তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্য পড়লে মনে হয়, মানুষকে তিনি দূর থেকে দেখেননি কখনো। তার চরিত্রগুলোর ক্ষুধা আছে, অপমান আছে, লোভ আছে, শরীর আছে, বিশ্বাস আছে, আবার গভীর কোনো অদৃশ্য বেদনার কাছে নত হয়ে যাওয়ার মুহূর্তও আছে। সেই মানুষকে এত কাছ থেকে দেখার ক্ষমতা হয়তো শুধু সাহিত্যিক কল্পনা থেকে আসেনি। নিজের জীবনও তারাশঙ্করকে বারবার মানুষের দুঃখের সামনে দাঁড় করিয়েছে। কোনো কোনো আঘাত তাকে বিদ্রোহী করেছে, কোনোটি কলমকে শোকের ভাষা দিয়েছে, কোনোটি আবার মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে জীবনের অর্থ খুঁজতে বাধ্য করেছে। এক শিশুর চোখে দেখা বাবার অপমান থেকে তার জীবনের সেইসব মুহূর্তের শুরু হয়েছিল।
১৯১০ সাল। তারাশঙ্কর তখন কিশোর। বীরভূমের লাভপুরের ক্ষয়িষ্ণু জমিদার পরিবারের সন্তান তিনি। একদিন স্থানীয় এক ধনী জমিদারের রাজকর্মচারীর হাতে তার বাবা হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায় তিরস্কৃত হলেন। ঘটনাটি হয়তো বাইরে থেকে দেখলে সামান্য, একজন প্রভাবশালী মানুষের ধমক, একজন অপেক্ষাকৃত অসহায় মানুষের অপমান। কিন্তু সন্তানের চোখে বাবাকে অপমানিত হতে দেখা সামান্য ঘটনা নয়। হরিদাস সেই অপমান বয়ে দেওঘরে গিয়ে কেঁদেছিলেন। আর সেই কান্না দেখেছিলেন ছেলে তারাশঙ্কর।
পরে ছেলে সনৎকুমার বন্দোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণ এবং তারাশঙ্করের জীবনকথা থেকে জানা যায়, এই ঘটনার অভিঘাত তার মনে গভীরভাবে বসে গিয়েছিল। বাবার চোখের জল তার ভেতরে অন্য এক বোধের জন্ম দেয়— যেখানে ছিল ক্ষমতার সামনে মাথা নোয়ানো মানুষের প্রতি ক্ষোভ, আর ক্ষমতাবানের বিরুদ্ধে এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন। তারাশঙ্করের নিজের ভাষ্যেও এই সময়ের অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরবর্তী বিদ্রোহী মানসিকতার একটি যোগসূত্রের কথা পাওয়া যায়।
সেদিন হয়তো জানতেন না, বাবার সেই অপমান একদিন তার সাহিত্যের অসংখ্য মানুষের মুখে ফিরে আসবে। যে কৃষক খাজনা দিতে না পেরে অপমানিত হয়, যে নিম্নবর্গের মানুষ সামাজিক মর্যাদার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে, যে দুর্বল মানুষ ক্ষমতাবানের সামনে নিজের কণ্ঠ হারিয়ে ফেলে, তাদের প্রত্যেকের মধ্যে কোথাও যেন সেই কিশোর তারাশঙ্করের দেখা হরিদাসের ছায়া রয়ে গেল। তারাশঙ্করের বিদ্রোহ তাই কেবল রাজনৈতিক ছিল না। তার শিকড়ের কাছে ছিল এক শিশুর অসহায় ক্রোধ, বাবাকে কাঁদতে দেখার ক্রোধ।
