হুথিদের দখলে ইয়েমেনের মোখা, জনপ্রিয় কফির জন্য পরিচিত অঞ্চলটি কেন গুরুত্বপূর্ণ

ভূরাজনৈতিক সংকটের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার অনেক আগে মোখা ছিল আরব উপদ্বীপের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র। একইসঙ্গে এটি ছিল বিশ্বব্যাপী কফি বাণিজ্যের জন্মস্থান। ‘মোখা কফি’ নামটিও এসেছে এই শহরের নাম থেকে

ইয়েমেনের বন্দরনগরী মোখার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে হুথি বাহিনী। ইরানপন্থী গোষ্ঠীটি ও সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের মধ্যে তীব্র লড়াইয়ের মধ্যেই গতকাল বড় ধরনের সামরিক অভিযানের মাধ্যমে শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেয় তারা।

এর জেরে বিখ্যাত কফির উৎসস্থল মোখা থেকে শত শত নারী ও শিশু পালিয়ে সৌদি-সমর্থিত সরকার নিয়ন্ত্রিত লাহিজ ও এডেন প্রদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। আগে থেকেই তাইজ ও আল-হুদায়দা প্রদেশে ভয়াবহ মানবিক সংকট চলছিল। সহিংসতা বাড়তে থাকায় তা আরো গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত দুই সপ্তাহে সংঘর্ষের কারণে এসব এলাকায় ২০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

সরকারপন্থীদের আকস্মিক প্রত্যাহার

সরকারপন্থী বাহিনীর প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করেছে মোখার পতন। ৩ সেপ্টেম্বর থেকে তিনটি পৃথক দিক দিয়ে হুথিরা চাপ সৃষ্টি করে। এসব দিক হলো পশ্চিম তাইজ, দক্ষিণ হুদায়দা ও মোখা শহর। এসময় মোখার উপকণ্ঠে তীব্র লড়াই হয়।

শহরটির নিয়ন্ত্রণ নিতে হুথিদের সহায়তা করেছে ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেসের লড়াই থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত।

সৌদি-সমর্থিত জোটের অংশ ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাহিনীটির নেতৃত্বে রয়েছেন তারেক সালেহ। তিনি ইয়েমেনের সাবেক প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহর ভাতিজা। হুথিদের সঙ্গে প্রথমে জোট করলেও পরে তাদের হাতে নিহত হন আলি আবদুল্লাহ সালেহ।

গতকাল ভোরে ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেস মোখা থেকে সরে যায়। এরপর হুথিরা শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। তবে বাহিনীটি কেন সরে গেছে, তা স্পষ্ট নয়। নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠন, কোনো সামরিক কারণ অথবা তীব্র সামরিক চাপ মোকাবেলা করতে না পারা—এর যেকোনো একটি এর কারণ হতে পারে।

তারেক সালেহ বাহিনীকে ‘কৌশলগতভাবে পিছু হটে অবস্থান পুনর্বিন্যাসের’ নির্দেশ দেন। এর ফলে আল-ওয়াজিয়াহ ও মাওজা ফ্রন্টে হুথিদের অগ্রসর হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তিনি বাহিনীকে বিকল্প একটি কমান্ড সেন্টার প্রতিষ্ঠারও নির্দেশ দেন।

যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে নতুন ফ্রন্টে

সংঘাত দ্রুত সমুদ্র ও ইয়েমেনের দূরবর্তী স্থলাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে। রয়টার্সকে চারটি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্র জানিয়েছে, হুথিরা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগরের হানিশ দ্বীপপুঞ্জে হামলা চালাচ্ছে।

একই সময়ে ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্সের সামরিক শাখা জানিয়েছে, সরকারপন্থী বাহিনীর বিমান আল-তুহায়তা, আল-সালিফ এবং হুদায়দা প্রদেশের কামারান দ্বীপে হুথিদের অবস্থানে হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে হুথিরা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জুকার দ্বীপের দিকে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।

দেশটির অভ্যন্তরেও সংঘর্ষ বেড়েছে। মারিবে ফারদাত নিহম এলাকায় সানা থেকে আসা হুথিদের শক্তিবৃদ্ধির ওপর যুদ্ধবিমান হামলা চালানো হয়েছে। মারিবের উত্তর ও দক্ষিণে যাওয়া হুথিদের অন্যান্য শক্তিবৃদ্ধির ওপরও হামলা হয়েছে।

হামলার শিকার মোখা শহর। ছবি: এপি

বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের কাছে মোখা

মোখার ভৌগোলিক অবস্থানই শহরটির দখলকে বৈশ্বিক উদ্বেগের কারণ করে তুলেছে। শহরটি বাব আল-মান্দেব প্রণালি থেকে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার বা ৪৭ মাইল উত্তরে অবস্থিত। এই প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

