সভ্যতার সূচনা থেকেই পোশাক শুধু শরীর ঢাকার অনুষঙ্গ নয়, বরং তা হয়ে উঠেছে সামাজিক মর্যাদা, রাজনৈতিক দাপট ও ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতীক। বিভিন্ন যুগে শাসকরা সাধারণ মানুষের অবয়ব নিয়ন্ত্রণে জারি করেছেন অদ্ভুত সব ফরমান। ইতিহাস যাকে ‘সাম্পচুয়ারি ল’ বা ‘ব্যয়সংকোচন ও পোশাক নিয়ন্ত্রণ আইন’ নামে চেনে। ইউরোপের রাজদরবার থেকে শুরু করে সুদূর প্রাচ্যের রাজবংশ, কিংবা আধুনিক সময়ের একনায়কতন্ত্র—ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, কাপড়ের দৈর্ঘ্য থেকে শুরু করে জুতার রং পর্যন্ত সবকিছুই কখনো না কখনো শাসকের মর্জির বেড়াজালে বন্দি হয়েছে।
ইউরোপের ‘সাম্পচুয়ারি ল’ ও আভিজাত্যের লড়াই
মধ্যযুগ ও তার পরবর্তী সময়ে ইউরোপের সামাজিক স্তরবিন্যাস বজায় রাখতে পোশাক নিয়ন্ত্রণ আইন অত্যন্ত কঠোরভাবে কার্যকর করা হতো। ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি, জার্মানি ও ইংল্যান্ডের মতো দেশগুলোয় এ আইনের মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের পোশাকের কাপড়, অলংকার ও রঙের ব্যবহার নির্দিষ্ট করে দেয়া হতো। সিল্ক বা মখমলের (ভেলভেট) মতো বিলাসবহুল কাপড় এবং পার্পল (বেগুনি) রঙের পোশাক পরা সাধারণ মানুষের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল।
ফ্রান্সের রাজকীয় লাল জুতো
১৬৪৩ থেকে ১৭১৫ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সে রাজত্ব করেছেন চতুর্দশ লুই। তার জারি করা আইনে নিম্নবর্গের মানুষের জন্য লাল রঙের জুতো পরা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। রাজা মনে করতেন, লাল জুতো শুধু অভিজাত শ্রেণীরই একচেটিয়া বিশেষাধিকার; কারণ এটি ছিল ক্ষমতা ও বিপুল ঐশ্বর্যের প্রতীক।
ভেনিসের বিলাসিতায় লাগাম
ফ্রান্সের মতো বিলাসবহুল পোশাকের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের এ প্রবণতা পুরো ইউরোপজুড়ে ‘ট্রেন্ড’ বা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছিল। ইতালির ভেনিস নগরীতে ১৫৫৩, ১৫৬৪ ও ১৫৭৩ সালের সরকারি নথিতে এমন আইনের উল্লেখ পাওয়া যায়। সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী— কে কেমন ফ্যাশন বা পোশাকের স্টাইল বজায় রাখবে, তা নির্ধারণ করতেই এ বিলাসিতা-বিরোধী নিয়মগুলো চাপানো হতো।
ইংল্যান্ডের হাই হিল ও ডাইনি অপবাদ
১৭৭০ সালের আশপাশের সময়ে ইংল্যান্ডে নারীদের হাই হিল জুতো পরার অপরাধে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতেন। ১৭৩৫ সালের ‘উইচক্রাফট অ্যাক্ট’ বা ডাইনি আইনের আওতায়, যে নারীরা হাই হিল জুতো পরে পুরুষদের প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করত— তাদের অপরাধী বা ডাইনি হিসেবে গণ্য করা হতো। আপাতদৃষ্টিতে একে নৈতিকতার প্রশ্ন মনে হলেও বাস্তবে এটি ছিল সমাজে নারীর প্রভাব ও স্বাধীনতাকে খর্ব ও নিয়ন্ত্রণ করার একটি পুরুষতান্ত্রিক কৌশল।
