগে না। খোলা জায়গায় শুয়ে বা বসে, চোখকে অন্ধকারে অভ্যস্ত হতে একটু সময় দিলেই হয়। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকুন, আর মাঝে মাঝে হঠাৎ ছুটে যাওয়া আলোর দাগ দেখলেই বুঝবেন—আপনি ঠিক সময়েই তাকিয়েছেন।
আতশবাজির মতো উল্কাবৃষ্টি। ছবি: এএফপি
চলতি বছরে উল্কাবৃষ্টির সম্ভাব্য তারিখগুলো হলো—
- লিরিড: এপ্রিল ২১-২২
- ইটা অ্যাকুয়ারিডস: মে ৫-৬
- সাউদার্ন ডেলটা অ্যাকুয়ারিডস: জুলাই ৩০-৩১
- আলফা ক্যাপ্রিকর্নিডস: জুলাই ৩০-৩১
- পারসিডস: আগস্ট ১২-১৩
- ওরিওনিডস: অক্টোবর ২১-২২
- সাউদার্ন টরিডস: নভেম্বর ৪-৫
- নর্দার্ন টরিডস: নভেম্বর ১১-১২
- লিওনিডস: নভেম্বর ১৬-১৭
- জেমিনিডস: ডিসেম্বর ১৩-১৪
- উরসিডস: ডিসেম্বর ২১-২২
সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণ
নাসার তথ্যানুযায়ী, এ বছর পৃথিবী দুটি সূর্যগ্রহণ ও দুটি চন্দ্রগ্রহণের সাক্ষী হবে। ১৭ ফেব্রুয়ারি অ্যান্টার্কটিকার আকাশে দেখা যাবে ‘অ্যানুলার সোলার এক্লিপস’। এ সময় চাঁদ সূর্যকে পুরোপুরি ঢাকতে না পেরে চারপাশে আগুনের আংটির মতো এক অদ্ভুত দৃশ্য তৈরি করবে। একে বলা হয় ‘রিং অব ফায়ার’।
আর্জেন্টিনার পুয়ের্তো সান জুলিয়ানের আকাশে বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণের এক অপূর্ব দৃশ্য। ছবি: বিবিসি
তবে বছরের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত দিনটি হলো ১২ আগস্ট। এ দিনটিতে গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড এবং স্পেনের মানুষ একটি ‘টোটাল সোলার এক্লিপস’ বা পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখার সুযোগ পাবেন। এছাড়া ৩ মার্চ ‘টোটাল লুনার এক্লিপস’ বা পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদ যখন পৃথিবীর ছায়ায় ঢাকা পড়বে, তখন এটি টকটকে লাল হয়ে ‘ব্লাড মুন’ রূপ ধারণ করবে। এসব ‘এক্লিপস’দেখার সময় অবশ্যই বিশেষ চশমা ব্যবহার করা জরুরি।
প্ল্যানেট প্যারেড ও গ্রহের অবস্থান
ফেব্রুয়ারি মাসে রাতের আকাশের দিগন্তের কাছে দেখা যাবে ছয়টি গ্রহের এক বিরল প্যারেড। স্যাটার্ন, ভেনাস, মার্কারি, নেপচুন, ইউরেনাস এবং জুপিটারকে এ সময় ভিন্ন ভিন্ন রূপে দেখা যাবে। বছরের ৮ ও ৯ জুন ভেনাস এবং জুপিটার এত কাছাকাছি আসবে যে মনে হবে তারা যেন নিজেদের জায়গা বদল করছে। একে ‘ডাবল প্ল্যানেট’ বিভ্রমও বলা হয়।
এক সারিতে গ্রহগুলোর অবস্থানের দৃশ্য। ছবি: এবিসি
অন্যদিকে, অক্টোবরে উত্তর আমেরিকার দর্শকরা দেখবেন আরো এক অদ্ভুত দৃশ্য, যেখানে চাঁদ প্রায় এক ঘণ্টার জন্য জুপিটারকে আড়াল করে রাখবে। বছরের শেষ দিকে মার্স এবং ভেনাস তাদের উজ্জ্বল উপস্থিতি দিয়ে আকাশের শোভা বাড়িয়ে দেবে।
সব মিলিয়ে ২০২৬ এর আকাশ শুধু বিজ্ঞানীদের জন্য নয়, সাধারণ মানুষের জন্যও এক মহাজাগতিক উৎসব।