৩৭০ কোটি বছর আগেই বিরল ধাতু ব্যবহার করত পৃথিবীর আদি জীব

বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন সময়ে মলিবডেনামের প্রাপ্যতার তথ্য সংগ্রহ করার পাশাপাশি প্রাণের বিবর্তনধারায় ধাতুটির ব্যবহারের ইতিহাস পুনর্গঠন করেছেন। ফলাফলে দেখা যায়, মলিবডেনাম ও টাংস্টেন ব্যবহারকারী উভয় ধরনের এনজাইমেরই উৎপত্তি আর্কিয়ান যুগে

পৃথিবীতে ৩০০ কোটি বছরেরও বেশি আগে বসবাসকারী অণুজীব মলিবডেনাম ব্যবহার করত বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে। সে সময় সমুদ্রের পানিতে ধাতুটির পরিমাণ খুবই কম ছিল। তার পরও প্রায় ৩৭০ কোটি বছর আগে অণুজীব গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক প্রক্রিয়ায় এটি কাজে লাগাতে শিখেছিল বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা।

যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণাটি ‘নেচার কমিউনিকেশনস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকদের দাবি, পৃথিবীর ইতিহাসের এত প্রাচীন সময়ে প্রাণের বেঁচে থাকার জন্য মলিবডেনামের প্রয়োজনীয়তার প্রমাণ দেয়া এটিই প্রথম গবেষণা।

বর্তমানেও জীবকোষের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় মলিবডেনাম প্রয়োজন হয়। এটি এমন কিছু এনজাইমের অংশ, যেগুলো কার্বন, নাইট্রোজেন ও সালফার-সংক্রান্ত বিক্রিয়ার গতি বাড়ায়। এসব বিক্রিয়া প্রাকৃতিকভাবে ঘটলেও মলিবডেনাম ছাড়া সেগুলোর গতি জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার তুলনায় অনেক কম হতো।

গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক ও ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন–ম্যাডিসনের অধ্যাপক বেতুল কাচার বলেন, প্রাণ কখন থেকে মলিবডেনাম ব্যবহার করতে শুরু করেছে, তা জানা গেলে গুরুত্বপূর্ণ বিপাকীয় প্রক্রিয়াগুলো কখন সম্ভব হয়েছিল, সে ধারণাও পাওয়া যায়।

ভূতাত্ত্বিক তথ্য বলছে, পৃথিবীর প্রাচীন সমুদ্রে মলিবডেনাম প্রায় ছিল না বললেই চলে। প্রায় ২৪৫ কোটি বছর আগে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ার পর সমুদ্রে ধাতুটির প্রাপ্যতা বাড়ে। ঘটনাটি ‘গ্রেট অক্সিডেশন ইভেন্ট’ নামে পরিচিত। এতদিন ধারণা করা হতো, মলিবডেনামের স্বল্পতার কারণে আদি জীব প্রথমে একই ধরনের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন টাংস্টেন ব্যবহার করত। পরে মলিবডেনাম সহজলভ্য হলে সেটির ব্যবহার শুরু হয়।

তবে নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, বিষয়টি এত সরল ছিল না। বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন সময়ে মলিবডেনামের প্রাপ্যতার তথ্য সংগ্রহ করার পাশাপাশি প্রাণের বিবর্তনধারায় ধাতুটির ব্যবহারের ইতিহাস পুনর্গঠন করেছেন। ফলাফলে দেখা যায়, মলিবডেনাম ও টাংস্টেন ব্যবহারকারী উভয় ধরনের এনজাইমেরই উৎপত্তি আর্কিয়ান যুগে। অর্থাৎ আদি জীব সম্ভবত শুরু থেকেই দুটি ধাতু ব্যবহার করত। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৩৭০ থেকে ৩১০ কোটি বছর আগেই মলিবডেনামের ব্যবহার শুরু হয়েছিল।

সমুদ্রের তলদেশের উষ্ণ পানির উৎস বা হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট থেকে আদি অণুজীব প্রয়োজনীয় মলিবডেনাম সংগ্রহ করে থাকতে পারে। এসব উৎস থেকে লোহা, দস্তা, তামা, নিকেল, কোবাল্ট, টাংস্টেন ও মলিবডেনামসহ বিভিন্ন ধাতু বের হয়।

গবেষকদের মতে, মলিবডেনাম দুর্লভ হলেও বিভিন্ন পরিবেশে রাসায়নিক বিক্রিয়া চালাতে এর বিশেষ কার্যকারিতা ছিল। তাই আদি জীব ধাতুটি সংগ্রহ ও ব্যবহারের কৌশল অর্জন করেছিল। এ আবিষ্কার দেখায়, কোনো উপাদান পরিবেশে বিরল হলেও জীবন সেটি কাজে লাগানোর পথ তৈরি করতে পারে। অন্য গ্রহে প্রাণ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রেও কেবল বর্তমান পৃথিবীর পরিবেশকে মানদণ্ড হিসেবে না দেখে সংশ্লিষ্ট গ্রহের ধাতু, অক্সিজেন ও বিবর্তনের ইতিহাস বিবেচনায় নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

আরও