সন্তান নেয়া বা না নেয়ার পরিকল্পনা কি কেবলই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত?

পেসিমিজম বা নৈরাশ্যবাদী দর্শনের সঙ্গে অ্যান্টি-ন্যাটালিজমের পার্থক্যটি জরুরি। দুটি এক জিনিস নয়। কেউ জীবনের নানা দিককে সমস্যাপূর্ণ মনে করেও সন্তান নেয়ার পক্ষে থাকতে পারেন। আবার কেউ নৈরাশ্যবাদী না হয়েও সন্তান না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। সন্তান না নেয়া মানেই কেউ অ্যান্টি-ন্যাটালিস্ট, এমন ভাবা ভুল। কেউ হয়তো কর্মজীবন, আর্থিক অবস্থা কিংবা স্বাধীনতার কথা ভেবে থেমেছেন। কেউ ভেবেছেন জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ বা ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কথা। এই সিদ্ধান্তগুলোকে এক দর্শনের ছাতার নিচে ফেললে প্রতিটির প্রতিই অবিচার হয়।

একসময় বিয়ে, সংসার আর সন্তান জন্মদানকে জীবনের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা বলেই ধরা হতো। প্রশ্ন তোলার কোনো জায়গা ছিল না। আধুনিক জীবনে সেই ধারণায় বড় পরিবর্তন এসেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনেক মানুষ বিয়ে করলেও সন্তান নেয়ার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন, কেউ আবার সচেতনভাবেই সন্তান না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এর প্রভাব পড়ছে জন্মহারেও। এর পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মজীবনের চাপ, বদলে যাওয়া সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতাসহ নানা কারণ। তবে এই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তগুলোর আড়ালে দর্শনের একটি পুরোনো প্রশ্নও উঁকি দেয়। নতুন একজন মানুষকে পৃথিবীতে আনার সিদ্ধান্তে আমরা ঠিক কী কী বিষয় বিবেচনা করি?

দর্শনে এ প্রশ্ন নিয়ে যে ধারাটি সবচেয়ে বিতর্কিত, তার নাম অ্যান্টি-ন্যাটালিজম। সহজ করে বললে, অ্যান্টি-ন্যাটালিজম এমন দার্শনিক অবস্থান, যেখানে নতুন মানুষকে পৃথিবীতে নিয়ে আসার নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এর প্রবক্তাদের একটি অংশ মনে করেন, জন্মের সঙ্গে মানুষের জীবনে যে কষ্ট, ঝুঁকি ও ক্ষতির সম্ভাবনা যুক্ত হয়, তা বিবেচনায় নিয়ে নতুন প্রাণের জন্ম দেয়া নৈতিকভাবে সমস্যাহীন সিদ্ধান্ত নয়।

আধুনিক কালে এই অবস্থানের সবচেয়ে আলোচিত প্রবক্তা দক্ষিণ আফ্রিকার দার্শনিক ডেভিড বেনাটার। ২০০৬ সালে প্রকাশিত ‘বেটার নেভার টু হ্যাভ বিন’ বইয়ে তিনি যে যুক্তি দেন, তা ‘অ্যাসিমেট্রি আর্গুমেন্ট’ নামে পরিচিত। তার মতে, কষ্টের অনুপস্থিতি ভালো। এমনকি তা উপভোগ করার মতো কেউ না থাকলেও। আর আনন্দের অনুপস্থিতি খারাপ হতে পারে কেবল তখনই, যখন কেউ তা থেকে বঞ্চিত হন। যে মানুষ জন্মায়ইনি, তিনি বঞ্চিত হওয়ার মতো কেউ নন। আর এই হিসাব ধরেই বেনাটার বলেন, জন্ম নেয়া সবসময় এক ধরনের ক্ষতি।

বেনাটারের যুক্তি নিয়ে বিস্তর সমালোচনাও হয়েছে। গবেষকদের কেউ মনে করেন, কষ্টের অনুপস্থিতিকে আনন্দের অনুপস্থিতির চেয়ে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করার এ যুক্তি থেকে ‘জন্ম না নেয়াই ভালো’ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। অন্যদের মতে, যুক্তিটির ভেতরে এমন কিছু অনুমান রয়েছে, যেগুলো আলাদাভাবে প্রমাণ করা প্রয়োজন। সমালোচকদের গোড়ার আপত্তি জীবনকে দেখার ধরন নিয়ে। জীবন কি শুধু ক্ষতি আর কষ্টের খতিয়ান? ভালোবাসা, সম্পর্ক, সৃষ্টিশীলতা, অভিজ্ঞতা আর নিজের জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়ার সামর্থ্য কি মূল্য নির্ধারণে কোনো ভূমিকা রাখে না? নিজের জীবন নিয়ে মানুষের নিজস্ব মূল্যায়নকেও তো হিসাবে ধরতে হয়। ২০২২ সালের একটি গবেষণায় দার্শনিক মাইকেল হাউসকেলার যুক্তি দেন, বেনাটারের অবস্থান থেকে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে অস্তিত্ব সব ক্ষেত্রেই অনস্তিত্বের চেয়ে খারাপ।