ইম্পেরিয়াল চীনের নিষেধাজ্ঞায় হলুদ রঙ
চীনের সুই রাজবংশের (৫৮১-৬১৮) শাসন আমলে সাধারণ মানুষের জন্য যেকোনো ধরনের পোশাকে হলুদ রঙের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। হলুদ রঙটি সংরক্ষিত ছিল শুধু সম্রাট ও তার পরিবারের জন্য। পরবর্তীতে ৬৬৮ সালে টাং রাজবংশের সম্রাট লি ঝি’র আমলে এ নিষেধাজ্ঞা চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। চীনা সংস্কৃতিতে হলুদ রঙ ছিল পরম ক্ষমতা, দেবত্ব ও ভূমির প্রতীক। আরো পরে কিং রাজবংশের (১৬০৩-১৯১২) আমলে সম্রাটের পরিবারের অভ্যন্তরীণ পদমর্যাদা ও র্যাঙ্ক আলাদা করতে হলুদের বিভিন্ন শেড বা আভা ব্যবহার করা হতো।
জাপানের ‘কাম্বো’ ও জাঁকজমকের ওপর নিষেধাজ্ঞা
জাপানের এডো শাসনামলে (১৬০৩-১৮৬৭) ‘কাম্বো’ নামের কঠোর পোশাক আইন কার্যকর করে। এ আইনের লক্ষ্য ছিল — সামুরাই বহির্ভূত সাধারণ শ্রেণীগুলোর জাঁকজমক নিয়ন্ত্রণ করা। এর অধীনে সাধারণ মানুষের জন্য ক্রিমসন (গাঢ় লাল) বা পার্পল রঙের মতো উজ্জ্বল পোশাক ও স্বর্ণ বা অন্যান্য বিলাসবহুল কাপড়ের তৈরি জমকালো পোশাক পরা নিষিদ্ধ ছিল।
উত্তর কোরিয়া: ডেনিম যেখানে পুঁজিবাদের প্রতীক
উত্তর কোরিয়ায় জিন্স প্যান্ট পরা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা কিম জং-উন। তার মতে, জিন্স মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ক্ষয়িষ্ণু’ পুঁজিবাদী সংস্কৃতির প্রকাশ ও প্রভাব। সে দেশের আইন অনুযায়ী স্কিনি জিন্স পরা অপরাধের শামিল। একই সঙ্গে আধুনিক কাটের ব্যাগি প্যান্ট বা রিপড জিন্সও (ছেঁড়া জিন্স) নিষিদ্ধ। তরুণ প্রজন্মের ফ্যাশন নিয়ন্ত্রণ করতে সেখানে ‘সোশ্যালিস্ট ইয়ুথ লিগ’-এর বিশেষ দল টহল দেয়। কেউ এই নিয়ম অমান্য করলে শাস্তির বিধান আছে।
যুক্তরাষ্ট্র: ‘স্যাগিং প্যান্ট’
কোমরের নিচে নামিয়ে প্যান্ট পরার বা ‘স্যাগিং’ করার ফ্যাশনটির উৎপত্তি মূলত আমেরিকার কারাগারগুলো থেকে, যেখানে সুরক্ষার স্বার্থে বন্দীদের বেল্ট ব্যবহার করতে দেয়া হতো না। পরবর্তীতে এটি সাধারণ তরুণদের মাঝে ফ্যাশনে রূপ নিলেও আমেরিকার বেশ কিছু শহরে শালীনতা ও অবমাননার অজুহাতে এটি নিষিদ্ধ করা হয়। আফ্রিকান-আমেরিকান কৃষ্ণাঙ্গ তরুণদের সঙ্গে ফ্যাশনটি গভীরভাবে জড়িয়ে থাকায় নিষেধাজ্ঞাগুলো মার্কিন সমাজে বর্ণবাদ ও সামাজিক উত্তেজনা তৈরি করেছিল। ফ্লোরিডার ওপা-লোকা, সাউথ ক্যারোলিনার টিমনসভিল, আলাবামার ডেডভিল (যেখানে মিনিস্কার্টও নিষিদ্ধ ছিল) এবং জর্জিয়া, লুইসিয়ানা ও ক্যালিফোর্নিয়ার বেশ কিছু এলাকায় এ আইন কার্যকর করা হয়।
গ্রিসের প্রাচীন ও আধুনিক জুতো-পুরাণ
প্রাচীন গ্রিসে কর্ক বা কাঠের তৈরি ‘কোথার্নি’ নামের উঁচু প্লাটফর্ম জুতো ব্যবহার করা হতো। রাষ্ট্রীয়ভাবে সরাসরি নিষিদ্ধ না হলেও সাধারণ সমাজে এ জুতোর ব্যবহারকে অত্যন্ত নেতিবাচকভাবে দেখা হতো। প্রাচীন গ্রিকদের বিশ্বাস ছিল, যেসব নারী সাধারণ জীবনে এ জুতো পরেন, তারা আসলে নিজেদের উচ্চতা বাড়িয়ে সমাজের কাছে নিজেদের সামাজিক অবস্থান নিয়ে প্রতারণা করছেন।
