শতবর্ষে নূরজাহান

কলকাতায় শিশুশিল্পী থেকে লাহোরের ‘মালিকা-এ-তারান্নুম’

অভিনয় থেকে সরে যাওয়ার পর নূরজাহানের সংগীতজীবন নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যায়। আগে তিনি মূলত নিজের অভিনীত চলচ্চিত্রে গান গাইতেন। এবার তার সামনে খুলে যায় আরো বড় পরিসর। আইজাজ গুলের বই অনুযায়ী, ওই সময় অন্য গায়করা একটি চলচ্চিত্রের গানের জন্য প্রায় ৩৫০ পাকিস্তানি রুপি পারিশ্রমিক পেতেন। সেখানে নূরজাহান পেতেন ২ হাজার রুপি—অর্থাৎ অন্যদের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ

নূরজাহান। গায়িকা, অভিনেত্রী, চলচ্চিত্র পরিচালক ও উদ্যোক্তা—নানা পরিচয়ের ভিড়ে কণ্ঠই তাকে অমর করে রেখেছে। ১৯২৬ সালে জন্ম নেয়া এই শিল্পীর জন্মশতবর্ষে আবারো সামনে আসছে তার দীর্ঘ ও বর্ণিল ক্যারিয়ারের গল্প। কলকাতায় শিশুশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রে যাত্রা তার। এর পর বোম্বেতে তারকা হয়ে ওঠা নূরজাহান ব্রিটিশ ইনডিয়া ভাগের পর পাকিস্তানে গিয়ে শুধু নিজেকে নতুন করে প্রতিষ্ঠা করেননি, বরং সেখানকার চলচ্চিত্রশিল্পের শুরুর দিনগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। সংগীতেও তিনি এমন এক অবস্থান তৈরি করেছিলেন, যেখানে তার পারিশ্রমিক সমসাময়িক অন্য গায়কদের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি ছিল। ভক্তদের কাছে তিনি ছিলেন ‘মালিকা-এ-তারান্নুম’—কণ্ঠের রানী।

নূরজাহানের জন্ম ১৯২৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর। ১৯৩০-এর দশকের গোড়ায় কলকাতায় শিশুশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রে ক্যারিয়ার শুরু করেন তিনি। ১৯৩৫ সালে কে ডি মেহরার ‘পিন্ড দি কুড়ি’ ছবিতে অভিনয় করেন। এরপর ‘মিসর কা সিতারা’ (১৯৩৬) ও ‘হীর-সিয়াল’ (১৯৩৭)-এ অভিনয় করেন। এসব ছবির মাধ্যমে শিশুশিল্পী হিসেবে তার পরিচিতি বাড়তে থাকে।

পরে লাহোরে গিয়ে সংগীত পরিচালক গোলাম হায়দারের সঙ্গে কাজের সুযোগ পান নূরজাহান। ১৯৪২ সালে বোম্বেতে ‘খানদান’ চলচ্চিত্রে প্রাপ্তবয়স্ক চরিত্রে নায়িকা হিসেবে অভিনয় করে বড় তারকা হয়ে ওঠেন তিনি। ছবিতে তার বিপরীতে ছিলেন প্রাণ। নূরজাহান শুধু অভিনয় করতেন না, নিজের গানও নিজেই গাইতেন। অভিনয় ও সংগীত—দুই ক্ষেত্রের এই দক্ষতা তাকে সে সময়ের অন্য অভিনেত্রীদের তুলনায় আলাদা করে তুলেছিল। সৌন্দর্য, অভিনয়ের আকর্ষণ ও কণ্ঠ—সব মিলিয়ে দ্রুতই তিনি হয়ে ওঠেন জনপ্রিয় তারকা।

