ইমতিয়াজ আলীর সিনেমায় সংগীত শুধু প্রচলিত অনুষঙ্গ নয়, বরং চরিত্রের বিস্তার ও অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম। আর এ সফরে বরাবরই সঙ্গী হন গীতিকার ইরশাদ কামিল। ২০১১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘রকস্টার’ সিনেমায় এ জুটির সঙ্গে যোগ দেন ও সংগীত পরিচালক এ আর রহমান। সিনেমাটির সাউন্ডট্র্যাকজুড়ে প্রধান চরিত্রের প্রেম, অপ্রাপ্তি ও মানসিক ভাঙন বিভিন্ন রূপে উঠে এসেছে। এ লেখার বিষয় হলো ‘তুম হো’ ও ‘তুম কো’ শিরোনামের দুটি গান। কাছাকাছি সুরের মোটিফে গাঁথা হলেও অনুভূতির প্রকাশে গান দুটি একদম দুই মেরুর। প্রথমটি জায়গা পেয়েছে সিনেমায়, দ্বিতীয়টি রয়েছে শুধু অডিও অ্যালবামে।
দুটি গানই ব্যালাডধর্মী; সুরে রয়েছে শান্ত বিষণ্ণতা ও বিচ্ছেদের আভাস। কিন্তু গায়কী, সংগীতায়োজন ও গীতিকবিতার ভিন্নতায় একই আবেগের দুই রূপ তৈরি হয়েছে—একটিতে প্রিয় মানুষের সান্নিধ্যে আশ্রয় খোঁজার আকাঙ্ক্ষা, অন্যটিতে তার অনুপস্থিতিতে জন্ম নেয়া শূন্যতা।
জনার্দন বা জর্ডান ও হীরের প্রেমের মুহূর্তগুলোকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ‘তুম হো’। মোহিত চৌহানের কোমল কণ্ঠের সঙ্গে অ্যাকুস্টিক গিটার ও পিয়ানোর সুর গানটিতে এনেছে অন্তরঙ্গ, নস্টালজিক আবেদন। প্রিয় মানুষের কাছে নিজেকে সমর্পণের মাঝে সময় যেন থমকে গেছে। বাইরের পৃথিবীর কোলাহল থেকে দূরে প্রেমিক-প্রেমিকার নিজেদের মধ্যে হারিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই এখানে মুখ্য।
গানটির বিষণ্ণতা তাই প্রশান্তিকে ছাপিয়ে যায় না। বরং প্রিয় মানুষের সান্নিধ্যকে জীবনের অনিশ্চয়তা থেকে সাময়িক আশ্রয় হিসেবে তুলে ধরে। প্রেম এখানে শুধু আকুলতা নয়, একধরনের আত্মসমর্পণ—যেখানে নিজের অস্তিত্বও প্রিয়জনের সঙ্গে মিশে যায়। কিন্তু ঘোর কেটে গেলে এ গানের অনির্বচনীয় অনুভূতি এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি করে। কারণ নিত্য দিনের যাপন এত মসৃণ নয়, জীবনও এতটা মীমাংসিত নয়।
অ্যালবাম কাভার
‘তুম কো’ যেন সেই অস্বস্তির স্বরূপ উন্মোচন করে। এ গানে সেই আশ্রয়ের অনুভূতি নেই; আছে অন্তর্গত যন্ত্রণা ও আত্ম-অনুসন্ধান। সিনেমার দৃশ্যায়নে জায়গা না পেলেও গানটি অ্যালবামে ভালোবাসার অন্ধকার দিকটি তুলে ধরে। কবিতা কৃষ্ণমূর্তির পরিণত, শাস্ত্রীয় সংগীতের ছোঁয়াযুক্ত কণ্ঠে আবেগের প্রকাশ সংযত, কিন্তু তার গভীরে রয়েছে তীব্র হাহাকার।
‘তুম হো’র কোমল অ্যারেঞ্জমেন্ট ও পশ্চিমা সংগীতের প্রভাবের বিপরীতে ‘তুম কো’তে তবলার পরিমিত বোল, সারঙ্গীর দীর্ঘ সুর এবং শাস্ত্রীয় সংগীতের আবহ তৈরি করেছে ভারি, ট্র্যাজিক মাত্রা। এখানে প্রেমের উচ্ছ্বাসের চেয়ে দূরত্ব ও অপ্রাপ্তির যন্ত্রণা বেশি স্পষ্ট। প্রেম তো দূরেরই বিষয়! সংগীতের মৃদু স্পন্দন সেই চাপা কষ্টকে আরো গভীর করে তোলে।
গান দুটির পার্থক্য ফুটে উঠেছে ইরশাদ কামিলের গীতিকবিতায়ও। ‘তুম হো’য় প্রিয় মানুষকে নিজের অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে আবিষ্কারের অনুভূতি রয়েছে। প্রিয়জনের উপস্থিতি একাকিত্ব ও অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনের অর্থ খুঁজে পেতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, ‘তুম কো’য় প্রিয় মানুষের অনুপস্থিতিই হয়ে ওঠে মূল অনুভূতি। সবকিছু উজাড় করে দেয়ার পরও শূন্যতা থেকে যাওয়ার যে বেদনা, গানটি তারই প্রকাশ। ভালোবাসা এখানে মানুষকে ভেঙে দেয়, আবার সেই ভাঙনের মধ্য দিয়েই তাকে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। ফলে দুটো গান একটি জোড়, যারা নিরন্তন নিজেদের খুঁজে চলে।