তবে ইতিহাস বদলে গেলেও গ্রিসে জুতোর ওপর নিষেধাজ্ঞা কাটেনি, শুধু বদলে গেছে প্রেক্ষাপট। ২০০৯ সালে গ্রিক সরকার দেশের প্রাচীন স্মৃতিস্তম্ভ এবং প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোতে হাই হিল, প্লাটফর্ম শু কিংবা স্টিলেটো পরা পুরোপুরি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ও প্রাচীন পাথরগুলোকে ক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করাই এ আধুনিক আইনের মূল উদ্দেশ্য।
তুরস্কের আধুনিকায়নের প্রতীক: ফেজ টুপি
ঊনিশ শতকে তুরস্ক এবং উত্তর আফ্রিকায় পুরুষদের মধ্যে ‘ফেজ’ বা ‘তারবুশ’ নামক বিশেষ এক ধরণের টুপির প্রচলন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ১৯২৫ সালে তুরস্কের আধুনিকায়নের জনক ও রাষ্ট্রপতি মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক ঐতিহাসিক ‘হ্যাট ল’ বা টুপি আইন প্রণয়ন করেন। দেশকে আধুনিক ও পশ্চিমা ধাঁচে রূপান্তর করার সংস্কারের অংশ হিসেবে তিনি ফেজ টুপি পরা নিষিদ্ধ করেন। আইন অমান্য করলে কারাদণ্ডের বিধানও রাখা হয়েছিল এবং এর পরিবর্তে পশ্চিমা ধাঁচের টপ হ্যাট বা বেরেট পরা বাধ্যতামূলক করা হয়।
নিষেধাজ্ঞার বৃত্তে নারী
ইতিহাসজুড়ে পোশাকের নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়েছে নারীরা। ১৯ ও ২০ শতক জুড়ে নারীদের প্যান্ট পরার অধিকারের লড়াই কিংবা ‘নৈতিকতার’ দোহাই দিয়ে স্কার্ট ও মিনিস্কার্টের দৈর্ঘ্য নির্ধারণের রাজনীতি—সবই ছিল নারীকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা। এর পাশাপাশি ধর্মীয় অনুশাসনও পোশাকের ধরন ঠিক করে দিয়েছে। যেমন, ইহুদি ধর্মীয় আইন (হালাখা) অনুযায়ী পোশাকে উল (পশম) ও লিনেন কাপড়ের মিশ্রণ তৈরি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
১৮৮৯ সালে সোয়াজিল্যান্ডে (বর্তমান নাম এসওয়াতিনি) ঔপনিবেশিক আইন প্রণয়ন করে নারীদের মিনিস্কার্ট পরা নিষিদ্ধ করা হয়। ২০১২ সরকার সে পুরনো আইনটি পুনরুজ্জীবিত করেছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, নারীদের ওপর সহিংসতা ও হয়রানি বন্ধে এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়েছে।
মালাউইয়ের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হেস্টিংস বান্দার শাসনামলে (১৯৬৪-১৯৯৪) নারীদের প্যান্ট (ট্রাউজার্স) ও মিনিস্কার্টকে ‘অশালীন পোশাক’ হিসেবে গণ্য করে পরিধানে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ১৯৯৪ সালে আইনটি বাতিল করা হলেও দেশটির বহু পুরুষ আজও নারীদের প্যান্ট পরার বিরোধী। এর প্রতিবাদে ২০১২ সালে ব্লাঙ্কটায়ার শহরে বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশে প্রায় ৩ হাজার নারী অংশ নেন।