মানুষের কষ্টের নাম আছে-দুঃখ, ভয়, ভালোবাসা, শোক। পশুদের নেই। তাই বলে কি তাদের অনুভূতিও নেই? একটি কুকুর মালিকের মন খারাপ বুঝে নিজের আচরণ বদলায়। একটি শিম্পাঞ্জি মারামারির পর আহত সঙ্গীকে সান্ত্বনা দেয়। একটি দাঁড়কাক অন্য একটি দাঁড়কাকের অস্বস্তি দেখার পর নিজেই পৃথিবীকে আরো নেতিবাচকভাবে দেখতে শুরু করে। তাদের আবেগ অনুভূতিগুলো আসলেই কেমন?
মানুষের মতো অন্য প্রাণীদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করা যায় না, ‘তুমি কী অনুভব করছ?’ ফলে তাদের আবেগ বোঝার চেষ্টা করতে হয় আচরণ, শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন, স্মৃতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সামাজিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। সাম্প্রতিক গবেষণাও বলছে, প্রাণীদের আবেগ নিয়ে প্রশ্নটি এখন আর কেবল দর্শনের বিষয় নয়, এটি প্রাণিবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানের সক্রিয় গবেষণাক্ষেত্র। তবে কোনো প্রাণী ঠিক মানুষের মতো করে একটি অনুভূতি অনুভব করে কিনা, তার নিশ্চিত উত্তর এখনো আমাদের কাছে নেই। তবে আমাদের কাছে আছে চমৎকার কিছু ঘটনা।
হাতি: মৃত্যুতে যারা শোকাতুর হয়
হাতির গল্পটি শুরু হয় মৃত্যুর কাছে । হাতি মৃত বা মুমূর্ষু সঙ্গীর শরীর শুঁড় দিয়ে বারবার স্পর্শ করে, গন্ধ নেয়, মুখ, কান ও শরীর পরীক্ষা করে। কখনো মৃতদেহের ওপর শুঁড় রেখে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে।কোনো কোনো হাতি মৃত সঙ্গীর কাছ থেকে সহজে সরে যায় না। তারা দেহের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে, চারপাশে ঘোরে, কখনো পাহারা দেওয়ার মতো অবস্থান নেয়। গবেষণায় এটিকে 'গার্ডিং' বলা হয়েছে-অর্থাৎ মৃতদেহের কাছে থাকা, তাকে ঘিরে রাখা বা চলে যেতে অনীহা। আরো অদ্ভুত ব্যাপার হলো মৃতদেহকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা। কিছু ক্ষেত্রে হাতিকে মৃত বা মুমূর্ষু সঙ্গীকে শুঁড় কিংবা পা দিয়ে তুলতে, ঠেলতে, টানতে বা নড়াতে দেখা গেছে। অর্থাৎ প্রাণীটি হয়তো বুঝতে পারছে না যে সঙ্গী আর ফিরবে না — অথবা বুঝলেও তাকে ছেড়ে যাওয়ার পরিবর্তে তার সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখছে।
কুকুর: যে আমাদের সুখে সুখী হয়, দুঃখে দুঃখী
কুকুরের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক হয়তো পশুদের অনুভূতির সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ। আমরা কথা বলি; কুকুর আমাদের কথা পুরোপুরি বুঝতে না পারলেও আমাদের শরীর, কণ্ঠস্বর, আচরণ ও আবেগের সংকেত পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের আবেগগত অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে কুকুরের আচরণও বদলাতে পারে। একবার একটি পরীক্ষায় মালিক যখন একটি নকল কুকুরকে আদর করছিলেন, তখন আসল কুকুরগুলো মালিকের সামনে অস্থির আচরণ করে, মালিক বা ‘প্রতিদ্বন্দ্বীকে’ ঠেলে দেয়া কিংবা মাঝখানে ঢুকে পড়ার মতো আচরণ বেশি দেখিয়েছে। তবে এটিকে সরাসরি মানুষের ঈর্ষা বলা ঠিক হবে না। আমরা শুধু বলতে পারি, সামাজিক বন্ধন হুমকির মুখে পড়লে কুকুরের আচরণ ঈর্ষার মতো প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে।
