কাফকার যেখানে শেষ সেখানেই শুরু ককরোচ জনতা পার্টির

গ্রেগর সামসা শেষ পর্যন্ত একা ছিল। তার পাশে কেউ দাঁড়ায়নি। কিন্তু ‘‌ককরোচ যুবক’ একা থাকতে চায় না। তারা নেটওয়ার্ক তৈরি করছে, সমমনা মানুষ খুঁজছে, নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছে। এখানেই কাফকার ট্র্যাজেডির সঙ্গে বর্তমানের বড় পার্থক্য। গ্রেগর ছিল নিঃসঙ্গ রূপান্তরের শিকার; আর এ নতুন প্রজন্ম নিজেদের সম্মিলিত রূপান্তরের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক ভাষা নির্মাণ করতে চাইছে

ফ্রানৎস কাফকার বিখ্যাত উপন্যাসিকা মেটামরফোসিস-এ গ্রেগর সামসা এক সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে, সে তেলাপোকায় রূপান্তরিত হয়েছে। এ রূপান্তর একদিকে ছিল বাস্তবিক, অন্যদিকে প্রতীকী। রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের চোখে মানুষের পোকাসদৃশ হয়ে ওঠার প্রতীক। গ্রেগর ধীরে ধীরে বুঝতে পারে, তার শ্রমের মূল্য ছিল, কিন্তু তার অস্তিত্বের কোনো মূল্য নেই। পরিবার তাকে ব্যবহার করেছে। প্রতিষ্ঠান তাকে নিঃশেষ করেছে। সমাজ তাকে পরিত্যাগ করেছে। শেষ পর্যন্ত সে নিঃসঙ্গ মৃত্যুবরণ করে।

ভারতে গ্রেগর সামসার মতো একইরকম বাস্তবতা নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘‌ককরোচ জনতা পার্টি’। গত সপ্তাহে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের এক বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এ পার্টির সূত্রপাত। একটি মামলার শুনানির সময় বেকার যুবকদের ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন তিনি। সেই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ‘ভারতীয় জনতা পার্টি’র (বিজেপি) নামের সঙ্গে মিলিয়ে প্যারোডি হিসেবে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) আত্মপ্রকাশ ঘটে। বিশ্বের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল দাবি করা বিজেপির ইনস্টাগ্রাম অনুসারী যেখানে ৯০ লাখের কম, সেখানে এক সপ্তাহের কম সময়ে সিজেপি প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ অনুসারী অর্জন করেছে।

প্রকৃতপক্ষে সিজেপি কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল নয়, বরং এটি অনলাইনভিত্তিক ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলন। এর সদস্যপদের রসাত্মক যোগ্যতার তালিকায় রয়েছে—বেকার, অলস, সার্বক্ষণিক অনলাইন উপস্থিতি এবং পেশাদারভাবে ক্ষোভ প্রকাশের ক্ষমতা।

ককরোচ পার্টির এ বাস্তবতায় গ্রেগর সামসার পরিস্থিতির সঙ্গে মিল রয়েছে। তবে কাফকা যে অবস্থায় গ্রেগর সামসা চরিত্রটির সমাপ্তি টেনেছেন ঠিক সে জায়গায় নতুনত্ব দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি। এখানে ‘‌ককরোচ’ হলো সেইসব যুবকের প্রতীক, যাদের রাষ্ট্র ও সমাজ দীর্ঘদিন অবহেলা করেছে, আর করপোরেট অর্থনীতি যাদের সস্তা শ্রমে পরিণত করেছে।

কাফকার গ্রেগরের সঙ্গে তাদের একটি বড় পার্থক্য আছে। ককরোচ যুবকরা নিপীড়নের কাছে আত্মসমর্পণ করে না। বরং নিপীড়নের অভিজ্ঞতা থেকেই প্রতিবাদের ভাষা তৈরি করে। গ্রেগর সামসা ছিল নিপীড়িত কিন্তু ককরোচ পার্টির সদস্যরা নিপীড়ন-বিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।

কাফকার গ্রেগর সামসা তার রূপান্তরের পর নিজের ভাষা হারিয়ে ফেলেছিল। সে কথা বলতে চাইত, কিন্তু পরিবারের কাছে তার ভাষা ছিল অস্পষ্ট শব্দ। ভারতের ‘‌ককরোচ যুবক’ও একই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যায়। তারা যখন বেকারত্ব, শিক্ষাব্যবস্থার বৈষম্য বা রাষ্ট্রীয় দমন নিয়ে কথা বলে, তখন অনেক সময় মূলধারার সমাজ তাদের ব্যঙ্গ করে। কিন্তু পার্থক্য হলো—এরা চুপ থাকে না

