মানুষের পরিচয় কি কেবল তার রক্তে বা ডিএনএ-তে লেখা থাকে, নাকি সে যে মাটিতে বড় হয়, সেই মাটির গন্ধ তার মনে মিশে থাকে? যুগ যুগ ধরে চলে আসা ‘প্রকৃতি বনাম পরিবেশ’ বিতর্কের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা এক চমকপ্রদ সত্যের মুখোমুখি হচ্ছেন। মানুষের বেড়ে ওঠার জায়গা বা সংস্কৃতি কেবল পোশাক বা ভাষাই ঠিক করে দেয় না, বরং এটি মস্তিষ্ককেও নতুন করে ‘রি-ওয়্যার’ বা স্নায়বিক বিন্যাস করে দেয়।
গবেষণা বলছে, মানুষের চিন্তা, আচরণ, মূল্যবোধ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন গড়ে ওঠে জিনগত বৈশিষ্ট্য ও পরিবেশের যৌথ প্রভাবে। তবে পরিবার, সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা ব্যক্তিত্ব নির্মাণে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশের মতো বৈচিত্র্যময় সামাজিক বাস্তবতায় এ প্রভাব আরো স্পষ্ট। শহর-গ্রাম, অঞ্চলভেদে সংস্কৃতি, জীবনযাত্রা ও সামাজিক কাঠামোর পার্থক্য মানুষের মানসিক গঠন ও আচরণে ভিন্নতা তৈরি করে। রাজধানীতে বড় হওয়া একজন তরুণ সাধারণত দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে অভ্যস্ত, প্রতিযোগিতায় স্বচ্ছন্দ। বিপরীতে প্রত্যন্ত অঞ্চলে যারা বড় হয় তারা বেশি সংযত। পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ককে তারা অগ্রাধিকার দেয়। দুজনেরই সমান মেধা থাকতে পারে, কিন্তু পরিবেশ তাদের ব্যক্তিত্বকে ভিন্নভাবে গড়ে তোলে।
জিন আর পরিবেশ: কোনটা কতটা দায়ী
দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন—মানুষ যেমন হয়, সেটা কি জন্মগত, না পরিবেশের ফল? আধুনিক গবেষণা বলছে ব্যক্তিত্ব দুটোরই মিশ্রণ। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন যমজভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ আসে জিন থেকে। বাকি অংশ গড়ে ওঠে পরিবার, শিক্ষা, সমাজ, সংস্কৃতি ও জীবনের অভিজ্ঞতার মতো পারিপার্শ্বিক পরিবেশ।
মানুষের বুদ্ধিমত্তা বা আইকিউ-এর ক্ষেত্রে বংশগতির প্রভাব বেশি হলেও, ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে পরিবেশের প্রভাব প্রায় ৬০ শতাংশ। আপনি কতটা মিশুক হবেন কিংবা কতটা নিয়মানুবর্তী হবেন, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে আপনি কোথায় বড় হয়েছেন তার ওপর। অর্থাৎ, জন্মের সময় আমরা কিছু প্রবণতা নিয়ে আসি, কিন্তু সেগুলো কীভাবে প্রকাশ পাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে আমরা কোথায় বড় হচ্ছি তার ওপর।
শহর-গ্রাম বিভাজন
শহর ও গ্রামের সামাজিক কাঠামোর পার্থক্য ব্যক্তিত্ব গঠনে স্পষ্ট প্রভাব ফেলে। গ্রামে বড় হওয়া মানুষ সাধারণত সমষ্টিকেন্দ্রিক—পরিবার, প্রতিবেশী ও আত্মীয়তার বন্ধন সেখানে বেশি শক্ত। ফলে সহযোগিতা, সহনশীলতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা ব্যক্তিত্বের অংশ হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে শহুরে জীবনে প্রতিযোগিতা বেশি, সময়ের চাপ তীব্র। এখানে বেড়ে ওঠা মানুষ তুলনামূলকভাবে বেশি আত্মনির্ভরশীল, লক্ষ্যভিত্তিক ও পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে সক্ষম হয়। এ বৈশিষ্ট্যগুলো কর্মজীবনে অনেক সময় সুবিধা এনে দেয়, আবার সম্পর্কের ক্ষেত্রে দূরত্বও তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের সমাজ মূলত পরিবারকেন্দ্রিক। এখানে ‘আমি’ থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ‘আমরা’। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, এ ধরনের সমাজে বড় হওয়া মানুষ নিজের পরিচয় তৈরি করে সম্পর্কের ভেতর দিয়ে। এর প্রভাব পড়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ধরনেও। অনেক বাংলাদেশী তরুণ ক্যারিয়ার বা বিয়ের মতো বড় সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় পরিবারকে অগ্রাধিকার দেন। এটি ব্যক্তিত্বে দায়িত্ববোধ তৈরি করলেও, কখনো কখনো ব্যক্তিগত ইচ্ছা প্রকাশে দ্বিধাও তৈরি করে। অন্যদিকে, পশ্চিমা দেশগুলোয় ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও স্বতন্ত্র সত্তাকে গুরুত্ব দেয়া হয়।
শিক্ষা ও ভাষার প্রভাব
কোন মাধ্যমে পড়াশোনা করা হয়েছে সেটিও ব্যক্তিত্বে প্রভাব ফেলে। ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষিত অনেক তরুণ আন্তর্জাতিক পরিসরে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন, আত্মপ্রকাশে তুলনামূলক সাবলীল হন। আবার বাংলা মাধ্যমে বড় হওয়া শিক্ষার্থীরা দেশীয় সংস্কৃতি ও আবেগের সঙ্গে বেশি সংযুক্ত থাকেন।
এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধরন অর্থাৎ সরকারি, বেসরকারি, মাদ্রাসা বা ইংরেজি মাধ্যম প্রত্যেকটি আলাদা মূল্যবোধ ও আচরণগত কাঠামো তৈরি করে। যা দীর্ঘমেয়াদে ব্যক্তিত্বে ছাপ ফেলে।
বদলানোর সুযোগ আছে কি?
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—ব্যক্তিত্ব বদলানোর সুযোগ আছে কি না? বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যক্তিত্ব স্থির কিছু নয়। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে, যেমন উচ্চশিক্ষা, চাকরি, বিদেশে বসবাস, বড় কোনো সংকট বা সাফল্যে মানুষের ভাবনা ও আচরণ বদলে যেতে পারে। কাজ বা পড়াশোনার জন্য যারা বিদেশে যান, তারা আগের চেয়ে বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। আবার একই সঙ্গে নিজের শিকড় নিয়েও বেশি সচেতন হন। অর্থাৎ নতুন পরিবেশ পুরনো ব্যক্তিত্বকে মুছে দেয় না, বরং তার ওপর নতুন স্তর যোগ করে।
আমরা কে—এ প্রশ্নের উত্তর এক লাইনে দেয়া যায় না। আমরা আমাদের জন্মসূত্রে পাওয়া বৈশিষ্ট্য, পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক কাঠামো ও জীবনের অভিজ্ঞতার সম্মিলিত ফল। তবে একথা নিশ্চিত—যেখানে আমরা বড় হই, সে জায়গার ছাপ আমাদের চিন্তা, আচরণ ও সিদ্ধান্তে গভীরভাবে রয়ে যায়। দ্রুত নগরায়ন, অভিবাসন ও বৈশ্বিক যোগাযোগের যুগে এ প্রভাব আরো জটিল হচ্ছে। বর্তমানে তরুণ প্রজন্ম একই সঙ্গে গ্রাম, শহর ও বৈশ্বিক সংস্কৃতির সংস্পর্শে বেড়ে ওঠছে—ফলে ব্যক্তিত্বও হচ্ছে বহুমাত্রিক।