শিম্পাঞ্জি: অন্যের কষ্ট যারা কষ্ট পায়
শিম্পাঞ্জিদের জগতে ঝগড়া, আধিপত্যের লড়াই কিংবা হঠাৎ আক্রমণ অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু সংঘর্ষ থামার পর, যে শিম্পাঞ্জিটি মার খেয়েছে, সে যখন একা হয়ে যায় কিংবা বা ভয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেয়, তখন দলের আরেক সদস্য ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে আসে। পাশে বসে। কখনো তাকে স্পর্শ করে, জড়িয়ে ধরে, মুখের কাছে মুখ নিয়ে আসে কিংবা শরীরের লোম পরিষ্কার করতে শুরু করে। কিছুক্ষণ আগেও যে প্রাণীটি উত্তেজিত ছিল, এই সংস্পর্শের পর ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে। গবেষকরা এই আচরণকে বলেন ‘কনসোলেশন’— সান্ত্বনা দেয়া। দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, আক্রমণের শিকার শিম্পাঞ্জিরা সান্ত্বনা পেলে তাদের ‘স্ট্রেস-রিলেটেড' আচরণ কমে যায়। এটিকে মানুষের মতো ‘সহমর্মিতা’ বলা যাবে কিনা, বিজ্ঞান এখনো সে বিষয়ে সতর্ক। কিন্তু দৃশ্যটি একটি পুরোনো ধারণাকে অবশ্যই প্রশ্নের মুখে ফেলে-অন্যের কষ্ট কি শুধু মানুষেরই চিন্তার বিষয়? নাকি সহমর্মিতার বীজ মানুষের জন্মের অনেক আগেই সামাজিক প্রাণীদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল?
ডলফিন: মৃত সন্তানকেও ছেড়ে যেতে পারে না
বটলনোজ ডলফিনের ওপর পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, প্রাপ্তবয়স্ক ডলফিন মৃত শাবককে বহন করে, পানির ওপরে তোলে, আবার কখনো ডুবিয়ে দেয়। ২০২১ সালে ভূমধ্যসাগরে পর্যবেক্ষণ করা দুটি ঘটনায় সম্ভাব্য মা-ডলফিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা মৃত নবজাতকের সঙ্গে ছিল। এটি হয়তো মৃত সন্তানকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা, মাতৃত্বের আচরণের ধারাবাহিকতা, বিভ্রান্তি কিংবা গভীর সামাজিক বন্ধনের প্রতিক্রিয়া। গবেষকরা বলছেন, ডলফিন মৃত্যুকে মানুষের মতো বুঝতে পারে কিনা, তা এখনো অজানা। তবু দৃশ্যটি সহজে মনে দাগ কাটে। কারণ সমুদ্রের একটি মা তার মৃত সন্তানকে ছেড়ে যাচ্ছে না। হতে পারে এটাই তাদের শোকের বহিঃপ্রকাশ।
তাহলে কি পশুরা অনুভব করে?
সমস্যাটা এখানেই। আমরা মানুষের অনুভূতি বুঝি মূলত একটি অসাধারণ সুবিধার কারণে। মানুষ বলতে পারে, ‘আমি ভয় পেয়েছি’, ‘আমি তাকে ভালোবাসি’, ‘আমি তাকে হারিয়েছি।’ অন্য প্রাণীরা তা পারে না। তাই কুকুরের আচরণকে ‘ঈর্ষা’, হাতির আচরণকে ‘শোক’ বলার সময় সতর্কতা জরুরি। এগুলো মানুষের অনুভূতির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ আচরণ, কিন্তু প্রাণীটির ভেতরের অভিজ্ঞতা ঠিক কেমন, সেটি আমরা এখনো সরাসরি জানি না। তবে তাদের আচরণে এতটুকু পরিষ্কার, যে তারাও অনুভব করে। তাই প্রাণীদের প্রতি আমাদের সহানুভূতিশীল হতে হবে। কারণ এ পৃথিবী শুধু মানুষের নয়, এ পৃথিবী তাদেরও।