সবচেয়ে বড় ঝুঁকি বা সাফল্য

‘টক্সিক’ ইচ্ছাকৃতভাবে ‘খারাপ’ সিনেমার মুখোশ পরে থাকে

রজার এবার্টের ভাষায় সিনেমাকে তার নিজের শর্তে বিচার করা জরুরি। কিন্তু রিচার্ড ব্রডির পাল্টা প্রশ্নটিও একইভাবে জরুরি—একটি খারাপ ধারণাকে দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করলেই কি সেটি প্রশংসার যোগ্য হয়ে যায়? ‘টক্সিক’ এ দুই প্রশ্নের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। সিনেমাটি হয়তো সবসময় ভালোভাবে তার বক্তব্যে পৌঁছাতে পারে না। কিন্তু পুরুষের গল্প বলতে বলতে শেষ পর্যন্ত যে প্রশ্নটি তোলে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ: যে পুরুষতন্ত্রকে সিনেমা এত দিন রোমান্টিক করেছে, তার পরিণতি নিয়ে কথা বলার সময় কি আসেনি?

সিনেমা কীভাবে বিচার করা উচিত—এ নিয়ে কিংবদন্তি চলচ্চিত্র সমালোচক রজার এবার্টের বহুল উদ্ধৃত ধারণা আছে। তার মতে, সিনেমাটি আসলে কী হতে চেয়েছে এবং পরিচালক সেই উদ্দেশ্য কতটা সফলভাবে পর্দায় তুলে ধরতে পেরেছেন, তার ভিত্তিতে বিচার করতে হবে। ধারণাটি এখন প্রায়ই সন্দীপ রেড্ডি ভাঙ্গার ‘অ্যানিমেল’ ও ‘কবির সিং’-এর মতো সিনেমার পক্ষে যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এসব সিনেমার সমালোচনার জবাবে অনেকে বলেন, ‘সিনেমাকে তার নিজের শর্তে দেখুন।’ নায়ক যদি বিষাক্ত, সহিংস বা নারীবিদ্বেষী হয়, সেটি তো সিনেমারই গল্প; তাই তাকে নৈতিকতার মাপকাঠিতে বিচার করার দরকার নেই।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোনো পরিচালক কোনো সমস্যাজনক ধারণাকে খুব দক্ষতার সঙ্গে পর্দায় তুলে ধরলেই কি তা সমালোচনার ঊর্ধ্বে চলে যায়? এবার্টের বক্তব্যের প্রসঙ্গে দ্য নিউ ইয়ার্কারের সমালোচক রিচার্ড ব্রডি মনে করিয়ে দিয়েছেন, একটি খারাপ ধারণাকে দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করলেই সেটি প্রশংসার যোগ্য হয়ে যায় না। অর্থাৎ, পরিচালকের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা যেমন জরুরি, তেমনি সেই দৃষ্টিভঙ্গি কী বলছে এবং তার সামাজিক প্রভাব—সেটিও সমালোচনার অংশ।

এ বিতর্কের মধ্যেই আসে গীতু মোহানদাস পরিচালিত ও যশ অভিনীত প্যান-ইন্ডিয়ান সিনেমা ‘টক্সিক’। ভারতের অন্যতম বড় তারকাকে নিয়ে একজন নারী পরিচালক সিনেমাটি বানিয়েছেন। যার নামও কৌতূহল জাগানোর মতো—’টক্সিক’। প্রচারণাও সেই কৌতূহল আরো বাড়ে। একটি টিজারে দেখা যায়, চলন্ত গাড়িতে উন্মত্ত যৌনতা, এর পর কবরস্থানে বিস্ফোরণের দৃশ্য। মনে হচ্ছিল, প্রচলিত পুরুষালি সিনেমার পরিচিত ভাষাই এখানে ব্যবহার করা হবে।

সিনেমার ট্যাগলাইন ‘আ ফেয়ারিটেইল ফর গ্রোন-আপস’। এটা অবশ্য ইঙ্গিত দিচ্ছিল, হয়তো কোনো সতর্কবার্তা লুকিয়ে আছে। প্রশ্ন ছিল, সেই ভিন্নতা আসবে কীভাবে এবং তার জন্য দর্শককে কতটা মূল্য দিতে হবে?