শিল্পীর তুলিতে আঁকা কাফকার গ্রেগর সামসা

ভারতের সাম্প্রতিক সামাজিক বাস্তবতায় ‘‌ককরোচ’ প্রতীকটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। শহরের বস্তি, ছোট শহরের বেকার তরুণ, কোচিং সেন্টারের হতাশ শিক্ষার্থী, অনিশ্চিত চাকরিতে থাকা ডেলিভারি কর্মী, কিংবা ধর্মীয় ও জাতিগত বৈষম্যের শিকার যুবক—সবাই যেন এ পরিচয়ের মধ্যে আশ্রয় খুঁজে পাচ্ছে। রাষ্ট্র ও মূলধারার রাজনীতি তাদের ‘‌সমস্যা’ হিসেবে দেখতে পারে, কিন্তু তারা নিজেদের ‘‌বেঁচে থাকা’র শক্তি হিসেবে দেখতে শিখছে।

কাফকার গ্রেগর সামসা তার রূপান্তরের পর নিজের ভাষা হারিয়ে ফেলেছিল। সে কথা বলতে চাইত, কিন্তু পরিবারের কাছে তার ভাষা ছিল অস্পষ্ট শব্দ। ভারতের ‘‌ককরোচ যুবক’ও একই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যায়। তারা যখন বেকারত্ব, শিক্ষাব্যবস্থার বৈষম্য বা রাষ্ট্রীয় দমন নিয়ে কথা বলে, তখন অনেক সময় মূলধারার সমাজ তাদের ব্যঙ্গ করে। কিন্তু পার্থক্য হলো—এরা চুপ থাকে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা এক ধরনের আন্দোলন দাঁড় করিয়েছে। প্রচার করেছে বিভিন্ন ধরেন গান, বিশেষ করে র‍্যাপ গান। এভাবে তারা নিজেদের ভাষা তৈরি করে নিচ্ছে। এটি কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল না হলেও, এর মধ্যে রয়েছে নিপীড়িত, বেকার শিক্ষার্থীদের ভাষা।

প্রকৃতপক্ষে সিজেপি কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল নয়, বরং এটি অনলাইনভিত্তিক ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলন। এর সদস্যপদের রসাত্মক যোগ্যতার তালিকায় রয়েছে—বেকার, অলস, সার্বক্ষণিক অনলাইন উপস্থিতি এবং পেশাদারভাবে ক্ষোভ প্রকাশের ক্ষমতা

ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গল্পে যে বিশাল মধ্যবিত্তের উত্থানের কথা বলা হয়, তার আড়ালে বিপুলসংখ্যক যুবকের অনিশ্চয়তা চাপা পড়ে গেছে। কোটি কোটি তরুণ প্রতিনিয়ত পরীক্ষার ফর্ম পূরণ করছে, চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত হয়তো সামান্য চুক্তিভিত্তিক কাজে যোগ দিচ্ছে। ফলে তাদের মধ্যে ক্ষোভ জমা হওয়াটা স্বাভাবিক।

কাফকার জগতে প্রতিষ্ঠান ছিল অদৃশ্য অথচ ভয়ংকর। সেখানে মানুষ বুঝতেই পারে না, কোন শক্তি তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। আধুনিক ভারতেও অনেক যুবকের অভিজ্ঞতা তেমন। অ্যালগরিদম, নজরদারি, করপোরেট সংস্কৃতি, ধর্মীয় মেরুকরণ ও রাজনৈতিক প্রচারণার মধ্যে তারা নিজেদের ক্রমাগত ভুক্তভোগী মনে করে। কিন্তু তারা একইসঙ্গে এটাও বুঝেছে যে, নিঃশব্দে মরে গেলে কেউ মনে রাখবে না। তাই তারা নিজেদের দৃশ্যমান করতে চায়—কখনো প্রতিবাদে, কখনো ব্যঙ্গের মাধ্যমে।

গ্রেগর সামসা শেষ পর্যন্ত একা ছিল। তার পাশে কেউ দাঁড়ায়নি। কিন্তু ‘‌ককরোচ যুবক’ একা থাকতে চায় না। তারা নেটওয়ার্ক তৈরি করছে, সমমনা মানুষ খুঁজছে, নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছে। এখানেই কাফকার ট্র্যাজেডির সঙ্গে বর্তমানের বড় পার্থক্য। গ্রেগর ছিল নিঃসঙ্গ রূপান্তরের শিকার; আর এ নতুন প্রজন্ম নিজেদের সম্মিলিত রূপান্তরের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক ভাষা নির্মাণ করতে চাইছে।

সম্ভবত এ কারণেই ‘‌ককরোচ জনতা পার্টি’ কেবল একটি ব্যঙ্গ নয়; এটি সময়ের এক গভীর সামাজিক সংকেত। এ প্রতীকের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো—এটি নিপীড়িতের আত্মপরিচয়কে পুনর্গঠন করছে।

আরও