বিদায় ‘কুইন অব কান্ট্রি মিউজিক’ ডলি পার্টন

দারিদ্র্য থেকে বিশ্বখ্যাতি— ডলি পার্টনের জীবন ছিল এক অসাধারণ যাত্রা। ১৯৪৬ সালের ১৯ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসির পিটম্যান সেন্টারে জন্ম তার। ১২ সন্তানের পরিবারে বেড়ে ওঠা ডলির শৈশব কেটেছে কাছের লোকাস্ট রিজে একটি এক কামরার কেবিনে। বাবা রবার্ট লি পার্টন ছিলেন তামাকচাষি। পরিবারের আর্থিক দুরবস্থাই পরবর্তী সময়ে তার অনেক গানের আবেগ ও গল্পের ভিত্তি হয়ে ওঠে

ছয় বছর বয়সেই প্রথম গান লিখেছিলেন ডলি পার্টন। গানটির শিরোনাম ছিল ‘লিটল টিনি ট্যাসেলটপ’, বিষয় ছিল তার ছোট্ট পুতুল। সেই গানের লেখা যত্ন করে তুলে রেখেছিলেন জুতার বাক্সে মা। সেই ছোট্ট মেয়েটিই পরবর্তী ছয় দশকে হয়ে ওঠেন মার্কিন কান্ট্রি সংগীতের অন্যতম বড় তারকা, জিতে নেন ‘কুইন অব কান্ট্রি মিউজিক’ খেতাব। ৮০ বছর বয়সে সেই সম্রাজ্ঞী চলে গেলেন না-ফেরার দেশে।

ন্যাশভিলের নিজ বাড়িতে গতকাল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ডলি পার্টন। ক্যানসারের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত লড়াই শেষে তার মৃত্যু হয়। কয়েক দিন আগেও জানিয়েছিলেন, কিছু স্বাস্থ্যগত সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার।

দারিদ্র্য থেকে বিশ্বখ্যাতি— ডলি পার্টনের জীবন ছিল এক অসাধারণ যাত্রা। ১৯৪৬ সালের ১৯ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসির পিটম্যান সেন্টারে জন্ম তার। ১২ সন্তানের পরিবারে বেড়ে ওঠা ডলির শৈশব কেটেছে কাছের লোকাস্ট রিজে একটি এক কামরার কেবিনে। বাবা রবার্ট লি পার্টন ছিলেন তামাকচাষি। পরিবারের আর্থিক দুরবস্থাই পরবর্তী সময়ে তার অনেক গানের আবেগ ও গল্পের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

জোলিন, কোট অব মেনি কালার্স, আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ— এমন অসংখ্য গান ডলি পার্টনকে শুধু কান্ট্রি সংগীতের তারকা নয়, বিশ্বসংগীতের পরিচিত মুখে পরিণত করে। জীবদ্দশায় তিনি আনুমানিক তিন হাজার গান লিখেছেন, যদিও রেকর্ড করেছেন প্রায় ৪৫০টি। তার ২৫টি গান বিলবোর্ডের কান্ট্রি চার্টে এক নম্বরে উঠেছিল। সংগীতের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন ১১টি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড

মা অ্যাভি লি পার্টন ছিলেন তার সংগীতজীবনের প্রথম অনুপ্রেরণা। ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও ওয়েলসের গল্পভিত্তিক গান তিনি নিয়মিত গাইতেন। আট বছর বয়সে ডলি প্রথম ভালো একটি গিটার পান। ১১ বছর বয়সেই স্থানীয় রেডিওতে গান গাইতে শুরু করেন। মাত্র ১৩ বছর বয়সে ন্যাশভিলের বিখ্যাত ‘গ্র্যান্ড ওলে অপ্রি’তে তার অভিষেক হয়।

হাইস্কুল শেষ করে কান্ট্রি মিউজিকের রাজধানী-খ্যাত ন্যাশভিলে পাড়ি জমান ডলি পার্টন। সেখানে তার পরিচয় হয় সংগীতশিল্পী পোর্টার ওয়াগনারের সঙ্গে। ওয়াগনারের টেলিভিশন অনুষ্ঠানে দীর্ঘদিন কাজ করেন তিনি এবং জুটি হিসেবে ১৪টি গান জায়গা করে নেয় শীর্ষ দশে। পরে একক ক্যারিয়ারে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে ওয়াগনারকে বিদায় জানিয়ে লেখেন ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’। গানটি পরবর্তী সময়ে হুইটনি হিউস্টনের কণ্ঠে নতুন জীবন পেয়ে বিশ্বজুড়ে আরো জনপ্রিয় হয়।