১৯৪ মিনিটের বড় একটি অংশ দেখে প্রথমে অবশ্য মনে হয়, ‘টক্সিক’ প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক অ্যাকশন সিনেমারই আরেকটি সংস্করণ। ধূমপায়ী, যৌনতা-নির্ভর, রক্তাক্ত গ্যাংস্টার রায়ার গল্প। পটভূমি স্বাধীনতার পরের গোয়া, যদিও সিনেমার গোয়া অনেকটা জ্যাক স্নাইডারের কল্পনার ভারতের মতো।

রায়া সবসময় সিগারেট হাতে ঘোরে। ধীরগতিতে হাঁটে, ধীরগতিতে কথা বলে, ধীরগতিতে পর্দায় প্রবেশ করে। গুলি চালানোর সময়ও তার হাতে সিগারেট। তার সংলাপ—‘ভায়োলেন্স ইজ মাই ল্যাংগুয়েজ, ইটস ইউনিভার্সাল’ চরিত্রটির মানসিকতা স্পষ্ট করে।

সিনেমার একের পর এক দৃশ্য এতটাই অতিরঞ্জিত যে অনেক সময় মনে হয়, এটি যেন কনডমের বিজ্ঞাপন, দামি সিগারেট বা মদের বিজ্ঞাপন, ভিএফএক্সের প্রদর্শনী, বন্দুকের পক্ষে অদ্ভুত এক প্রচারণা কিংবা ট্যারান্টিনো ও ওং কার-ওয়াইয়ের সিনেমার প্রতি ব্যয়বহুল শ্রদ্ধার্ঘ্য। এমনকি একপর্যায়ে একদল সাদা পোশাকের সন্ন্যাসিনী রায়ার রেস্তোরাঁয় হামলা করে; পরে দেখা যায়, তারা আসলে ল্যাটেক্স পোশাক পরা নিনজা। সব মিলিয়ে সিনেমার ভাষা এতটাই বাড়াবাড়ি রকমের যে ‘টক্সিক’ অনেক সময় নিজেরই ব্যঙ্গচিত্র বলে মনে হয়। যেন সিনেমাটি নিজেই বলছে—‘আমাকে আমি যা, তা হিসেবেই বিচার করো।’

রায়ার জীবনে থাকা নারীরাও তার ব্যক্তিত্বের ভিন্ন ভিন্ন দিক সামনে আনে। রায়াকে প্রায় দেবতার মতো দেখে বোন গঙ্গা (নায়নতারা)। সে চায় রায়া তাদের শৈশবের প্রতিশোধ নিক এবং গোয়ার ক্ষমতা দখল করুক। প্রয়োজনে সে যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত।

রেবেকা (তারা সুতারিয়া) বসের মেয়ে ও প্রেমিকা। সে রায়ার উন্মত্ত জীবনের অংশ হতে চায়। নাদিয়া (কিয়ারা আদভানি) আত্মার সঙ্গী হিসেবে হাজির হয়। সে রায়াকে ভালোবাসে এবং বদলে দিতে চায়। রায়া যখন তাকে অপমান করে, তখন নাদিয়া তাকে চড় মারে। রায়া জানতে চায়, সে কি তাকে খারাপ মানুষ মনে করে। নাদিয়ার উত্তর, ‘তুমি শুধু টক্সিক।’ আর রুক্মিণী বসন্ত অভিনীত মেলিসা হলো রায়ার সন্তানের মা। সে রায়ার আত্মধ্বংসী জীবন দেখে তার মধ্যে কিছুটা বোধ ফেরানোর চেষ্টা করে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই নারীরা কি সত্যিই নিজেদের গল্পের চরিত্র? নাকি তারা কেবল রায়ার গল্পকে এগিয়ে নেয়ার উপকরণ? সমালোচকের চোখে, সিনেমার বড় একটি অংশে দ্বিতীয়টিই সত্যি। প্রত্যেক নারীই রায়াকে ঘিরে আবর্তিত হয়। তার প্রতি আকৃষ্ট হয়, তাকে বদলাতে চায় অথবা তার ক্ষমতার অংশ হয়ে ওঠে। তাদের অস্তিত্বও শেষ পর্যন্ত রায়াকে আরো বড় করে তোলার কাজে ব্যবহৃত হয়।

