প্রথম দুই পর্বে আলোচনা হয়েছে ডিওয়ার্মিং, ভ্যাকসিন এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলার উপায় নিয়ে। কিন্তু সময়মতো টিকা দেয়ার পরও অসাবধানতা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ বা সংক্রমণের কারণে কিটেন নানা রোগে আক্রান্ত হতে পারে। বিশেষ করে ছয় মাসের কম বয়সী বিড়ালছানার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পুরোপুরি পরিণত হয় না। তাই এই সময়টাতে সামান্য অসুস্থতাও দ্রুত জটিল আকার নিতে পারে।
এআই দিয়ে তৈরি
জ্বর: শরীরে সংক্রমণের প্রথম সংকেত
জ্বর নিজে কোনো রোগ নয়; এটি শরীরে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা পরজীবীর সংক্রমণের লক্ষণ। কিটেনের শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে, খাওয়া বন্ধ করলে, সারাদিন ঘুমিয়ে থাকলে বা খেলাধুলা কমে গেলে দ্রুত ভেটেরিনারিয়ানের কাছে নিতে হবে। দীর্ঘ সময় জ্বর থাকলে শরীরে পানিশূন্যতা ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের জটিলতা দেখা দিতে পারে।
ফেলাইন ফ্লু: একটি হাঁচি থেকেও শুরু হতে পারে বড় বিপদ
কিটেনদের সবচেয়ে পরিচিত সংক্রামক রোগগুলোর একটি হলো ফেলাইন ফ্লু। এটি মূলত ফেলাইন হারপিস ভাইরাস (এফএইচভি-১) এবং ফেলাইন ক্যালিসিভাইরাস (এফসিভি) দ্বারা হয়। আক্রান্ত বিড়ালের হাঁচি, কাশি, চোখ ও নাকের স্রাবের মাধ্যমে এটি সহজেই ছড়িয়ে পড়ে।
প্রথম দিকে হাঁচি, নাক দিয়ে পানি পড়া ও চোখে স্রাব দেখা দিলেও চিকিৎসা না হলে মুখে ঘা, খাওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং পরে নিউমোনিয়ার মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে।
নিউমোনিয়া: শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণের ভয়ংকর রূপ
ফ্লু বা শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের চিকিৎসা দেরি হলে তা অনেক সময় ফুসফুসে ছড়িয়ে নিউমোনিয়া সৃষ্টি করে। আবার মাইকোপ্লাজমা ফেলিসের মতো ব্যাকটেরিয়াও নিউমোনিয়ার কারণ হতে পারে।
দ্রুত শ্বাস নেয়া, মুখ খুলে শ্বাস নেয়া, শ্বাসকষ্ট, অবসন্নতা ও খাবার ছেড়ে দেয়া— এসব লক্ষণ দেখা দিলে এক মুহূর্তও দেরি করা উচিত নয়। নিউমোনিয়া কিটেনের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে।
ফাঙ্গাল ইনফেকশন: শুধু বিড়াল নয়, মানুষও আক্রান্ত হতে পারে
রিংওয়ার্ম নামে পরিচিত ফাঙ্গাল সংক্রমণ কিটেনদের মধ্যে খুবই সাধারণ। এটি ছত্রাকের সংক্রমণে হয় এবং আক্রান্ত বিড়াল, দূষিত বিছানা, ব্রাশ বা পরিবেশ থেকেও ছড়াতে পারে।
শরীরের নির্দিষ্ট জায়গায় গোলাকার হয়ে লোম পড়ে যাওয়া, খোসার মতো চামড়া ওঠা ও চুলকানি এর সাধারণ লক্ষণ। এটি মানুষের শরীরেও ছড়িয়ে যেতে পারে। তাই আক্রান্ত কিটেনকে দ্রুত চিকিৎসার পাশাপাশি আলাদা রাখা প্রয়োজন।
মাইকোপ্লাজমা: চোখ ও শ্বাসতন্ত্রের নীরব সংক্রমণ
মাইকোপ্লাজমা ফেলিস একটি ব্যাকটেরিয়া, যা সাধারণত চোখ ও শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণ ঘটায়। চোখ লাল হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত স্রাব, হাঁচি, কাশি এবং শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। অনেক সময় এটি ভাইরাসজনিত সংক্রমণের সঙ্গে মিলেও দেখা দেয়, ফলে রোগ আরো জটিল হয়ে ওঠে।
টক্সোপ্লাজমা: কাঁচা মাংস ও শিকারের মাধ্যমে সংক্রমণ
টক্সোপ্লাজমোসিস হয় টক্সোপ্লাজমা গনডি নামের এক ধরনের পরজীবীর কারণে। কাঁচা বা অপর্যাপ্ত রান্না করা মাংস খাওয়া, সংক্রমিত ইঁদুর বা পাখি শিকার করা কিংবা দূষিত পরিবেশ থেকে বিড়াল আক্রান্ত হতে পারে।
বেশির ভাগ সুস্থ বিড়ালে তেমন লক্ষণ না থাকলেও ছোট কিটেনের ক্ষেত্রে জ্বর, দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, চোখের সমস্যা ও স্নায়বিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।
অ্যানিমিয়া বা রক্তশূন্যতা কেন হয়?
