সকালের এক কাপ গরম কফি ছাড়া দিন শুরু হয় না, বিশ্বজুড়ে এমন মানুষের সংখ্যা কোটি কোটি। ক্যাফেইনকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় উদ্দীপক। ক্লান্তি শ্রান্তিতে দিনের পর দিন মস্তিষ্ককে কর্মক্ষম রাখছে কৃষ্ণবর্ণের পানীয়টি। জোগান যুগিয়ে যাচ্ছে কর্মসংস্থানে। একদিকে গড়ে তুলেছে বিশাল অর্থনীতি, অন্যদিকে ধ্বংস করেছে বিপুল বাস্তুতন্ত্র। যুগ যুগ ধরে এটি যেমন সমাজ বিনির্মাণ করেছে, তেমনি জ্বালানি জুগিয়েছে বহু বিপ্লবে। কখনো একে ঈশ্বরের আশীর্বাদ হিসেবে উপাসনা করা হয়েছে, আবার কখনো বর্জন করা হয়েছে পাপ বা অপকর্মের উৎস হিসেবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এ রোস্টেড দানার তীব্র আকর্ষণের কাছে নতি স্বীকার করেছে পুরো মানবজাতি।
প্রায়শ মনে প্রশ্ন জাগে কীভাবে এ কফির উৎপত্তি? আর কোন পথ ধরে তা আজ পৌঁছে গেছে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি রান্নাঘরে?
কফির মূল উপাদান ক্যাফেইন, যার ভালো-মন্দ দুটি দিকই রয়েছে। এটি আমাদের ক্লান্তি দূর করে মনকে চাঙ্গা ও মনোযোগকে তীক্ষ্ণ করে তোলে—বিশেষ করে বিনিদ্র রাত কাটানোর পর। তবে এর অতিরিক্ত ব্যবহার রক্তচাপ বাড়াতে পারে এবং ডেকে আনতে পারে চরম মানসিক উদ্বেগ
জনশ্রুতি আছে, ৮৫০ খ্রিস্টাব্দে ইথিওপিয়ার কালদি নামের এক মেষপালক প্রথম কফির গুণাগুণ আবিষ্কার করেন। হঠাৎই একদিন তিনি লক্ষ্য করেন, বুনো এক গাছের লাল ফল খাওয়ার পর তার ছাগলগুলো অদ্ভুত রকমের চঞ্চল হয়ে উঠছে এবং লাফালাফি করছে। কৌতুহলবশত কালদি নিজেও কয়েকটি ফল চিবিয়ে দেখেন। এরপরই মুহূর্তের মধ্যে শরীরে অভাবনীয় কর্মোদ্দীপনা অনুভব করেন তিনি। লোকমুখে এটিই মানবতার প্রথম কফি দর্শনের গল্প হিসেবে প্রচলিত।
কালদির গল্পটি বেশ জনপ্রিয় হলেও ঐতিহাসিকরা নিশ্চিতভাবে এর সময়কাল নির্ণয় করতে পারেননি। তবে এটুকু নিশ্চিত, ১৪০০ শতকের আগেই ইথিওপিয়ার গহীন বনে থেকে মানুষ বুনো কফি ফল সংগ্রহ করা শুরু করেছিল।
ছবি: রয়টার্স
কফির মূল উপাদান ক্যাফেইন, যার ভালো-মন্দ দুটি দিকই রয়েছে। এটি আমাদের ক্লান্তি দূর করে মনকে চাঙ্গা ও মনোযোগকে তীক্ষ্ণ করে তোলে—বিশেষ করে বিনিদ্র রাত কাটানোর পর। তবে এর অতিরিক্ত ব্যবহার রক্তচাপ বাড়াতে পারে এবং ডেকে আনতে পারে চরম মানসিক উদ্বেগ।
চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে, মানবদেহে প্রবেশের পর ক্যাফেইন মূলত আমাদের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে উদ্দীপিত করে। এটি মস্তিষ্কের ‘অ্যাডেনোসিন’ নামক রাসায়নিক ব্লকের কার্যকারিতা বন্ধ করে দেয়। ফলে ঘুম ঘুম ভাব কেটে যায়, মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে কর্মক্ষম ও সচেতন থাকতে পারে।
মজার বিষয় হলো, কফি গাছ এ ক্যাফেইনকে প্রাণরক্ষার কবচ হিসেবে ব্যবহার করে। তার দেহে থাকা ক্যাফেইন তৃণভোজী প্রাণী ও পোকামাকড়ের শরীরে বিষের মতো কাজ করে। সেইসঙ্গে এটি মৌমাছির মতো পরাগায়নকারীদের আকর্ষণ করতে গাছকে সাহায্য করে। ফলে গাছের বেঁচে থাকা ও বংশবিস্তার সহজ হয়। কিন্তু মানুষ সেই নেশার রসায়নটুকু ধরে ফেলে নিজের প্রতিদিনের ক্লান্তি দূর করার মোক্ষম হাতিয়ার বানিয়ে নিয়েছে।