এখানেই ‘টক্সিক’-এর সঙ্গে ‘অ্যানিমেল’ ও ‘কবির সিং’-এর সম্পর্কটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই সিনেমাগুলোর পুরুষরা সহিংস, অধিকারবোধে ভরা ও আত্মধ্বংসী; কিন্তু তাদের সেই বৈশিষ্ট্যগুলোকে অত্যন্ত স্টাইলিশ ও আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করা হয়। ‘টক্সিক’ও দীর্ঘ সময় একই কাজ করে।

এমনকি সিনেমার দ্বিতীয়ার্ধে রায়ার গল্প ক্রমে এক ধরনের ‘অ্যানিমেল’-এর ফ্যান-ফিকশনের মতো হয়ে ওঠে। একজন উন্মাদ ছেলে (দুই চরিত্রেই যশ) তার ছেড়ে যাওয়া বাবাকে খুঁজতে বের হয়। পারিবারিক ক্ষত, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা সহিংসতা এবং বিষাক্ত পুরুষত্ব থেকে একের পর এক অ্যাকশন দৃশ্য তৈরি হয়। সিনেমাটি এখানে আত্মসচেতন, কিন্তু একজন আত্মসচেতন সিরিয়াল কিলারও শেষ পর্যন্ত সিরিয়াল কিলারই থাকে। তারপর আসে সেই বড় মোড়।

ক্লাইম্যাক্সের মোড়টি এত দেরিতে আসে যে দর্শক প্রায় ভুলেই যেতে পারেন, সিনেমাটি হয়তো অন্য কিছু বলার চেষ্টা করছে। কিন্তু ঠিক এখানেই গীতু মোহানদাসের আসল পরিকল্পনা স্পষ্ট হয়।

পুরো সিনেমাজুড়ে পুরুষতান্ত্রিক ভাষা, সহিংসতা, যৌনতা, ‘মেল গেজ’ এবং অতিরঞ্জিত নায়কোচিত ভঙ্গি ব্যবহার হয়েছে, শেষ পর্যন্ত সেটিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো হয়। এটি অনেকটা ‘ট্রোজান হর্স’-এর মতো। বাইরে থেকে সিনেমাটি প্রচলিত পুরুষালি বিনোদন, আর ভেতরে লুকিয়ে আছে সেই সংস্কৃতির সমালোচনা। এখানে সিনেমা এমন একটি জিনিস দেখাতে চায়, যা ‘অ্যানিমেল’ বা ‘কবির সিং’-এর মতো সিনেমায় অনুপস্থিত বলে সমালোচক মনে করেন। তা হলো পরিণতি।

রায়ার সহিংসতা, ক্ষমতার লোভ ও বিষাক্ত পুরুষত্ব শেষ পর্যন্ত তাকে রক্ষা করে না। তার কর্মকাণ্ডের মূল্য তাকে দিতেই হয়। অর্থাৎ, সিনেমা তাকে ‘ত্রুটিপূর্ণ কিন্তু আকর্ষণীয় নায়ক’ হিসেবে শেষ পর্যন্ত ক্ষমা করে না। বরং দেখায়, যে বিষাক্ত পুরুষত্বকে এতক্ষণ শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত ধ্বংস ডেকে আনে।

রায়ার পরিণতিও অবশ্য প্রচলিত ফর্মুলা সিনেমার ভাষায় আসে। তুষারে ঢাকা এক অদ্ভুত দৃশ্যপট, অসংখ্য গুলি, উন্মাদনা ও বিশাল অ্যাকশন। এখানেই ‘টক্সিক’-এর সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব। সিনেমাটি যে ভাষাকে সমালোচনা করছে, সেই ভাষা ছাড়তে পারছে না।