একই সুরে না হলেও আবেগের এই বৈপরীত্য ‘রকস্টার’-এর পুরো সাউন্ডট্র্যাকেই ছড়িয়ে আছে। এ আর রহমান বিভিন্ন সংগীতধারাকে পাশাপাশি রেখে জনার্দনের মানসিক রূপান্তরকে তুলে ধরেছেন। ‘কুন ফায়া কুন’-এ সুফি সংগীতের আধ্যাত্মিকতা ও স্রষ্টার সন্ধানের আকুলতা থাকলেও রকধর্মী ‘সাদা হক’ প্রকাশ করে ক্ষোভ, বিদ্রোহ ও তারুণ্যের অস্থিরতা। একদিকে আত্মিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে ভেতরে জমে থাকা যন্ত্রণার বিস্ফোরণ—এই দুই বিপরীত সুরে চরিত্রটির অন্তর্দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
পরিচালক ইমতিয়াজ আলী, সুরকার ও সংগীত পরিচালক এ আর রহমান এবং গীতিকার ইরশাদ কামিল
লোকসংগীতের প্রাণবন্ত সুরের সঙ্গে বিষণ্ণ মেলোডির বৈপরীত্যও অ্যালবামটিকে সমৃদ্ধ করেছে। ‘কাতিয়া করুঁ’ ও ‘হাওয়া হাওয়া’র ছন্দময় আবহের বিপরীতে ‘নাদান পারিন্দে’ ও ‘ফির সে উড় চল’ তুলে ধরে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, আত্ম-অনুসন্ধান ও নিঃসঙ্গতা। ফলে অ্যালবামটি নিছক রোমান্টিক গান বা রকসংগীতের সংকলন হয়ে থাকেনি; হয়ে উঠেছে এক মানুষের মানসিক রূপান্তরের সংগীতময় আখ্যান।
অ্যালবামের অন্য গানগুলো সিনেমায় ব্যবহৃত হলেও ‘তুম কো’ কেন দৃশ্যায়নে জায়গা পায়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। এর একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, জনার্দন ও হীরের প্রেম এবং পরবর্তী বিচ্ছেদের আবেগ ফুটিয়ে তুলতে ‘তুম হো’কেই পূর্ণাঙ্গ দৃশ্যায়ন দিয়েছিলেন পরিচালক ইমতিয়াজ আলী। কাছাকাছি আবেগের আরেকটি গান যুক্ত হলে গল্পের গতি ব্যাহত হওয়ার বা একই অনুভূতির পুনরাবৃত্তি ঘটার আশঙ্কা ছিল।
তবে সিনেমায় জায়গা না পেলেও ‘তুম কো’র আবেদন কমেনি। বরং অ্যালবামে স্বতন্ত্রভাবে শুনলে গানটি চরিত্রগুলোর না-বলা অনুভূতির দিকে মনোযোগ ফেরায়। পর্দার দৃশ্যের বাইরে থেকেও এটি সিনেমার ট্র্যাজিক আবহের একধরনের সংগীতময় প্রতিধ্বনি হয়ে ওঠে। তবে গানটি বাদ দেয়ার পেছনে নির্মাতার নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য নেই। তাই এই ব্যাখ্যাকে সম্ভাব্য নান্দনিক বিশ্লেষণ হিসেবেই দেখা যেতে পারে।
‘রকস্টার’ দিল্লির সাধারণ কলেজছাত্র জনার্দন থেকে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন রকস্টার জর্ডানে পরিণত হওয়ার যাত্রা। নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন রণবীর কাপুর। সমাজের উচ্চ শ্রেণির তরুণী হীরের চরিত্রে ছিলেন নার্গিস ফাখরি। প্রেম, অপ্রাপ্তি ও আত্মিক বিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে শিল্পী হয়ে ওঠার এই গল্পে সংগীত শুধু আবহ তৈরি করেনি, চরিত্রের অন্তর্গত ভাঙনও প্রকাশ করেছে। আর ‘রকস্টার’ হয়ে উঠে ২০১১ সালের অন্যতম সফল বলিউড সিনেমা।
এ আর রহমানের সুর, ইরশাদ কামিলের কথা ও মোহিত চৌহানের কণ্ঠ সিনেমাটির সংগীতভুবনকে বিশেষ মাত্রা দিয়েছে। এ আর রহমানের কণ্ঠ ‘ফুন ফায়া ফুন’ চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে জনপ্রিয় গান, যা সুফি ট্র্যাডিশনের উচ্চতাকেই তুলে ধরে। আরো আছেন কবিতা কৃষ্ণমূর্তি, জাভেদ আলী ও হর্ষদীপ কৌরের মতো শিল্পীরা। সব মিলিয়ে এ অ্যালবামকে বলিউডে দশকের সেরা সংকলন হিসেবে ধরা হয়, যা এখনো শ্রোতাদের আত্মিক ক্ষুধা মিটিয়ে যাচ্ছে।