শুরুর দিকে দেশটির প্রাচীন মানুষরা কফি পাতা দিয়ে চায়ের মতো পানীয় বানাতেন। আবার কখনো কখনো কফি ফল চূর্ণ করে তার সঙ্গে মাখন ও লবণ মিশিয়ে তৈরি করতেন উচ্চ-শক্তির এক ধরনের খাদ্য উপাদান, যা দীর্ঘ পথ চলায় তাদের শক্তি জোগাত। পরবর্তীতে তারা কফির বীজ শুকিয়ে, পুড়িয়ে (রোস্ট করে) এবং পানিতে ফুটিয়ে উষ্ণ ও উদ্দীপক পানীয় তৈরির প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেন।
কফি বাগান। ছবি: রয়টার্স
বাণিজ্যিক পথ ধরে ইথিওপিয়া থেকে ধীরে ধীরে মধ্যপ্রাচ্যে প্রবেশ করে কফি। ১৪৫০ সালের মধ্যে সিরিয়া, মেসোপটেমিয়া এবং পারস্যে (বর্তমান ইরান) এটি দারুণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৫০০ শতকের শেষের দিকে ইয়েমেন কফি চাষের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
ষোলো শতকে আরব বিশ্বে কফি হয়ে ওঠে ‘দ্য বেভারেজ অব চয়েজ’। মক্কায় হজ করতে যাওয়া হাজিরা এ পানীয় পান করতেন। কফি তখন ছিল আরব বিশ্বের একচেটিয়া অর্থনৈতিক উৎস, ফলে বন্দরে বন্দরে কফি বীজ রফতানিতে ছিল কড়াকড়ি। এ কড়াকড়ির মধ্যেই ভারত থেকে মক্কায় হজ করতে যাওয়া ‘বাবা বুদান’ নামের এক প্রজ্ঞাবান সুফি সাধক খুব সঙ্গোপনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাতটি কফিবীজ লুকিয়ে নিয়ে ফিরেছিলেন নিজের গ্রামে
অটোমান সাম্রাজ্যে কফি সংস্কৃতির বীজ পুড়িয়ে এবং গুঁড়ো করে আরো গাঢ় ও কড়া পানীয় তৈরি শুরু হয়। জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ কফিহাউজ ও মসজিদের বাইরে কফি গানের জন্য ভিড় করতে শুরু করে, যেখানে চলত আড্ডা ও নানা বৈপ্লবিক আলোচনা। এতে ভীত হয়ে তৎকালীন শাসকরা কফির প্রভাব নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন—এটি ধর্মীয়ভাবে বৈধ নাকি কোনো ক্ষতিকর নেশা, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ১৫১১ সালে মক্কার এক আদালতে কফিকে আক্ষরিক অর্থেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় এবং মুসলিমদের জন্য এটি পান করা জায়েজ কিনা, তা নিয়ে তুমুল বিতর্ক হয়। তবে শেষ পর্যন্ত বিদগ্ধ পণ্ডিতরা কফিকে ইসলামী আইনানুযায়ী বৈধ বলে রায় দেন। এ রায়ের পর দামেস্ক, ইস্তাম্বুল ও কায়রোর মতো মধ্যপ্রাচ্যের বড় বড় শহরগুলোয় ব্যাঙের ছাতার মতো কফিহাউজ গড়ে উঠতে থাকে।
ষোলো শতকে আরব বিশ্বে কফি হয়ে ওঠে ‘দ্য বেভারেজ অব চয়েজ’। মক্কায় হজ করতে যাওয়া হাজিরা এ পানীয় পান করতেন। কফি তখন ছিল আরব বিশ্বের একচেটিয়া অর্থনৈতিক উৎস, ফলে বন্দরে বন্দরে কফি বীজ রফতানিতে ছিল কড়াকড়ি। এ কড়াকড়ির মধ্যেই ভারত থেকে মক্কায় হজ করতে যাওয়া ‘বাবা বুদান’ নামের এক প্রজ্ঞাবান সুফি সাধক খুব সঙ্গোপনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাতটি কফিবীজ লুকিয়ে নিয়ে ফিরেছিলেন নিজের গ্রামে।
বর্তমান দক্ষিণ কর্ণাটকের পশ্চিম ঘাট পর্বতমালার ছোট্ট গ্রাম চিকমগলুর ছিল বাবা বুদানের বাড়ি। সেখানেই তিনি বীজগুলো পরম যত্নে রোপণ করেন এবং চাষ হয় ভারতের প্রথম কফির। ধীরে ধীরে ভারতজুড়ে কফির চাষ শুরু হয় এবং আজ ভারত বিশ্ব কফি রফতানিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। সেখান থেকে কফি ছড়ায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার বিখ্যাত ‘জাভা’ দ্বীপে।