‘খানদান’-এর পরিচালক শওকত হুসাইন রিজভির সঙ্গে তার সম্পর্কও শুরু হয় ওই সময়। প্রথম দিকে এই সম্পর্কের বিরোধিতা করেছিলেন প্রযোজক দালসুখ এম পাঞ্চোলি। আইজাজ গুলের লেখা ‘নূরজাহান: দ্য মেলোডি কুইন’ বই অনুযায়ী, রিজভির বিরুদ্ধে নূরজাহানকে অপহরণের অভিযোগে মামলা করেছিলেন তিনি। আদালতে নূরজাহান নিজেই হাজির হয়ে অভিযোগটি নাকচ করেন। পরে পরিবারের বিরোধিতা সত্ত্বেও রিজভিকে বিয়ে করেন তিনি।

‘খানদান’-এর সাফল্যের পর বোম্বের চলচ্চিত্রে নূরজাহানের ব্যস্ততা আরো বাড়ে। দিলীপ কুমার অভিনীত ‘জুগনু’সহ একাধিক ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। ‘জুগনু’ ছিল তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবিগুলোর একটি এবং ছবিটি দিলীপ কুমারের ক্যারিয়ারেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত ভাগের পর নূরজাহানের জীবনের মোড় ঘুরে যায়। স্বামী শওকত হুসাইন রিজভির সঙ্গে তিনি পাকিস্তানে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের চলচ্চিত্রশিল্প তখন একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে। লাহোরের পুরোনো চলচ্চিত্র অবকাঠামোর বড় অংশ দেশভাগের অস্থিরতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। নূরজাহান ও রিজভি লাহোরে পুরোনো শোরি স্টুডিওর ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর ওপর নতুন করে ‘শাহনূর স্টুডিও’ গড়ে তোলেন। স্টুডিওটি ১৯৫০ সালে চালু হয়।

এর পরের বছরই, ১৯৫১ সালে আসে ‘চান ওয়ে’। এতে অভিনয়ের পাশাপাশি নূরজাহান পরিচালক হিসেবেও ক্রেডিট পান। ছবিটি পাকিস্তানের প্রথম নারী পরিচালিত চলচ্চিত্র হিসেবে ইতিহাসে পরিচিত এবং নূরজাহানকে পাকিস্তানের প্রথম নারী চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। তবে পাকিস্তানের সরকারি একটি প্রকাশনায় বলা হয়েছে, রিজভি তাকে পরিচালক হিসেবে ক্রেডিট দিয়েছিলেন এবং নিজে ‘সুপারভাইজিং ডিরেক্টর’ ছিলেন।

নূরজাহানের জীবন শুধু চলচ্চিত্র ও সংগীতের গল্প নয়। নিজের আর্থিক স্বাধীনতার বিষয়েও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। ততদিনে তিনি তিন সন্তানের মা। একইসঙ্গে স্টুডিও পরিচালনা, চলচ্চিত্র নির্মাণ, অভিনয় ও গান—সবকিছু সামলাচ্ছিলেন। নিজের বাড়ি নিজের নামে রাখার পাশাপাশি স্বামীর সঙ্গে গড়ে তোলা স্টুডিওরও সহ-মালিক ছিলেন তিনি।

প্রথম সংসার ভেঙে যাওয়ার পর ১৯৫৯ সালে অভিনেতা এজাজ দুররানিকে বিয়ে করেন নূরজাহান। এই সংসারে তার আরও তিন কন্যা জন্ম নেয়। ফলে তার মোট সন্তান ছিল ছয়জন। এজাজের ইচ্ছায় তিনি চলচ্চিত্রে অভিনয় ছেড়ে দেন। ১৯৬১ সালের পর অভিনয় থেকে সরে গিয়ে সংগীতেই মন দেন।

অভিনয় থেকে সরে যাওয়ার পর নূরজাহানের সংগীতজীবন নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যায়। আগে তিনি মূলত নিজের অভিনীত চলচ্চিত্রে গান গাইতেন। এবার তার সামনে খুলে যায় আরো বড় পরিসর। আইজাজ গুলের বই অনুযায়ী, ওই সময় অন্য গায়করা একটি চলচ্চিত্রের গানের জন্য প্রায় ৩৫০ পাকিস্তানি রুপি পারিশ্রমিক পেতেন। সেখানে নূরজাহান পেতেন ২ হাজার রুপি—অর্থাৎ অন্যদের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ।