কিটেনদের অ্যানিমিয়ার অন্যতম কারণ অতিরিক্ত ফ্লি, কৃমি, দীর্ঘদিনের অপুষ্টি কিংবা হেমোপ্লাজমা জাতীয় রক্তের জীবাণু।
অ্যানিমিয়া হলে মাড়ি ফ্যাকাশে হয়ে যায়, দুর্বলতা দেখা দেয়, খেলাধুলা কমে যায় এবং অনেক সময় শ্বাসও দ্রুত চলতে থাকে। সময়মতো চিকিৎসা না হলে এটি জীবনহানির কারণ হতে পারে।
এফআইপি: সবচেয়ে ভয়ংকর রোগগুলোর একটি
সাধারণ করোনাভাইরাসের একটি বিরল জিনগত পরিবর্তনের ফলে ফেলাইন ইনফেক্টিয়াস পেরিটোনিটিস (এফআইপি) হয় বিড়ালের । এটি এক বিড়াল থেকে আরেক বিড়ালে সরাসরি এফআইপি হিসেবে ছড়ায় না। বরং করোনাভাইরাসে সংক্রমিত বিড়ালের শরীরের ভেতর ভাইরাস মিউটেটেড বা পরিবর্তিত হয়ে এ রোগ সৃষ্টি করে।
দীর্ঘদিন জ্বর, ওজন কমে যাওয়া, খাওয়া কমে যাওয়া, পেট বা বুকে পানি জমা, চোখ বা স্নায়ুর সমস্যা— এসব এফআইপির লক্ষণ হতে পারে। বর্তমানে কার্যকর চিকিৎসা পাওয়া গেলেও দ্রুত শনাক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।
ফ্লি: ছোট পরজীবী, বড় সমস্যা
ফ্লি শুধু চুলকানির কারণ নয়। এটি রক্ত এর বাহকের খেয়ে বেঁচে থাকে এবং অতিরিক্ত সংক্রমণে ছোট কিটেনের মারাত্মক রক্তশূন্যতা হতে পারে। এছাড়া ফ্লির মাধ্যমে টেপওয়ার্মের সংক্রমণও হতে পারে।
নিয়মিত গ্রুমিং, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী নিরাপদ ফ্লি প্রতিরোধক ব্যবহার করলে এ ঝুঁকি অনেক কমে যায়।
অসুস্থতা লুকিয়ে রাখে কিটেন
বিড়াল স্বভাবগতভাবেই অসুস্থতা অনেক সময় লুকিয়ে রাখে। তাই খাওয়া কমে যাওয়া, বারবার লুকিয়ে থাকা, খেলাধুলা বন্ধ করা, দ্রুত শ্বাস নেয়া, চোখ-নাক দিয়ে স্রাব, বারবার বমি বা ডায়রিয়ার মতো লক্ষ্মণগুলোকে কখনোই সাধারণ সমস্যা ভেবে অবহেলা করা উচিত নয়।
কিটেনদের সুস্থ রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো প্রতিরোধ। সময়মতো ডিওয়ার্মিং, আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুযায়ী ভ্যাকসিন, সুষম খাদ্য, পরিষ্কার পরিবেশ এবং অসুস্থতার প্রথম লক্ষণেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া— এই পাঁচটি অভ্যাসই একটি ছোট্ট কিটেনকে সুস্থ, সবল ও দীর্ঘজীবী বিড়ালে পরিণত করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে।
সুরক্ষা সিরিজের পূর্ববর্তী পর্ব—
পর্ব-২: কিটেনদের টিকা বা ভ্যাকসিনেশনের সঠিক নিয়ম ও ইমিউনিটি তৈরির কৌশল