অটোমান সাম্রাজ্যের হাত ধরেই ইউরোপে কফির আগমন ঘটে। ১৬৫০-এর দশকে লন্ডনে প্রথম কফিহাউজ খোলা হয়। কয়েক বছরের মধ্যে লন্ডনের রাস্তায় প্রায় ৮০টিরও বেশি কফিহাউজ গড়ে ওঠে, যা রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। তৎকালীন রাজা দ্বিতীয় চার্লস কফিহাউজগুলো বন্ধ করার ব্যর্থ চেষ্টাও করেছিলেন। ফ্রান্সে কফির তিক্ত স্বাদ কমাতে এর সঙ্গে দুধ ও চিনি মেশানো শুরু হয়। ১৭০০ শতকে প্যারিসের কফিহাউজগুলো হয়ে ওঠে দেনিস দিদেরো বা ভলতেয়ারের মতো দার্শনিকদের আড্ডাস্থল। কথিত আছে, ভলতেয়ার দিনে প্রায় ৫০ কাপ পর্যন্ত কফি খেতেন!
ছবি: রয়টার্স
তবে কফির এই বিশ্বজয়ের পেছনে রয়েছে এক অন্ধকার ইতিহাস। ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ঔপনিবেশিক শাসকরা ক্যারিবীয় অঞ্চল, এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার কফি বাগানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয়। বাগানগুলোয় চালানো হতো চরম দাসপ্রথা ও অমানবিক শ্রম শোষণ। লাতিন আমেরিকায় বিশাল কফি বাগান বানাতে গিয়ে উচ্ছেদ করা হয় স্থানীয় আদিবাসীদের, উজাড় করা হয় মাইলের পর মাইল আদিম বনাঞ্চল। ১৯০৬ সালের মধ্যে ব্রাজিল বৈশ্বিক সরবরাহের ৮০ শতাংশের বেশি উৎপাদন করে কফি জায়ান্টে পরিণত হয়। একই বছর মিলান ওয়ার্ল্ড ফেয়ারে বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক ‘এসপ্রেসো মেশিন’ উন্মোচিত হয়, যা কফি পানের অভিজ্ঞতাকে চিরতরে বদলে দেয়। শিল্পায়নের ছোঁয়ায় কফি স্থানীয় পানীয় থেকে রূপ নেয় বৈশ্বিক ব্র্যান্ডেড পণ্যে।
উপনিবেশবাদ থেকে মুক্তির পর অনেক আফ্রিকান দেশ তাদের জাতীয় অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে কফি উৎপাদনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। একই সঙ্গে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয়, বিশেষ করে দ্রুতগতির শহুরে জীবনে ক্যানজাত বা রেডি-টু-ড্রিংক কফি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। সাম্প্রতিক দশকগুলোয় বাজারে এসেছে ‘স্পেশালিটি কফি’—যেখানে কফির গুণগত মান, শৈল্পিক তৈরি পদ্ধতি এবং সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্যে বীজ সংগ্রহের ওপর জোর দেয়া হয়। এটি মধ্য আমেরিকা ও পূর্ব আফ্রিকার ছোট ছোট খামারিদের কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে।
তবে এতসব উদ্যোগের পরেও কফি শিল্পের ভেতরের সংকট কাটেনি। মুনাফার অসম বণ্টন, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি না পাওয়া এবং পরিবেশগত বিপর্যয় আজও এ শিল্পের বড় ক্ষত। এর ওপর যোগ হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে বিষুবরেখায় অবস্থিত কফি চাষের মূল অঞ্চল বা ‘বিন বেল্ট’ আগামী দশকগুলোয় সংকুচিত হয়ে আসবে। বিজ্ঞানীরা এখন জলবায়ুসহিষ্ণু হাইব্রিড জাতের কফি গাছ উদ্ভাবনের চেষ্টা করছেন।
ব্রিটানিকা ও ইন্টারন্যাশনাল কফি অর্গানাইজেশন অবলম্বনে