তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার ৪০ বছর পর যেভাবে আছে চেরনোবিলের প্রাণ-প্রকৃতি

তেজস্ক্রিয়তার বিষে নীল হয়ে যাওয়া সেই পরিত্যক্ত ‘এক্সক্লুশন জোন’ বা নিষিদ্ধ অঞ্চলে আর কখনো মানুষ ফেরেনি। তবে মানুষের অনুপস্থিতে প্রকৃতি সেখানে এক অন্যরকম রাজত্ব গড়ে নিয়েছে

সময়টা ১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল; ঘড়িতে তখন রাত ১টা ২৩ মিনিট। ইউক্রেনের চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৪ নম্বর ইউনিটে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড পৃথিবীকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। সেই মহাবিপর্যয়ের পর কেটে গেছে ৪০ বছর। তেজস্ক্রিয়তার বিষে নীল হয়ে যাওয়া সেই পরিত্যক্ত ‘এক্সক্লুশন জোন’ বা নিষিদ্ধ অঞ্চলে আর কখনো মানুষ ফেরেনি। তবে মানুষের অনুপস্থিতে প্রকৃতি সেখানে এক অন্যরকম রাজত্ব গড়ে নিয়েছে।

টিকে থাকার লড়াইয়ে রঙ বদল

স্প্যানিশ বিবর্তন বিষয়ক জীববিজ্ঞানী পাবলো বুরাকো ২০১৬ সালে চেরনোবিলের বনাঞ্চলে গবেষণার সময় লক্ষ্য করেন, চেরনোবিলের ‘ট্রি ফ্রগ’ বা গেছো ব্যাঙগুলো কুচকুচে কালো। সাধারণত এ প্রজাতির ব্যাঙের রঙ হয় উজ্জ্বল সবুজ। উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয় এলাকায় কালো ব্যাঙের আধিক্য বেশি। দুই শতাধিক ব্যাঙের ওপর গবেষণা চালিয়ে ২০২২ সালে প্রকাশিত ভিন্ন এক প্রতিবেদনে বুরাকো দাবি করেন, উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয়তা থেকে বাঁচতেই সম্ভবত ব্যাঙগুলো নিজেদের শরীরে মেলানিনের মাত্রা বাড়িয়ে রঙ বদলে ফেলেছে। মেলানিন তেজস্ক্রিয় বিকিরণ শুষে নিয়ে শরীরকে সুরক্ষা দেয়। এটি প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য প্রকৃতির এক অনন্য অভিযোজন বা ‘ইভোলিউশন’।

ছবি: জার্মান ওরিজাওলা

মানুষের অনুপস্থিতি বন্যপ্রাণের জন্য শাপে বর

চেরনোবিলের রেড জোন থেকে মানুষের চিরতরে প্রস্থান বন্যপ্রাণীদের জন্য এক অঘোষিত আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ নেই, শিকার নেই, নেই বসতি স্থাপনের চাপ—ফলে এ বিশাল এলাকা এখন নেকড়ে, ভাল্লুক, বাইসন ও বন্য ঘোড়াদের অবাধ চারণভূমি। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, পার্শ্ববর্তী অভয়ারণ্যগুলোর তুলনায় এখানে নেকড়ের সংখ্যা প্রায় সাতগুণ বেশি। প্রায় ১০০ বছর পর ২০১৪ সালে প্রথমবার এ অঞ্চলে বাদামী ভাল্লুকের দেখা মেলে। এছাড়া বিলুপ্তপ্রায় ইউরেশিয়ান লিনাক্সও ফিরে এসেছে পুরনো আবাসে। মানুষের পরিত্যক্ত পোষা কুকুরের বংশধররা এখন এ বনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ছবি: জার্মান ওরিজাওলা

তেজস্ক্রিয়তা বনাম প্রতিকূলতা

চেরনোবিলের প্রাণীরা কি আসলেই তেজস্ক্রিয়তার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে? এ নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে রয়েছে তীব্র মতভেদ। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, এখানকার ‘ব্যাঙ্ক ভোল’ (এক ধরনের ইঁদুর) ডিএনএ ড্যামেজ প্রতিরোধের ক্ষমতা অর্জন করেছে। এমনকি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ধ্বংসপ্রাপ্ত রিঅ্যাক্টরের ভেতরে এমন এক ধরনের কালো ছত্রাক জন্মাচ্ছে যা তেজস্ক্রিয় বিকিরণ থেকে শক্তি সঞ্চয় করে বেড়ে ওঠে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক টিউমার বা গাছের ডালের অদ্ভুত মোচড় লক্ষ্য করা গেছে।

সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো বলছে, চেরনোবিলের প্রাণীদের জন্য এখন বড় হুমকি কেবল রেডিয়েশন নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তন। বাড়তে থাকা তাপমাত্রা এবং তেজস্ক্রিয়তার মিশ্র প্রভাবে ‘বার্ন সোয়ালো’র মতো পরিযায়ী পাখিদের টিকে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।

অমীমাংসিত রহস্যের চার দশক

ভৌগোলিক পরিমণ্ডলে চেরনোবিলের প্রভাব আজো রয়ে গেছে। পোল্যান্ডের মাশরুম থেকে শুরু করে ইউরোপের বিভিন্ন বনের কাঠে আজও সামান্য মাত্রায় চেরনোবিলের রেডিয়েশন পাওয়া যায়। গবেষক জোনাথন টার্নবুলের মতে, চেরনোবিলের প্রকৃতি ‘মরে যাচ্ছে’ না ‘বেঁচে ফিরছে’—তা এক কথায় বলা সম্ভব নয়। এটি এমন এক বাস্তুসংস্থান যা ধ্বংসের মধ্য থেকে নতুন করে নিজেকে নির্মাণ করছে।

আরও