তবে পেসিমিজম বা নৈরাশ্যবাদী দর্শনের সঙ্গে অ্যান্টি-ন্যাটালিজমের পার্থক্যটি জরুরি। দুটি এক জিনিস নয়। কেউ জীবনের নানা দিককে সমস্যাপূর্ণ মনে করেও সন্তান নেয়ার পক্ষে থাকতে পারেন। আবার কেউ নৈরাশ্যবাদী না হয়েও সন্তান না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। সন্তান না নেয়া মানেই কেউ অ্যান্টি-ন্যাটালিস্ট, এমন ভাবা ভুল। কেউ হয়তো কর্মজীবন, আর্থিক অবস্থা কিংবা স্বাধীনতার কথা ভেবে থেমেছেন। কেউ ভেবেছেন জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ বা ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কথা। এই সিদ্ধান্তগুলোকে এক দর্শনের ছাতার নিচে ফেললে প্রতিটির প্রতিই অবিচার হয়।

তবে ব্যক্তিগত হলেও এই সিদ্ধান্তগুলো এখন আর একা নয়। এত মানুষের একই ধরনের সিদ্ধান্ত মিলে সমাজজুড়ে জন্মহার কমার বড় প্রবণতা তৈরি করেছে। জাতিসংঘের হিসাবে ২০২৪ সালে বিশ্বে গড় প্রজননহার ছিল নারীপ্রতি ২ দশমিক ২ সন্তান, ১৯৬০-এর দশকে যা ছিল প্রায় ৫। বিশ্বের ৫৫ শতাংশ দেশ ও অঞ্চলে হার ইতোমধ্যে ২ দশমিক ১-এর নিচে নেমেছে। জাতিসংঘ বলছে, ২১০০ সাল নাগাদ তা ১ দশমিক ৮-এ নামতে পারে। বিশ্বের জনসংখ্যা ২০৮০-র দশকের মাঝামাঝি প্রায় ১০ দশমিক ৩ বিলিয়নে গিয়ে চূড়ায় উঠবে, তারপর কমতে শুরু করবে।

এ সংখ্যা অবশ্য অ্যান্টি-ন্যাটালিজমের ফসল নয়। হার কমার পেছনে কাজ করছে শিক্ষা, নগরায়ণ, শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ, বিয়ের বয়স বেড়ে যাওয়া, গর্ভনিরোধকের ব্যবহার, সন্তান পালনের ব্যয় আর পরিবার সম্পর্কে বদলে যাওয়া ধারণা। তবে এর ফলে সন্তান নেয়া বা না নেয়ার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত জনসংখ্যা, শ্রমবাজার ও অর্থনীতির বড় আলোচনার সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। কম মানুষ সন্তান নিলে ভবিষ্যতের শ্রমশক্তি, বয়স্ক মানুষের সংখ্যা, সামাজিক নিরাপত্তা আর প্রবৃদ্ধির কী হবে? আবার উল্টো দিকে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি কমলে পরিবেশের ওপর মানুষের চাপও কমতে পারে। জাতিসংঘ নিজেই সেই সম্ভাবনার কথা বলেছে।

তাহলে শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা ‘সন্তান নেয়া উচিত কি অনুচিত’, এত সরল নয়। বরং প্রশ্ন হতে পারে, একজন নতুন মানুষকে পৃথিবীতে আনার সিদ্ধান্তে আমরা কী কী বিষয় বিবেচনা করছি। সন্তান নেয়া যেমন ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, না নেয়াও তেমনই। কিন্তু সেই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত যখন জনসংখ্যা, অর্থনীতি, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা মানুষ কীভাবে ভবিষ্যৎকে দেখতে চায়, সেই বড় প্রশ্নেরও অংশ হয়ে ওঠে। দর্শন এখানে উত্তর দেয় না, প্রশ্নটা কেবল স্পষ্ট করে। আর সেই প্রশ্নের জবাব প্রত্যেক মানুষ নিজের জীবন, বিবেচনা আর দায়বোধ থেকেই খুঁজে নেন।

আরও