জোলিন, কোট অব মেনি কালার্স, আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ— এমন অসংখ্য গান ডলি পার্টনকে শুধু কান্ট্রি সংগীতের তারকা নয়, বিশ্বসংগীতের পরিচিত মুখে পরিণত করে। জীবদ্দশায় তিনি আনুমানিক তিন হাজার গান লিখেছেন, যদিও রেকর্ড করেছেন প্রায় ৪৫০টি। তার ২৫টি গান বিলবোর্ডের কান্ট্রি চার্টে এক নম্বরে উঠেছিল। সংগীতের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন ১১টি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড, যার মধ্যে রয়েছে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড। ২০২২ সালে তাকে রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

তবে ডলি পার্টনের জনপ্রিয়তা শুধু তার কণ্ঠ কিংবা গান লেখার প্রতিভায় সীমাবদ্ধ ছিল না। সাজানো স্বর্ণালি চুল, ঝলমলে পোশাক, উজ্জ্বল মেকআপ ও প্রাণখোলা হাসি—সব মিলিয়ে তিনি নিজেই হয়ে উঠেছিলেন একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক প্রতীক। নিজের ভাষায়, ‘ডলি ইমেজ’ ছিল তার ব্যক্তিত্বের একটি আলাদা রূপ। তিনি এই চেহারা নিয়ে রসিকতাও করতেন, আবার একই সঙ্গে চাইতেন বাহ্যিক উপস্থিতির চেয়ে তার প্রতিভাই মানুষের মনে বেশি জায়গা করে নিক।

কভিড মহামারীর সময় ২০২০ সালে ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের টিকা গবেষণায় ১০ লাখ ডলার দান করেন ডলি পার্টন। তার সেই অনুদান মডার্নার কভিড টিকা তৈরির গবেষণার প্রাথমিক পর্যায়ের অর্থায়নের অন্যতম উৎস ছিল

সংগীতের বাইরে অভিনয়েও সফল ছিলেন পার্টন। ১৯৮০ সালের ‘নাইন টু ফাইভ’ চলচ্চিত্রে জেন ফন্ডা ও লিলি টমলিনের সঙ্গে অভিনয় করে বড় পর্দায় অভিষেক হয় তার। ছবিটির শিরোনাম গান তাকে অস্কারে গীতিকারের মনোনয়ন এনে দেয়। পরে দ্য বেস্ট লিটল হোরহাউস ইন টেক্সাস, স্টিল ম্যাগনোলিয়াস, রাইনস্টোন ও স্ট্রেইট টক—এর মতো ছবিতেও অভিনয় করেন তিনি।

ব্যবসায়িক দক্ষতাও তাকে অন্য তারকাদের থেকে আলাদা করেছে। নিজের অঙ্গরাজ্য টেনেসিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ডলিউড—যা পরে অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়। কিন্তু তার সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকার হয়তো সংগীত বা ব্যবসায় নয়— মানবসেবা।

দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা তাকে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি রেখেছিল। শিশুদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে ডলি প্রতিষ্ঠিত ইমাজিনেশন লাইব্রেরি যুক্তরাষ্ট্রসহ কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও আয়ারল্যান্ডে শিশুদের বই সরবরাহ করেছে। টেনেসিতে নিজের জন্মস্থান এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তিও দিয়েছেন তিনি।

কভিড মহামারীর সময় ২০২০ সালে ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের টিকা গবেষণায় ১০ লাখ ডলার দান করেন ডলি পার্টন। তার সেই অনুদান মডার্নার কভিড টিকা তৈরির গবেষণার প্রাথমিক পর্যায়ের অর্থায়নের অন্যতম উৎস ছিল।

রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত যুক্তরাষ্ট্রেও ডলি পার্টন ছিলেন বিরল এক সর্বজনগ্রাহ্য চরিত্র। রক্ষণশীল ও উদারপন্থী— দুই পক্ষের মানুষই তাকে ভালোবাসতেন। নিজের শিকড়, পরিশ্রম, হাস্যরস এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা দিয়ে তিনি এমন এক জনপ্রিয়তা তৈরি করেছিলেন, যা দলীয় রাজনীতির সীমা ছাড়িয়ে যায়।