উর্দু ও পাঞ্জাবি গান দিয়ে নূরজাহান এরপর পাকিস্তানের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পরিচিতি পান। ‘সানু নেহর ভালে পুল’ কিংবা ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের লেখা ‘মুঝসে পেহলি সি মহব্বত’ তার কণ্ঠের জনপ্রিয়তার দীর্ঘস্থায়ী উদাহরণ হয়ে আছে।

নূরজাহানের দৃঢ় ব্যক্তিত্বের একটি ঘটনা তার মেয়েরা পরে স্মরণ করেছেন। একবার এক চলচ্চিত্র প্রযোজক তার রেকর্ডিং স্টুডিওতে ঢুকে তাকে গান গাইতে বলেন। ওই ছবিতে তিনি অর্থ বিনিয়োগ করেছেন—এই যুক্তিতে প্রযোজক এমন দাবি করেছিলেন। নূরজাহান উঠে গিয়ে তার কান ধরে তাকে স্টুডিও থেকে বের করে দেন। উপস্থিত সবাই বিস্মিত হয়ে ঘটনাটি দেখেছিলেন।

মেয়েরা পরে বলেছিলেন, তাদের মা সেই সময়ের চলচ্চিত্রশিল্পে টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত সাহসী ছিলেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নূরজাহান মর্যাদা ধরে রেখে কাজ করেছেন এবং নিশ্চিত করেছেন যে মানুষ তাকে সম্মান করে।

ব্যক্তিজীবনের টানাপোড়েনের মধ্যেও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি ছিলেন সচেতন। দ্বিতীয় সংসারে সমস্যা চলার সময় তিন মেয়েকে বোর্ডিং স্কুলে পাঠিয়েছিলেন। সন্তানদের দূরে রাখলেও তাদের প্রতি ভালোবাসায় কোনো ঘাটতি ছিল না। মেয়েদের জন্য আম পাঠানোর সময় পুরো স্কুলের জন্যও যথেষ্ট আম পাঠাতেন তিনি।

১৯৭০-এর দশকে তিনি প্রতিটি সন্তানকে মাসে ৩৫ হাজার পাকিস্তানি রুপি করে হাতখরচ দিতেন বলে আইজাজ গুলের বইয়ে উল্লেখ রয়েছে। নিজের আর্থিক অবস্থান সম্পর্কে সচেতন নূরজাহান জীবনের শেষ দিকেও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করেছিলেন। মৃত্যুর পর সম্পত্তি নিয়ে তাঁদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কায় বেশির ভাগ সম্পদ বিক্রি করে অর্থ সন্তানদের মধ্যে ভাগ করে দেন।

এজাজ দুররানির সঙ্গে তার দ্বিতীয় বিয়েও একসময় ভেঙে যায়। এরপর আর বিয়ে করেননি নূরজাহান। জীবনের শেষ বছরগুলো সন্তানদের নিয়েই কাটান। শেষ ছয় বছর পাকিস্তান, লন্ডন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন হাসপাতালে যাওয়া-আসার মধ্যে কাটে তার। সন্তানরা তখনও তার পাশে ছিলেন।

দেশভাগের পর ১৯৮২ সালে একবার ভারতে গিয়েছিলেন নূরজাহান। সেটিই ছিল স্বাধীন ভারতে তার একমাত্র সফর। সেখানে পুরোনো সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা করেন এবং সংগীত ও চলচ্চিত্র অঙ্গনের মানুষের কাছ থেকে উষ্ণ অভ্যর্থনা পান।

১৯৯৬ সালে শেষবারের মতো রেকর্ডিং করেন নূরজাহান। ২০০০ সালের ২৩ ডিসেম্বর ৭৪ বছর বয়সে মারা যান তিনি। তার মৃত্যুর সঙ্গে কণ্ঠ থেমে গেলেও গান থামেনি। কয়েক দশক পরও দক্ষিণ এশিয়ার ঘরে ঘরে বাজে নূরজাহানের গান।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে

আরও