নির্বাচনের দিনে খাওয়া সসেজ কীভাবে অস্ট্রেলিয়ার ভোটের প্রতীক হয়ে উঠল

রাজনীতিবিদদের এই সসেজ খাওয়ার ছবি প্রায়ই রাজনৈতিক রসিকতার খোরাক হয়—কে কতটা অদ্ভুত ভঙ্গিতে সসেজ খাচ্ছেন, তা নিয়ে তৈরি হয় মিম এবং লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে রাজনৈতিক গল্প।

শনিবার (৩ মে) ভোট কেন্দ্রে পৌঁছে অনেক অস্ট্রেলিয়ান তাদের নাগরিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মুখরোচক এক খাবারও উপভোগ করেছেন—‘ডেমোক্রেসি সসেজ’। গ্রিল্ড সসেজ ও পাউরুটির এ সমন্বয় অস্ট্রেলিয়ার সংস্কৃতিতে এমনই এক স্থানে পৌঁছে গেছে যে, কেউ কেউ একে কোয়ালার মতোই জাতীয় প্রতীক মনে করেন। এমনকি ভোট দেয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণও বলে মনে করেন অনেকে। খবর এপি।

সাদা পাউরুটির এক ফালির মধ্যে গ্রিল করা সসেজ, সঙ্গে চাইলে পেঁয়াজ ও কেচাপ—এই সাধারণ খাবারটি অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচনী সংস্কৃতিতে এক বিশিষ্ট স্থান দখল করে নিয়েছে। ভোটের দিনে এটি শুধুই একটি স্ন্যাক নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে নির্বাচন ও নাগরিক অংশগ্রহণের এক হাস্যরসাত্মক অথচ গর্বিত প্রতীক। ডেমোক্রেসি সসেজ নিয়ে তথ্য সরবরাহকারী একটি ওয়েবসাইটে মজা করে বলা হয়েছে, এটি অস্ট্রেলিয়ান সংবিধানের অংশ বললেই চলে।

তবে এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই। বরং দেশজুড়ে স্কুল ও কমিউনিটি গ্রুপগুলোর জন্য এটি বছরে সবচেয়ে লাভজনক অর্থ সংগ্রহের উৎস। নির্বাচনী কেন্দ্রগুলোর বাইরে স্থাপিত এসব খাবারের স্টল থেকে সংগৃহীত অর্থ নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা হয়।

অস্ট্রেলিয়ার প্রতিটি ভোটকেন্দ্রেই ডেমোক্রেসি সসেজ পরিবেশিত হয়। শুধু তাই নয়, বিদেশে অবস্থানরত নাগরিকদের জন্য বিভিন্ন দেশের অস্ট্রেলিয়ান দূতাবাসেও এই ঐতিহ্য বজায় থাকে—নিউ ইয়র্ক, রিয়াদ, নাইরোবি, টোকিও এমনকি অ্যান্টার্কটিকার একটি গবেষণা স্টেশনেও সসেজের গন্ধ পৌঁছেছে নির্বাচন উপলক্ষে।

২০১৩ সালে একদল বন্ধু মিলে তৈরি করেন ডেমোক্রেসিসসেজ ডট ওআরজি নামের একটি নিরপেক্ষ ও অরাজনৈতিক ওয়েবসাইট। তখন তারা ভোটকেন্দ্রে খাবার পাওয়া যাবে কিনা, তা নিয়ে বিভ্রান্ত ছিলেন। আজ সেই ওয়েবসাইটই ভোটারদের জানায়, কোন কেন্দ্রে কী ধরনের খাবার—গ্লুটেন ফ্রি, ভেগান, হালাল সসেজ বা এমনকি কেক-কফির ব্যবস্থাও আছে কিনা।

ওয়েবসাইটের মুখপাত্র অ্যালেক্স ডসন জানিয়েছেন, নির্বাচনের দিন তারা কিছু বন্ধুকে নিয়ে সব স্টল ও তথ্য পর্যবেক্ষণ করেন, কোন কেন্দ্রে সসেজ ফুরিয়ে গেছে বা নতুন স্টল বসেছে কিনা সে খবর রাখেন। আর দুপুরে তারা নিজেরাও ভোট দেন ও উপভোগ করেন তাদের প্রিয় ডেমোক্রেসি সসেজ।

২০২২ সালের নির্বাচনে প্রায় ৭,০০০ ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২,২০০টি কেন্দ্রে সসেজ বা অন্যান্য স্ন্যাক বিক্রি হয়েছে বলে জানান ডসন। এসব থেকে সংগৃহীত মুনাফার পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ১ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার (প্রায় ২ দশমিক ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার)।

ডেমোক্রেসি সসেজ শব্দটি কে প্রথম ব্যবহার করেছিলেন, তা নিশ্চিতভাবে কেউ জানে না। তবে প্রায় এক শতাব্দী ধরেই অস্ট্রেলিয়ার ভোটকেন্দ্রে খাবার বিক্রির রীতি আছে। ১৯২০-এর দশকের বেক সেল থেকে শুরু হয়ে ১৯৮০-এর দশকে পোর্টেবল বারবিকিউ আবিষ্কারের পর আসে সসেজ সিজল সংস্কৃতি।

অস্ট্রেলিয়ায় নির্বাচন সবসময় শনিবার হয় এবং এটি পারিবারিক অনুষ্ঠানের মতোই উদযাপিত হয়—লোকজন সন্তান ও পোষা প্রাণী নিয়ে কেন্দ্রে আসে। আবার ভোট দেয়া বাধ্যতামূলক হওয়ায় ৯০ শতাংশের বেশি উপস্থিতি নিশ্চিত হয়, যা খাবার বিক্রির জন্যও একটি অনন্য সুযোগ তৈরি করে।

২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ডিকশনারি সেন্টার ডেমোক্রেসি সসেজকে বর্ষসেরা শব্দ ঘোষণা করে।

রাজনীতিবিদদের এই সসেজ খাওয়ার ছবি প্রায়ই রাজনৈতিক রসিকতার খোরাক হয়—কে কতটা অদ্ভুত ভঙ্গিতে সসেজ খাচ্ছেন, তা নিয়ে তৈরি হয় মিম এবং লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে রাজনৈতিক গল্প।

প্রচার হচ্ছে যে, আগাম ভোট দেয়ার হার বেড়ে যাওয়ায় ডেমোক্রেসি সসেজের দিন হয়তো ফুরিয়ে আসছে। এবারের নির্বাচনে ৪ মিলিয়নেরও বেশি অস্ট্রেলিয়ান আগাম ভোট দিয়েছেন, যা রেকর্ড।

এই সংস্কৃতির ওপর একটি বই লেখা মেলবোর্নের লা ট্রোব বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক জুডিথ ব্রেট তবুও আশাবাদী। তার মতে, অনেকে আগাম ভোট দিয়ে শনিবার শুধু সসেজ খেতে কেন্দ্রে যান। এমনকি পর্যটক বা বিদেশী শিক্ষার্থীরাও নির্বাচনের দিনে শুধু এই সসেজ খাওয়ার অভিজ্ঞতা নিতে কেন্দ্রে যান।

আরও