ভূতেদেরও আছে জাত-ধর্ম, পেশা ও ব্যক্তিগত পছন্দ

বাংলার ভূতেদের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, তারা মানুষের সমাজ থেকে আলাদা কোনো জগৎ তৈরি করেনি

রাত গভীর হলে গ্রামের কোনো নির্জন পুকুরপাড়ে অচেনা কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে আজও কেউ কেউ সাবধান করে দেন— ওদিকে যেয়ো না, ওটা নিশির ডাক হতে পারে। বাঁশঝাড়ের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মনে পড়ে গেছোভূতের কথা। নদীর ঘাটে শোনা যায় মেছোভূতের গল্প, আর পুরনো গাছের নিচে অস্বাভাবিক ছায়া দেখলে মনে পড়ে এ বুঝি ব্রহ্মদৈত্য!

শাঁকচুন্নি, পেত্নী, মেছোভূত, মামদো ভূত কিংবা ব্রহ্মদৈত্য, বাংলার ভূতেরা কেবল ভয় দেখানোর চরিত্র নয়। তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে যেমন জড়িয়ে আছে আমাদের ছোটবেলার স্মৃতি, তেমনি এই ভূতেদেরও আছে বিস্তর ইতিহাস। রাত গভীর হলে গ্রামের কোনো নির্জন পুকুরপাড়ে অচেনা কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে আজও কেউ কেউ সাবধান করে দেন— ওদিকে যেয়ো না, ওটা নিশির ডাক হতে পারে। বাঁশঝাড়ের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মনে পড়ে গেছোভূতের কথা। নদীর ঘাটে শোনা যায় মেছোভূতের গল্প, আর পুরনো গাছের নিচে অস্বাভাবিক ছায়া দেখলে মনে পড়ে এ বুঝি ব্রহ্মদৈত্য!

পৃথিবীর প্রায় সব সংস্কৃতিতেই অতিপ্রাকৃত সত্তাকে ঘিরে নানা বিশ্বাস রয়েছে। তবে বাংলার ভূতেদের জগৎ বিশেষভাবে বৈচিত্র্যময়। কেউ জাতিগত পরিচয়ে, কেউ পেশায়, কেউ বৈবাহিক অবস্থায়, কেউ ধর্মীয় পরিচয়ে, আবার কেউ নির্দিষ্ট গাছ কিংবা জলাশয়ের সঙ্গে যুক্ত। প্রশ্ন জাগে, মানুষের কল্পনায় এমন বিচিত্র ভূতেদের জন্ম হলো কীভাবে?

এর উত্তর খুঁজতে ফিরে যেতে হয় সেই বাংলায়— যেখানে বিদ্যুৎ ছিল না, রাতের পথঘাট ছিল অন্ধকার, নদী ছিল জীবনের প্রধান অবলম্বন, আর প্রকৃতির বহু রহস্যের ব্যাখ্যা মানুষের জানা ছিল না। আকস্মিক মৃত্যু, নিখোঁজ হয়ে যাওয়া কিংবা অচেনা শব্দের ব্যাখ্যা খুঁজতে মানুষ আশ্রয় নিত লোকবিশ্বাসে। সেই বিশ্বাসের ভেতর দিয়েই গড়ে উঠেছিল বাংলার নিজস্ব অতিপ্রাকৃত জগৎ।

বাংলার ভূতেদের পরিচয়ের আড়ালে সমাজের নানা স্তরের ছাপ স্পষ্ট। যেমন শাঁকচুন্নির পরিচয় বুঝতে হলে জানতে হয় একসময়কার বাঙালি হিন্দু নারীর সামাজিক অবস্থান। প্রচলিত বিশ্বাসে শাঁকচুন্নি হলো বিবাহিত নারীর অতৃপ্ত আত্মা। হাতে শাঁখা, সিঁথিতে সিঁদুর, পরনে শাড়ি— বিবাহিত নারীর এই চিহ্নগুলো মৃত্যুর পরও তার পরিচয়ের অংশ হয়ে থাকে। লোককথায় কখনো সে অন্য নারীর সংসারে প্রবেশ করতে চায়, কখনো আবার মাছের প্রতি তার বিশেষ আকর্ষণের কথা শোনা যায়। একসময় বাংলার হিন্দু বিধবার খাদ্যাভ্যাসে মাছ নিষিদ্ধ বা সীমিত ছিল। বিশেষ করে বাল্যবিধবাদের জীবনে খাবার, সাজসজ্জা ও ব্যক্তিগত আনন্দের ওপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হতো। ফলে লোককথার মাছপ্রিয় নারী-ভূতকে অনেক সময় অপূর্ণ ইচ্ছা ও বঞ্চনার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। যেন জীবনে যে আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি, মৃত্যুর পরও তা তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।

শাঁকচুন্নির পাশেই রয়েছে পেত্নী। প্রচলিত বিশ্বাসে অবিবাহিত অবস্থায়, অল্প বয়সে কিংবা অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মারা যাওয়া নারীর আত্মাকে পেত্নী বলা হয়। অঞ্চলভেদে এই পরিচয়ের ভিন্নতা রয়েছে। নির্জন গাছ, পুকুরপাড় কিংবা বাঁশঝাড়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার নানা গল্প। পেত্নীর চরিত্রে নারীর অপূর্ণতা, সামাজিক অসহায়ত্ব এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নারীকে ঘিরে তৈরি ভয় ও সন্দেহের ছায়া খুঁজে পাওয়া যায়। বিস্ময়কর হলো, বাংলার ভূতেদের জগতেও নারীর পরিচয় অনেক সময় তার বৈবাহিক অবস্থার ওপর নির্ভরশীল। যেন মৃত্যুর পরেও সমাজ তাকে বিবাহিত কিংবা অবিবাহিত পরিচয়ের বাইরে ভাবতে পারেনি।