তারপর জীবনে এল এমন এক আঘাত, যার সামনে কোনো বিদ্রোহই যথেষ্ট নয়। ১৯৩২ সাল। তারাশঙ্করের সংসারে তখন এক ছোট্ট মেয়ে, সন্ধ্যা, ডাকনাম বুলু। মেয়েটির প্রতি তার টান ছিল একটু যেন বেশি। পরিবারের স্মৃতিতে বুলু বাবার অত্যন্ত আদরের সন্তান। একদিন কোনো এক আত্মীয় মেয়েটির গায়ের রং নিয়ে তাকে অপমান করেছিলেন। শিশুটি কাঁদতে কাঁদতে আশ্রয় নিয়েছিল বাবার কোলে। তার ভাই সরিতের স্মৃতিতে সংরক্ষিত সেই মুহূর্তটি আজও হৃদয়কে কাঁপিয়ে দেয়-বুলু নাকি বাবাকে বলেছিল, ‘বাবা, তুমি কালো আর আমি কালো এই বাড়িতে, আর সবাই ফর্সা।’ একটি শিশুর কাছে পৃথিবী তখন এতটুকুই। বাবার কোলে আশ্রয়, নিজের গায়ের রং নিয়ে অন্যের কটু কথা, আর বাবার সঙ্গে নিজের এক অদ্ভুত মিল। কিন্তু সেই কোলে বেশিদিন থাকা হলো না।
মাত্র ছয় বছর বয়সে বুলু ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হলো। তখন তারাশঙ্কর নিজেও আর্থিক সংকটে ছিলেন। মেয়েকে বাঁচানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা করতেও তাকে ছুটতে হয়েছিল; শেষ পর্যন্ত সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। হেমন্তের এক রাতে ছোট্ট মেয়েটি মারা গেল। একজন লেখকের কাছে মৃত্যু নিয়ে লেখা আর একজন বাবার কাছে নিজের সন্তানের মৃত্যু, দুটি সম্পূর্ণ আলাদা অভিজ্ঞতা। প্রথমটি চিন্তার, দ্বিতীয়টি অস্তিত্বের।
বুলুর মৃত্যুর পর তারাশঙ্কর যে কথাটি বলেছিলেন, সেটিই হয়তো এই শোকের সবচেয়ে গভীর ভাষা— ‘এ রাত্রি কোনোকালে শেষ হবে না।’ শোক তখন তার কাছে রাত হয়ে উঠেছিল। এমন রাত, যার কোনো ভোর নেই।
ওই সময়ের সঙ্গে তার সাহিত্যকে আলাদা করে দেখা কঠিন। পরবর্তী সময়ে তার লেখায় মৃত্যু বারবার ফিরে এসেছে, কখনো শরীরের মৃত্যু হিসেবে, কখনো বিশ্বাসের মৃত্যু, কখনো একটি যুগের মৃত্যু হিসেবে। ‘সন্ধ্যামণি’র মতো রচনার সঙ্গে তার ব্যক্তিগত শোকের যোগের কথা জীবনীমূলক আলোচনায় এসেছে। তার নিজের জীবনেও এই সময় মৃত্যু নিছক একটি দার্শনিক বিষয় ছিল না, তা হয়ে উঠেছিল ঘরের ভেতরের বাস্তবতা।
বুলুর মৃত্যুর পর তারাশঙ্করের ভেতরে যে আধ্যাত্মিক সংকট তৈরি হয়েছিল, সেটিও ছিল গভীর। জীবনের অর্থ খুঁজতে তিনি দীক্ষা নিতে চেয়েছিলেন, এমনকি সন্ন্যাস নেয়ার কথাও ভেবেছিলেন। একসময় বাড়ি ছেড়েও বেরিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু মৃত্যু যেন তাকে ছাড়েনি। এক সন্তানের মৃত্যু মানুষকে যে প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়, আরেক সন্তানের মৃত্যু সেই প্রশ্নকে আরো গভীর করে দিতে পারে। তারাশঙ্করের জীবনেও তেমনই আরেকটি শোক এসেছিল— শিশুপুত্রের মৃত্যু।