‘গেট অব টিয়ার্স’ নামে পরিচিত এই সরু নৌপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সুয়েজ খালের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও জ্বালানি পরিবহনে এটি ব্যবহৃত হয়। এশীয় পণ্য ও রুশ তেল পরিবহনের ক্ষেত্রেও নৌপথটি গুরুত্বপূর্ণ।

মোখার নিয়ন্ত্রণ হুথিদের বাব আল-মান্দেবের ওপর ‘শ্বাসরোধী নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠার সুযোগ দিতে পারে।

এছাড়া মোখার দখলে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে হুথিবিরোধী বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথ। এর মধ্যে রয়েছে মোখা থেকে দক্ষিণে তাইজের সঙ্গে সংযোগকারী সড়ক। মোখা বন্দরের মাধ্যমে চলা সরবরাহপথও এর মধ্যে রয়েছে।

প্রতিরক্ষা নীতিবিষয়ক বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুস্তাই বলেন, ‘এই মুহূর্তে এটি যুদ্ধের একটি বাঁকবদল। এর ফলে ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে সরকারি বাহিনীর প্রতিরোধব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে।’

তিনি বলেন, ‘মোখা বন্দরই ছিল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকা সর্বশেষ বন্দর।’

এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের এক মুখপাত্র বলেন, ‘এই সংকটের জন্য হুথিরাই পুরোপুরি দায়ী।’

তিনি হুথিদের ‘অবিলম্বে হামলা ও উত্তেজনা বাড়ানোর কর্মকাণ্ড বন্ধ করার’ আহ্বান জানান।

কফি বাণিজ্যের জন্মস্থান

ভূরাজনৈতিক সংকটের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার অনেক আগে মোখা ছিল আরব উপদ্বীপের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র। একইসঙ্গে এটি ছিল বিশ্বব্যাপী কফি বাণিজ্যের জন্মস্থান। ‘মোখা কফি’ নামটিও এসেছে এই শহরের নাম থেকে।

প্রাচীন হিমইয়ারি লেখায় ‘মাখন’ নামে শহরটির উল্লেখ পাওয়া যায়। খ্রিস্টীয় ৫১৭ সালে ইথিওপীয়রা প্রথম শহরটি দখল করে নেয়। পরে হিমইয়ারি রাজা ধু নুওয়াস তাদের বিতাড়িত করেন।

১৫৩৬ থেকে ১৫৩৮ সালের মধ্যে অটোমান সাম্রাজ্য শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর জন্য তারা মোখাকে সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত করে।

তবে ইতিহাসের এক মজার পরিহাস হলো, ইয়েমেনি কফির স্বাদ নেয়া প্রথম ইউরোপীয়রাও ছিলেন পর্তুগিজরা। মোখার শেখ তাদের আতিথ্য দেন। তাদের একটি ‘কালো পানীয়’ পান করতে দেয়া হয়, যা ‘শরীরকে সতেজ করে এবং মনকে প্রশান্ত করে’।

ইতিহাসবিদদের মতে, সুফি পণ্ডিত আলি বিন ওমর আল-শাজিলি ইথিওপিয়া থেকে মোখায় প্রথম কফি নিয়ে আসেন।

অটোমানরা ১৫৩৬ সালে মোখা বন্দর দিয়ে প্রথম কফি রফতানি শুরু করে। লোহিত সাগর দিয়ে কফির বীজ সুয়েজ ও আলেকজান্দ্রিয়ায় পাঠানো হতো। সেখান থেকে সেগুলো ইউরোপীয়দের কাছে বিক্রি করা হতো।

১৬২৮ সালে ডাচরা প্রথম বাণিজ্যিক কফি চুক্তি করে। পরে তারা কফি বীজ পাচার করে জাভা ও আমেরিকায় চাষ শুরু করে।

মোখা স্বর্ণযুগ পার করে ১৭ ও ১৮ শতকে। তবে ১৯ শতকের শেষ দিকে অটোমান ও ব্রিটিশদের মধ্যে সংঘাত এবং এডেন ও হুদায়দার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী বন্দরগুলোর দ্রুত উত্থানের কারণে শহরটির গুরুত্ব কমতে থাকে।

এ অর্থনৈতিক পতনের বড় প্রভাব পড়ে স্থানীয় জনসংখ্যার ওপরও। ১৯ শতকে মোখার জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২০ হাজার। ১৯৩০-এর দশকে তা কমে মাত্র ১ হাজারে দাঁড়ায়। পরে ধীরে ধীরে জনসংখ্যা বাড়তে থাকে। ২০০৪ সালে তা ১০ হাজারের বেশি হয়।

আল জাজিরা এক্সপ্লেইনার অবলম্বনে

আরও