ডলি পার্টন শুধু নিজের প্রজন্মের জন্যই সংগীতের মানদণ্ড নির্ধারণ করেননি, বরং পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের জন্যও হয়ে উঠেছিলেন এক বিশ্বস্ত অভিভাবক ও অনুপ্রেরণার উৎস। বিশ্বখ্যাত পপ তারকা মাইলি সাইরাসের ‘গডমাদার’ হিসেবে তাদের রসায়ন ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সংগীত জগতে সর্বজনবিদিত। ডলি শুধু মাইলির পারিবারিক বন্ধন বা গডমাদার পরিচয়েই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং একাধারে তার শৈল্পিক জীবনের শিক্ষক, পথপ্রদর্শক এবং ব্যক্তিগত জীবনের অন্যতম ভরসাস্থল হয়ে উঠেছিলেন। নব্বইয়ের দশকের শেষে ও চলতি শতকের প্রথম দশকে মাইলির জনপ্রিয় শো ‘হ্যানা মন্টানা’য় ডলির অতিথি চরিত্র থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন কনসার্টে তাদের যৌথ পরিবেশনা প্রবীণ ও নবীন প্রজন্মের সংসংগীতপ্রেমীদের গভীরভাবে উদ্বেলিত করেছে।

তরুণ প্রজন্মের সংগীতশিল্পীদের কাছে ডলি ছিলেন আত্মবিশ্বাস ও স্বকীয়তার এক জ্বলন্ত প্রতীক— কীভাবে সংসংগীতের বাণিজ্যিক চাহিদার মুখে দাঁড়িয়েও নিজের স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর, মৌলিকতা ও সৃজনশীলতার স্বাধীনতা বজায় রাখা যায়, তা ডলি পার্টনের কাছ থেকেই শিখেছেন টেলর সুইফট বা কেসি মাসগ্রাভসের মতো আধুনিক পপ ও কান্ট্রি তারকারা। প্রথাগত ধারার বাইরে গিয়ে নিজের শর্তে ক্যারিয়ার গড়ে তোলার এই সাহসিকতা নতুন প্রজন্মের সংগীতশিল্পীদের কাছে ডলি পার্টনকে শুধু এক কালজয়ী গায়িকা নয়, বরং বাতিঘর করে রেখেছে।

ডলি পার্টন শুধু নিজের প্রজন্মের জন্যই সংগীতের মানদণ্ড নির্ধারণ করেননি, বরং পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের জন্যও হয়ে উঠেছিলেন এক বিশ্বস্ত অভিভাবক ও অনুপ্রেরণার উৎস

ডলি পার্টনের ব্যক্তিগত জীবনও ছিল আলোচিত। ১৯৬৬ সালে কার্ল ডিনকে বিয়ে করেন পার্টন। ডিন সব সময়ই প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকেছেন। ২০২৫ সালের মার্চে ৮২ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। প্রায় ছয় দশকের সেই সম্পর্ক ডলির জীবনে গভীর প্রভাব রেখেছিল।

ডলি পার্টনের বিদায় তাই শুধু একজন গায়িকা বা অভিনেত্রীর মৃত্যু নয়। এটি এমন এক শিল্পীর বিদায়, যিনি দারিদ্র্যের এককক্ষের কেবিন থেকে উঠে এসে নিজের গান, কণ্ঠ, ব্যক্তিত্ব ও মানবিক কাজ দিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে স্পর্শ করেছেন।

জীবনের শেষ পর্যন্ত নিজের সৃষ্টিকেই সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার মনে করতেন ডলি পার্টন। একবার লিখেছিলেন, লেখার সময়ই তিনি খোদার সবচেয়ে কাছাকাছি অনুভব করেন। আর মৃত্যুর পর তাকে কীভাবে মনে রাখা হবে—সে প্রশ্নের উত্তরও যেন দিয়ে গিয়েছিলেন তিনি, একজন ভালো গীতিকার হিসেবে স্মরণ করাই তার সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল।

সেই গানগুলোই এখন তার হয়ে কথা বলবে— জোলিন, কোট অব মেনি কালার্স, আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ কিংবা নাইন টু ফাইভ। আর তাদের মধ্য দিয়েই বেঁচে থাকবেন কান্ট্রি সংগীতের চিরচেনা সেই কণ্ঠ— আমাদের ‘কুইন অব কান্ট্রি মিউজিক’ ডলি পার্টন।

আরও