দস্তয়েভস্কির জীবন পাল্টে দিয়েছিলেন যে নারী

উপন্যাসটি প্রকাশের পর দস্তয়েভস্কি রক্ষা পেলেন আর্থিক ধ্বংস থেকে। কিন্তু তার চেয়েও বড় বিষয়, তিনি খুঁজে পেলেন জীবনের নতুন অর্থ। আন্নাকে তিনি বিয়ে করেন ১৮৬৭ সালে। শুরু হয় তাদের দাম্পত্য জীবন। দারিদ্র্য, ঋণ, ইউরোপে পালিয়ে বেড়ানো সবকিছুর মাঝেও তারা একে অপরকে হারাননি। আন্নাই তার লেখাগুলোকে নতুন করে সাজিয়েছেন, পরিচালনা করেছেন পারিবারিক আর্থিক পরিকল্পনা, এমনকি জুয়া খেলার ভয়ংকর আসক্তি থেকেও ধীরে ধীরে তাকে মুক্ত করেছেন।

১৮৬৬ সালের শীতের সকাল। এক মধ্যবয়স্ক লেখক তার ঘরে বসে আছেন। নাম ফিওদর মিখাইলোভিচ দস্তয়েভস্কি। তিনি ছিলেন বিপর্যস্ত, হতাশাগ্রস্থ। দুই বছর আগে সালে প্রথম স্ত্রী মারা গেছেন, একই বছরে ভাইয়ের মৃত্যু তাকে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করে দেয়। পাশাপাশি জুয়া খেলার নেশা তাকে গ্রাস করছিল।

তিনি খুজছিলেন স্টেনোগ্রাফার। কারণ দ্রুত একটি উপন্যাস লিখে প্রকাশকের হাতে তুলে দিতে হবে। প্রকাশকের সঙ্গে চুক্তি হয়। প্রকাশক স্টেলোভস্কি দস্তয়েভস্কিকে শর্ত দিয়েছিলেন, এক মাসের মধ্যে নতুন উপন্যাস জমা দিতে হবে। না হলে আগের সব লেখালেখির মালিকানা হারাবেন। সে চুক্তির সময়সীমা শেষ হতে তখন মাত্র ২৬ দিন বাকি। তখন স্টেনোগ্রাফারের খোঁজে দস্তয়েভস্কি বিজ্ঞাপন দেন।

বিজ্ঞাপন দেখে এক নারী আগ্রহ প্রকাশ করেন। তার নাম আন্না স্নিতকিনা। বিজ্ঞাপন দেখার পর তিনি তার বাবার সঙ্গে কথা বলেন। তার বাবা ছিলেন দস্তয়েভস্কির পাঠক। বাবার সম্মতি পেয়ে আন্না দস্তয়েভস্কির সঙ্গে কাজ শুরু করেন।

প্রথম সাক্ষাতে দস্তয়েভস্কি ছিলেন গম্ভীর, ভঙ্গুর, হতাশাগ্রস্থ। এসব দেখে আন্না ডুবে ছিল নানা ভাবনায়। শুরু হয় দুজনের যৌথ কাজ। প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা ধরে দস্তয়েভস্কি মুখে বলতেন, আন্না লিখে নিতেন। মাত্র ২৬ দিনে শেষ হয় ‘‌দ্য গ্যাম্বলার’। উপন্যাসটি ছিল মূলত দস্তয়েভস্কির জীবনের প্রতিচ্ছবি। তার নানা অনুভূতি, বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন উপন্যাসের নায়কের চরিত্রে। আন্না এসব লেখার সময় কখনো বিরক্ত হতেন, কখনো দস্তয়েভস্কির জন্য মায়া কাজ করত, কখনো প্রেম। বিরক্ত হতেন জুয়ার অভ্যাস দেখে।

উপন্যাসের নায়কের নাম ছিল অ্যালেক্সেই। নায়কের আত্মবিনাশের পেছনে যে মানসিক অস্থিরতা, যে আবেগের তীব্রতা, সেটিই ছিল দস্তয়ভেস্কির নিজের অভিজ্ঞতা। কিন্তু সেসময় আন্নার উপস্থিতি তাকে ধীরে ধীরে স্থির হতে সাহায্য করে। আন্না শুধু স্টেনোগ্রাফার নন, হয়ে উঠেছিলেন এক শ্রোতা, বন্ধু, যিনি দস্তয়ভেস্কির ভয়, আসক্তি ও হতাশার ভাষা বুঝতেন।

বিপদ বাধল, ‘‌দ্য গ্যাম্বলার’ উপন্যাসটি জমা দেয়ার আগে। প্রকাশক দস্তয়ভেস্কিকে বিপদে ফেলতে নিজের বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যান। জমা না নিয়ে হতে চেয়েছিলেন দস্তয়েভস্কির পূর্বের সব লেখার মালিক। এরপরে দস্তয়েভস্কি শরনাপন্ন হন আন্নার। আন্নার পরামর্শে ওইদিন তারা দুজনে গিয়ে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। জমা দেন উপন্যাসের পান্ডুলিপি। এ ধাক্কায় বেঁচে যান দস্তয়েভস্কি।

উপন্যাসটি প্রকাশের পর দস্তয়েভস্কি রক্ষা পেলেন আর্থিক ধ্বংস থেকে। কিন্তু তার চেয়েও বড় বিষয়, তিনি খুঁজে পেলেন জীবনের নতুন অর্থ। আন্নাকে তিনি বিয়ে করেন ১৮৬৭ সালে। শুরু হয় তাদের দাম্পত্য জীবন। দারিদ্র্য, ঋণ, ইউরোপে পালিয়ে বেড়ানো সবকিছুর মাঝেও তারা একে অপরকে হারাননি। আন্নাই তার লেখাগুলোকে নতুন করে সাজিয়েছেন, পরিচালনা করেছেন পারিবারিক আর্থিক পরিকল্পনা, এমনকি জুয়া খেলার ভয়ংকর আসক্তি থেকেও ধীরে ধীরে তাকে মুক্ত করেছেন।

যদি ১৮৬৬ সালের সে শীতের সকালে আন্না স্নিতকিনা তার দরজায় না পৌঁছাতেন, হয়তো দস্তয়েভস্কির জীবন শেষ হয়ে যেত জুয়া, ঋণ ও হতাশার অন্ধকারে। ‘‌দ্য গ্যাম্বলার’ হয়তো লেখাই হতো না, কিংবা লেখা হলেও তার লেখক হারিয়ে যেতেন।

আরও