বাংলার নদীমাতৃক জীবনের প্রতিচ্ছবি হয়ে আছে মেছোভূত। নামের মধ্যেই তার পরিচয়-মাছপ্রিয় ভূত। লোকবিশ্বাসে পুকুর, নদীর ঘাট কিংবা মাছ ধরার নির্জন জায়গায় তার আনাগোনা। রাতের বেলা মাছ নিয়ে বাড়ি ফেরা জেলে কিংবা পথচারীর কাছে সে মাছ দাবি করে বসে। এই চরিত্রের পেছনে রয়েছে বাংলার জলজ জীবনযাত্রার প্রভাব। মাছ শুধু খাদ্য নয়, অসংখ্য মানুষের জীবিকা ও সংস্কৃতির অংশ। জেলেদের রাতের মাছ ধরা, নির্জন জলাশয়ে কাজ করা কিংবা নদীপথে চলাচলের অভিজ্ঞতা লোককথায় অতিপ্রাকৃত রূপ পেয়েছে। অন্ধকারে নদীর শব্দ, পানির অস্বাভাবিক ঢেউ আর অচেনা উপস্থিতি মিলেই যেন জন্ম দিয়েছে মাছখেকো এই ভূতের।

ধর্মীয় পরিচয়ের ছাপও বাংলার ভূতেদের জগতে স্পষ্ট। যেমন মামদো ভূত। প্রচলিত হিন্দু লোকবিশ্বাসে মুসলমান মৃত ব্যক্তির আত্মাকে মামদো ভূত বলা হয়। ঊনবিংশ শতকের বাংলার গ্রামীণ জীবন নিয়ে লেখা লালবিহারী দে-র ‘গোবিন্দ সামন্ত’ (১৮৭৪) গ্রন্থেও মামদোকে মুসলমান ভূত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে ব্রহ্মদৈত্য যেন বাংলার ভূতেদের জগতের অভিজাত শ্রেণির প্রতিনিধি। প্রচলিত বিশ্বাসে মৃত ব্রাহ্মণের আত্মা ব্রহ্মদৈত্য হয়ে ওঠে। বেলগাছ কিংবা অশ্বত্থগাছের সঙ্গে তার বসবাসের সম্পর্ক টানা হয়। অন্য ভূতেদের তুলনায় তাকে অনেক সময় জ্ঞানী, মার্জিত ও সদাশয় হিসেবে বর্ণনা করা হয়। ঊনবিংশ শতকের লোকসংস্কৃতিবিষয়ক বিবরণেও ব্রহ্মদৈত্যকে উচ্চ মর্যাদার অতিপ্রাকৃত সত্তা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

তবে সব ভূতের পরিচয় সামাজিক অবস্থান দিয়ে তৈরি হয়নি। কিছু ভূতের জন্ম হয়েছে প্রকৃতির অচেনা পরিবেশকে ঘিরে। যেমন গেছোভূত। নির্জন স্থানে দাঁড়িয়ে থাকা পুরনো বট, অশ্বত্থ, তেঁতুল কিংবা শ্যাওড়াগাছকে ঘিরে বাংলায় বহু অতিপ্রাকৃত কাহিনি প্রচলিত। দিনের বেলায় যে গাছ আশ্রয় দেয়, রাতের অন্ধকারে তার ঘন ডালপালা, ঝুলে থাকা শিকড় কিংবা বাতাসে নড়তে থাকা ছায়াই হয়ে উঠত ভয়ের উৎস।

আর আছে নিশি, বাংলার ভূতেদের মধ্যে অন্যতম রহস্যময় চরিত্র। লোকবিশ্বাসে নিশি গভীর রাতে পরিচিত মানুষের কণ্ঠস্বর নকল করে কাউকে বাইরে ডেকে নিয়ে যায়। নিজের নাম ধরে ডাক শুনে অন্ধকারে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলে বিপদ হতে পারে— এমন সতর্কবাণী বহু প্রজন্ম ধরে প্রচলিত। এই গল্পের পেছনে রয়েছে অন্ধকারে পরিচিত আর অপরিচিতের পার্থক্য হারিয়ে ফেলার ভয়। বিদ্যুৎ ও আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার আগের গ্রামীণ সমাজে রাতে একা বের হওয়া ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। তাই নিশির গল্পকে নিছক অতিপ্রাকৃত আতঙ্ক না ভেবে মানুষের নিরাপত্তাহীনতার সাংস্কৃতিক প্রকাশ হিসেবেও দেখা যায়।

আসলে বাংলার ভূতেদের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, তারা মানুষের সমাজ থেকে আলাদা কোনো জগৎ তৈরি করেনি। মানুষের ধর্ম, জাতপাত, পেশা, খাদ্যাভ্যাস, সম্পর্ক, বঞ্চনা ও ভয় নিয়েই তাদের পৃথিবী গড়ে উঠেছে। তাই বাংলার ভূতের গল্পগুলো কেবল ভয় দেখানোর কাহিনি নয়; এগুলো বহু প্রজন্মের জীবনযাপন, সামাজিক কাঠামো, প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক এবং অব্যক্ত আতঙ্কের এক অলিখিত দলিল।

আরও