টোকিও মানেই ব্যস্ততা। চারপাশে মানুষের ভিড়, যানবাহন আর উঁচু দালান। তবে জাপানের এ যান্ত্রিক নগরের বুকেই লুকিয়ে আছে এক বিশেষ এলাকা, যেখানে সময় যেন একটু ধীরে চলে। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি বইয়ের দোকান। কোথাও পুরনো বইয়ের স্তূপ। কোথাও দুর্লভ সংস্করণ। পথের ধারের ক্যাফেগুলোয় কফির কাপ হাতে বইয়ের পাতায় ডুব দেন পাঠক। জায়গাটির নাম জিমবোচো। টোকিওর এ এলাকা ‘বুক টাউন’ বা বইয়ের শহর নামে পরিচিত।
জিমবোচোর গলিগুলোয় হাঁটলে মনে হয় যেন গোটা এলাকাটি এক বিশাল লাইব্রেরি বা বইয়ের রাজ্য। এখানে নতুন-পুরোনো সব ধরনের দুর্লভ পাণ্ডুলিপি, আর্ট ও সাহিত্যে বই পাওয়া যায়।
এখানে রয়েছে ১৩০টির বেশি বইয়ের দোকান। পুরোনো ও দুর্লভ বইয়ের দোকানই বেশি। কোথাও সাহিত্য ও ইতিহাসের বই মিলবে। কোথাও শিল্প, নকশা ও ফ্যাশনের বই। আবার কোনো দোকানের মূল আকর্ষণ পুরনো ম্যাগাজিন। ফলে বইপ্রেমীদের জন্য জিমবোচো শুধু কেনাকাটার জায়গা নয়। এটি বই ঘিরে একটি আলাদা জগৎ।
জিমবোচোর সঙ্গে বইয়ের সম্পর্ক অবশ্য নতুন নয়। এলাকার নাম এসেছে ১৭ শতকের সামুরাই নাগাহারু জিমবোর নাম থেকে। ১৯১৩ সালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে এখানকার অনেক ভবন ও দোকান পুড়ে যায়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইওয়ানামি শিগেও সেখানে একটি বইয়ের দোকান চালু করেন। সেই প্রতিষ্ঠানই পরে প্রকাশনা সংস্থা ইওয়ানামি শোতেন হিসেবে বড় হয়। এরপর ধীরে ধীরে জিমবোচো হয়ে ওঠে লেখক, পাঠক, গবেষক ও বুদ্ধিজীবীদের অন্যতম মিলনস্থল।
এলাকাটির আশপাশে রয়েছে নিহন, সেনশু, মেইজি ও হোসেই বিশ্ববিদ্যালয়। আছে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, গ্রন্থাগার ও সাহিত্যসংক্রান্ত বিভিন্ন সংগঠন। ফলে শিক্ষার্থী ও গবেষকদের আনাগোনাও এখানে বেশি।
জিমবোচোর বইয়ের জগতকে আরো পরিচিত করে তুলেছে জাপানি লেখক সাতোশি ইয়াগিসাওয়ার উপন্যাস ‘ডেজ অ্যাট দি মরিসাকি বুকশপ’। বইটির গল্পের কেন্দ্রেই রয়েছে জিমবোচোর একটি পুরোনো বইয়ের দোকান। গল্পের তরুণী তাকাকো জীবনের কঠিন সময়ের পর তার মামার পুরোনো বইয়ের দোকানে থাকতে ও কাজ করতে শুরু করে। বইয়ের ভেতরের জগৎ ও দোকান ঘিরে তৈরি হওয়া মানুষের সম্পর্ক ধীরে ধীরে তাকে নতুন করে জীবনকে দেখতে শেখায়। উপন্যাসটি ২০১০ সালে জাপানে প্রকাশিত হয়। পরে ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
ফলে জিমবোচোকে শুধু বইয়ের বাজার হিসেবে দেখলে এর পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। এখানে বইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও ইতিহাস।
বইয়ের বাইরে জিমবোচোতে ঘোরার মতো জায়গাও রয়েছে। ২০০৭ সালে চালু হওয়া জিমবোচো থিয়েটার সিনেমাপ্রেমীদের জন্য একটি আকর্ষণীয় স্থান। ৯৯ আসনের এ প্রেক্ষাগৃহে পুরোনো জাপানি চলচ্চিত্র, কাল্ট সিনেমা ও সীমিত প্রদর্শনীর চলচ্চিত্র দেখানো হয়।
জিমবোচোর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো খাবার ও ক্যাফে। বইয়ের দোকান ঘোরা, ক্যাফেতে বসা ও কফি খাওয়া— এ তিনটি অনেক দর্শনার্থীর কাছে জিমবোচো ভ্রমণের স্বাভাবিক অংশ। আবার বোর্ড ও কার্ড গেমের দোকানও রয়েছে এখানে। সুগোরোকুয়া নামে একটি দোকানে পাঁচ শতাধিক গেম পাওয়া যায়।
সাতোশি ইয়াগিসাওয়ার ‘ডেজ অ্যাট দি মরিসাকি বুকশপ’ ও জাপান টুডের তথ্য অবলম্বনে