শিশুটির সৎকার করে সদ্য ফিরেছেন তারাশঙ্কর। ঘরে তখনো মৃত্যুর ভার। এমন সময় খবর এল, কাজী নজরুল ইসলামসহ দুজন অতিথি তাকে দেখতে আসছেন। একজন বাবা তখন কী করতে পারেন? তারাশঙ্কর পরিবারকে বললেন, শিশুটির মৃত্যুর কথা যেন অতিথিদের জানানো না হয়। নজরুল এলেন। বাড়িতে কথাবার্তা হলো, হইচই হলো। বাইরে থেকে হয়তো বোঝার উপায় ছিল না যে, কিছুক্ষণ আগেই এই বাড়ির একটি শিশুর শেষকৃত্য হয়েছে। তারাশঙ্কর নিজের ব্যক্তিগত শোককে যেন অতিথির আনন্দের পথে দাঁড়াতে দিতে চাননি। দুঃখটুকু নিজের ভিতরেই আটকে রাখলেন। কিন্তু শোকের গন্ধ লুকিয়ে রাখা যায় না।
ফেরার সময় নজরুল জানতে পারলেন শিশুটির মৃত্যুর কথা। ট্রেনে উঠে তিনি যে কথাগুলো বলেছিলেন, সেগুলো তারাশঙ্করের চরিত্রের এক বিরল সাক্ষ্য হয়ে আছে। স্মৃতিচারণে নজরুলের উক্তি এসেছে, তিনি বলেছিলেন, ‘ভারতবর্ষের একজন খাঁটি মানুষকে দেখে গেলাম।’ তারপর ভারতবর্ষকে তারাশঙ্করের কাছে প্রণাম জানানোর কথাও তিনি বলেছিলেন। এক ঘটনায় হৃদয়ের সৌন্দর্য বিনিময় করলেন তারাশঙ্কর ও নজরুল। একজন নিজের সন্তানের মৃত্যু গোপন করেছিলেন অতিথিকে অস্বস্তি থেকে বাঁচাতে। অন্যজন বিদায় নেয়ার পর সেই গোপন শোক জানতে পেরে বন্ধুর মানবিকতার সামনে নত হয়েছিলেন।
কিন্তু তারাশঙ্করের কাছে এইসব ঘটনা কেবল ব্যক্তিগত স্মৃতি হয়ে থাকেনি। তার সাহিত্য বারবার ফিরে গেছে সেই জায়গায়, যেখানে মানুষের সমস্ত অহংকার, সামাজিক পরিচয়, অর্থ, ক্ষমতা, ধর্মীয় বিশ্বাস-সবকিছুর শেষ সীমায় দাঁড়িয়ে থাকে মৃত্যু। তার জীবনে তাই বিদ্রোহ ও মৃত্যুচেতনা আলাদা দুটি নদী নয়। তারা একই স্রোতের দুই দিক। বাবার অপমান তাকে শিখিয়েছিল, মানুষকে ছোট করার ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়। মেয়ের মৃত্যু তাকে শিখিয়েছিল, কিছু শোকের কোনো ভাষা নেই, তবু সেই নীরবতাই একদিন সাহিত্যের ভাষা হয়ে উঠতে পারে। আর শিশুপুত্রের মৃত্যুর দিন তিনি শিখেছিলেন, নিজের বুকের ভেতর পৃথিবী ভেঙে পড়লেও অন্যের সামনে মানুষ হয়ে থাকার দায়িত্ব শেষ হয় না।
এই তিনটি মুহূর্তের দিকে ফিরে তাকালে তারাশঙ্করের সাহিত্যকে নতুনভাবে পড়া যায়। তার চরিত্ররা তখন আর কেবল বীরভূমের মাটি থেকে উঠে আসা মানুষ বলে মনে হয় না। তারা যেন লেখকের নিজের জীবনের নানা ক্ষত থেকে জন্ম নেয়া মানুষ। সম্ভবত এ কারণেই তার সাহিত্য এত গভীরভাবে মানুষের পাশে দাঁড়ায়।