৮১ বছরে অ্যানিমেল ফার্ম

অরওয়েল কি স্টালিনের রাশিয়ার কথা বলেছিলেন, না ক্ষমতার চিরন্তন রূপের!

উপন্যাসের শেষ অধ্যায়ে খামারের দেয়ালে লেখা আগের মূল নীতি 'সকল প্রাণী সমান' সংশোধন করা হয়। লেখা হয় 'সকল প্রাণীই সমান, কিন্তু কিছু প্রাণী অন্যদের চেয়ে বেশি সমান'। এই একটি বাক্যেই অরওয়েল সব যুগের, সব দেশের স্বৈরাচারের মূল মনস্তত্ত্বকে তুলে ধরেছেন। শাসকগোষ্ঠী কীভাবে আইনের ভাষা বদলে নিজেদের বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করে, কিভাবে ইতিহাস বিকৃতি এবং সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা ও ভয়কে পুঁজি করে শোষণের রাজত্ব কায়েম করে

জর্জ অরওয়েলের বিখ্যাত ‘অ্যানিমেল ফার্ম’ প্রকাশ হয় ১৯৪৫ সালের ১৭ আগস্ট। ওই সময় সাধারণ পাঠকরা উপন্যাসটিকে নিজেদের সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাস ও জোসেফ স্ট্যালিনের স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার এক ব্যঙ্গচিত্র যেন ‘অ্যানিম্যাল ফার্ম’। মেজর নামের এক শূকরের আহ্বানে খামারের শোষিত পশুদের বিদ্রোহ, ম্যানর ফার্মকে অ্যানিম্যাল ফার্মে রূপান্তর এবং পরবর্তীতে নেপোলিয়ন নামক এক শূকরের একক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠার গল্প ছিল এ উপন্যাস।

এ সবকিছুতেই যেন ফুটে উঠে ছিল ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব, লেনিনের আদর্শ, ট্রটস্কির নির্বাসন এবং স্ট্যালিনের কঠোর দমনপীড়নের প্রতিচ্ছবি। প্রথম প্রকাশের আট দশক পর এসে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে দাঁড়ায়- অরওয়েল কি কেবল স্ট্যালিন ও তৎকালীন সোভিয়েত সমাজ ব্যবস্থার সমালোচনা করেছিলেন, নাকি দেখিয়েছেন যুগ যুগ ধরে বয়ে চলা রাজনৈতিক ক্ষমতা ও দুর্নীতির এক রূপরেখা?

উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্র ও ঘটনার আড়ালে সমকালীন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ছিল। নেপোলিয়নের হিংস্রতার মধ্যে স্ট্যালিন, স্নোবলের বৈপ্লবিক চিন্তার মধ্যে ট্রটস্কি কিংবা বক্সার নামের পরিশ্রমি ঘোড়ার মধ্যে সোভিয়েতের মেহনতি মানুষের আনুগত্য।

কিন্তু অরওয়েল যদি কেবল স্ট্যালিন এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে তার গল্প সীমাবদ্ধ রাখতেন, তবে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সঙ্গেই এ বইয়ের প্রাসঙ্গিকতা শেষ হয়ে যেত। কিন্তু অ্যানিমেল ফার্ম এখনো ইতিহাসে প্রাসঙ্গিক। অ্যানিমেল ফার্ম আজও পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের স্বৈরাচার ও ক্ষমতার রূপান্তর বোঝার জন্য একটি অপরিহার্য বই।

অরওয়েল মূলত এ উপন্যাসে এক সত্য উন্মোচিত করেছেন- বিপ্লব কীভাবে নিজের সন্তানকে গ্রাস করে এবং আদর্শবাদ কীভাবে ক্ষমতার লোভের কাছে পরাজিত হয়।

খামারের প্রাণীরা যখন অত্যাচারী শাসক মিস্টার জোন্সের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল, তখন তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল সমতা, স্বাধীনতা ও শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। তাদের মূল নীতি ছিল সকল প্রাণী সমান। কিন্তু ক্ষমতায় বসার সঙ্গে সঙ্গেই শূকরেরা সাধারণ প্রাণীদের থেকে নিজেদের আলাদা করতে শুরু করল। তথাকথিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার দোহাই দিয়ে এবং স্কুইলারের সাহায্যে তারা একের পর এক নিয়ম পরিবর্তন করতে থাকে যা ছিল তাদের বিপ্লবের মূলমন্ত্র।

উপন্যাসের শেষ অধ্যায়ে খামারের দেয়ালে লেখা আগের মূল নীতি 'সকল প্রাণী সমান' সংশোধন করা হয়। লেখা হয় 'সকল প্রাণীই সমান, কিন্তু কিছু প্রাণী অন্যদের চেয়ে বেশি সমান'। এই একটি বাক্যেই অরওয়েল সব যুগের, সব দেশের স্বৈরাচারের মূল মনস্তত্ত্বকে তুলে ধরেছেন। শাসকগোষ্ঠী কীভাবে আইনের ভাষা বদলে নিজেদের বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করে, কিভাবে ইতিহাস বিকৃতি এবং সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা ও ভয়কে পুঁজি করে শোষণের রাজত্ব কায়েম করে।

তাই বলাই যায়, অরওয়েল স্ট্যালিনের সময়ের প্রেক্ষাপটে কলম ধরেছিলেন ঠিকই, তবে তার আসল লক্ষ্য অন্য কিছু। তিনি ক্ষমতার মুখোশ উন্মোচন করতে চেয়েছেন। এভাবেও ব্যাখ্যা করা যায়, সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদ বা অন্য যেকোনো রাজনৈতিক ধারণাই হোক না কেন, যখন তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসে তখনই তারা হয়ে যায় নতুন শোষক শ্রেণী।

আজকের বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি লক্ষ্য করলে অরওয়েলের চিন্তার সত্যতা আরো পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। গণমাধ্যমের অপব্যবহার, সত্যের বিকৃতি, নাগরিকদের অধিকার হরণ এবং বিপ্লবের নামে নতুন স্বৈরাচারের আগমন, এ গুলোই প্রমাণ করে অ্যানিমেল ফার্ম ক্ষমতার নির্মম বাস্তবতার দলিল।

লেখক: হেমায়েত হোসেন, সহ-সম্পাদক (বণিক বার্তা)

আরও