সাহিত্যের সোনালী ইতিহাস ঘাঁটলে এমন কিছু কালজয়ী নাম বেরিয়ে আসে যারা আজ বিশ্বজুড়ে পূজিত। অথচ নিজেদের প্রতিভা প্রকাশে তাদের সামনে ছিল বিশাল প্রতিবন্ধকতা। সমাজ তখন নারীকে কেবল অন্দরমহলের গল্পকার হিসেবে দেখতে চাইত। তাদের মেধা ও বুদ্ধিবৃত্তিক গভীরতাকে সন্দেহের চোখে দেখা হতো। পাঠক ও সমালোচকদের ধারণা ছিল, নারী কেবল ঘরোয়া কাহিনী বা তুচ্ছ প্রেমের গল্প লিখতে পারেন। প্রকাশকরাও নারীদের লেখা প্রকাশে স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না।
সেসময় কিছু অদম্য নারী নিজের নাম আড়াল করে পুরুষ ছদ্মনামকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাদের অনেকেই জয় করেছেন বিশ্বসাহিত্যের সিংহাসন। তাদের মধ্যে রয়েছেন:
মেরি অ্যান ইভান্স ও এলিজাবেথ গ্যাসকেল
উনিশ শতকের ইংল্যান্ডে নারীদের জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক বা জটিল মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস লেখায় ছিল এক অলিখিত নিষেধাজ্ঞা। আর এ শিকল ভাঙার কারিগর ছিলেন মেরি অ্যান ইভান্স ও এলিজাবেথ গ্যাসকেল।
মেরি জানতেন ‘নারী’ তকমার কারণে তার লেখা সঠিকভাবে মূল্যায়িত হবে না। তাই তিনি বেছে নেন ‘জর্জ এলিয়ট’ নামটি। তার মহাকাব্যিক সৃষ্টি ‘মিডলমার্চ’ যখন পাঠকদের বিস্মিত করছিল, কেউ ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি এর প্রতিটি শব্দ একজন নারীর কলম থেকে নিঃসৃত। তিনি প্রমাণ করেছিলেন প্রজ্ঞা ও দর্শনের কোনো লিঙ্গ হয় না।
মেরি অ্যান ইভান্স
সামাজিক বৈষম্য আর শ্রমজীবী মানুষের সংকট নিয়ে যখন এলিজাবেথ লিখতে শুরু করেন, তখন তিনি নাম নিলেন ‘কটন ম্যাথার মিলস’। পরবর্তীতে তিনি অবশ্য নিজের নাম প্রকাশ করেছিলেন তবে বন্ধ দুয়ার খোলার জন্য ছদ্মনামটিই ছিল তার তুরুপের তাস।
ব্রন্টি ভগিনীত্রয়: তিন বোনের এক অনন্য লড়াই
শার্লট, এমিলি ও অ্যান ব্রন্টি— তিন বোন শুধু নিজেদের নাম বদলাননি, তারা একে অপরের সঙ্গে মিল রেখে তিনটি কাব্যিক নাম বেছে নিয়েছিলেন। সাহিত্য অঙ্গনে বেল ব্রাদার্স নামেই তারা পরিচিত ছিলেন। আর একক নাম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন কারার, এলিস ও অ্যাক্টন বেল নাম।
ব্রন্টি ভগিনীত্রয়
এ নামগুলোর আড়াল থেকেই জন্ম নিয়েছিল ‘জেন এয়ার’, ‘ওয়াদারিং হাইটস’ ও ‘অ্যাগনেস গ্রে’-র মতো বিশ্বসেরা ধ্রুপদী উপন্যাস। তাদের আসল পরিচয় প্রকাশে সাহিত্য জগতে রীতিমতো তোলপাড় পড়ে গিয়েছিল। পৃথিবী অবাক হয়ে দেখেছে সাধারণ ঘরের তিনটি মেয়ে কীভাবে সাহিত্যের মানচিত্র বদলে দিয়েছেন।
লুইসা মে অ্যালকট ও জর্জ স্যান্ড
কারো কাছে ছদ্মনাম ছিল সমাজে সম্মানিত হওয়ার কৌশল আর কারো কাছে শেকল ভাঙার একমাত্র উপায়। তবে লুইসা মে অ্যালকটের গল্পটি একটু ভিন্ন। 'লিটল উইমেন'-এর স্নিগ্ধ লেখিকা হিসেবে বেশ সমাদৃত হয়ে উঠেছিলেন তিনি। কিন্তু তার ছিল এক রহস্যময় জগত। তিনি যখন রহস্য রোমাঞ্চ ও থ্রিলার গল্প লিখতেন, তখন পর্দার আড়ালে চলে যেতেন ‘এ. এম. বার্নার্ড’ নামে। এই নামই তাকে গতানুগতিক ইমেজের বাইরে গিয়ে সাহসী কলম চালানোর স্বাধীনতা দিয়েছিল।
লুইসা মে অ্যালকট
অন্যদিকে, ফরাসি লেখিকা আমানদিন লুসিল অরোরা দুপাঁ ছিলেন সমসাময়িক সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে। তিনি তার ‘জর্জ স্যান্ড’ নামটিকে ব্যবহার করছিলেন সমাজের মুখে চপেটাঘাত হিসেবে। তিনি কেবল নামেই পুরুষ ছিলেন না, তার জীবনযাপনও ছিল প্রথা ভাঙার এক মহাকাব্য। প্যান্ট-কোট পরা, জনসমক্ষে ধূমপান করা আর অভিজাত মহলে পুরুষের সমকক্ষ হয়ে বিচরণ করা— সবকিছুর কেন্দ্রে ছিল তার এ পুরুষালি পরিচয়। বিখ্যাত উপন্যাস ‘ইন্ডিয়ানা’ প্রকাশের পর যখন আলোচনার ঝড় ওঠে, তখন ‘জর্জ স্যান্ড’ নামটি হয়ে ওঠে বিদ্রোহ ও স্বাধীনতার সমার্থক।
মেন্টাল ফ্লস অবলম্বনে শামীমা ইসলাম