এটাই ‘ট্রোজান হর্স’ পদ্ধতির ঝুঁকি। দর্শককে বার্তা দেয়ার জন্য প্রথমে তাদের পছন্দের জগতে ঢুকতে হয়। কিন্তু সেই ছদ্মবেশ এত শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে যে ছদ্মবেশটাই শেষ পর্যন্ত সিনেমা হয়ে যায়।

সম্ভবত এ কারণেই ‘টক্সিক’ এতটা অস্বস্তিকর। সিনেমাটি দর্শককে দীর্ঘ সময় ধরে এমন কিছু দেখতে বাধ্য করে, যার সমালোচনা সে শেষ পর্যন্ত করতে চায়। এটি অনেকটা একজন সিরিয়াল কিলারকে দীর্ঘ সময় অনুসরণ করার পর জানতে পারার মতো যে সে আসলে নিজেকে ন্যায়রক্ষক মনে করে। মুখোশটি প্রয়োজনীয়, কিন্তু সেই মুখোশই যদি দর্শকের কাছে আসল মুখ হয়ে ওঠে?

হয়তো আমরা এমন এক সময়ে পৌঁছেছি, যখন প্রচলিত ফর্মুলার সঙ্গে আপস করাই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিবাদের উপায়। যে সংস্কৃতি নারীবিদ্বেষকে রোমান্টিক করে, তার সমালোচনা করতে হলে প্রথমে সেই সংস্কৃতির হাতেই হাত রাখতে হয়। দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে গিয়ে তাই ‘টক্সিক’ কখনো কখনো প্রয়োজনের চেয়েও বেশি দূর চলে যায়।

ফলে প্রশ্ন থেকে যায়—সাধারণ দর্শকের কাছে কি সিনেমাটি অতিরিক্ত কিছু দাবি করছে? সম্ভবত করছে। আবার এটাও সত্য, নিজের বক্তব্য খুঁজে পেতে গিয়ে একটি সিনেমা নিজেকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে প্রস্তুত—এমন সাহসও বিরল।

সিনেমার শেষ দিকের কিছু দৃশ্যে মূলধারার ভাষার মধ্যে আর্টহাউস সিনেমার উচ্চাকাঙ্ক্ষা দেখা যায়। বিষাক্ততার পরিণতি আর উন্মাদ মানসিকতার মিশেলে তৈরি কিছু চিত্র সত্যিই ভাবায়। আপনি সিনেমাটির যাত্রাপথ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন, কিন্তু তার গন্তব্য নিয়ে সন্দেহ করা কঠিন।

শেষ পর্যন্ত ‘টক্সিক’ একটি অদ্ভুত প্রশ্ন রেখে যায়—আমরা কি এত দিন সিনেমার সহিংস ও বিষাক্ত পুরুষ চরিত্রকে নায়ক হিসেবে দেখেছি, নাকি সিনেমাই আমাদের সেইভাবে দেখতে শিখিয়েছে?

রজার এবার্টের ভাষায় সিনেমাকে তার নিজের শর্তে বিচার করা জরুরি। কিন্তু রিচার্ড ব্রডির পাল্টা প্রশ্নটিও একইভাবে জরুরি—একটি খারাপ ধারণাকে দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করলেই কি সেটি প্রশংসার যোগ্য হয়ে যায়? ‘টক্সিক’ এ দুই প্রশ্নের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। সিনেমাটি হয়তো সবসময় ভালোভাবে তার বক্তব্যে পৌঁছাতে পারে না। কিন্তু পুরুষের গল্প বলতে বলতে শেষ পর্যন্ত যে প্রশ্নটি তোলে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ: যে পুরুষতন্ত্রকে সিনেমা এত দিন রোমান্টিক করেছে, তার পরিণতি নিয়ে কথা বলার সময় কি আসেনি?

হয়তো ‘টক্সিক’-এর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি, আবার সবচেয়ে বড় সাফল্যও এখানেই—নিজের ভালো বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে সিনেমাটি ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু সময়ের জন্য ‘খারাপ’ সিনেমার মুখোশ পরে থাকে।

হলিউড রিপোর্টার ইন্ডিয়া অবলম্বনে

আরও