মঙ্গলের লাল ধুলোমাখা মাটির নিচে কি লুকিয়ে আছে কোটি কোটি বছর আগের জীবনের কোনো চিহ্ন? রহস্যের এ জট খুলতে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে লাল গ্রহের ধুলোবালি চষে বেড়াচ্ছে নাসার কিউরিওসিটি রোভার। সম্প্রতি মঙ্গলের বিষুবরেখার কাছের শুকিয়ে যাওয়া একটি হ্রদে এমন কিছু জৈব অণুর সন্ধান পেয়েছে এ রোবট বন্ধু। একই ধরনের জৈব অণু পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশে মূল কারিগর হিসেবে কাজ করেছিল।
কিউরিওসিটির দেয়া তথ্যানুযায়ী, রাসায়নিক এ উপাদানগুলো প্রায় ৩৫০ কোটি বছর ধরে মঙ্গলের বুকে সংরক্ষিত ছিল। তবে এগুলো কি সত্যিই প্রাণের চিহ্ন, নাকি মহাজাগতিক পাথর বা অন্য কোনো ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় তৈরি তা নিয়ে এখনই নিশ্চিত কিছু বলতে পারছেন না বিজ্ঞানীরা।
২০১২ সাল থেকে মঙ্গলের গেইল ক্রেটার এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে নাসার কিউরিওসিটি রোভার। এবার শুকিয়ে যাওয়া এক প্রাচীন হ্রদের তলদেশে এটি ৭ ধরনের জৈব অণুর সন্ধান পেয়েছে। এর মধ্যে ৫টি অণু এর আগে কখনো মঙ্গলে শনাক্ত হয়নি। এসব অণুকে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তির জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক ‘বিল্ডিং ব্লক’ হিসেবে দেখছেন।
গবেষকরাও বিভিন্ন পরীক্ষার পর নিশ্চিত হয়ে বলেছেন, এ জৈব অণুগুলো প্রায় ৩৫০ কোটি বছর ধরে মঙ্গলের মাটিতে সংরক্ষিত রয়েছে। অর্থাৎ মঙ্গল যে একসময় প্রাণের উপযোগী পরিবেশ ধারণ করেছিল— ধারণাটি এখন আরো জোরালো হলো। তবে এসব অণু যে সরাসরি কোনো জীবের চিহ্ন, এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছাতে চাইছেন না বিজ্ঞানীরা। কারণ এগুলো উল্কাপিণ্ডের মাধ্যমে মঙ্গলে এসে থাকতে পারে, আবার ভূ-রাসায়নিক প্রক্রিয়ায়ও তৈরি হতে পারে।
এ গবেষণার নেতৃত্ব দিচ্ছেন ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী অ্যামি উইলিয়ামস। তার ভাষায়, বিজ্ঞানীরা এমন জৈব পদার্থ পেয়েছেন যা কয়েকশ কোটি বছর ধরে মঙ্গলের ভূগর্ভে টিকে আছে। প্রাণের চিহ্ন নিশ্চিত না হলেও এত পুরোনো জৈব পদার্থের অস্তিত্বই তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে মঙ্গলের বর্তমান পরিবেশ বেশ প্রতিকূল। রাতের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে যায়। আর বায়ুমণ্ডল না থাকায় সূর্যের শক্তিশালী তেজস্ক্রিয় বিকিরণ সরাসরি গ্রহের ওপর আছড়ে পড়ে। কিন্তু শত কোটি বছর আগের চিত্রটা ছিল ভিন্ন। তখন মঙ্গলের পৃষ্ঠে পানি প্রবাহিত হতো, এমনকি ছিল সুরক্ষামূলক বায়ুমণ্ডলও।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক অ্যান্ড্রু কোটস মনে করেন, পৃথিবীতে যখন প্রাণের বিকাশ ঘটছিল, মঙ্গলেও তখন প্রাণের অস্তিত্ব বিকশিত হবার জন্য প্রয়োজনীয় সব উপাদানই উপস্থিত ছিল। তাই বিজ্ঞানীরা সেখানে প্রাণ না থাকার কোনো যৌক্তিক কারণ দেখছেন না। তার ওপর এখন নতুন করে পাওয়া জৈব অণুর সন্ধান এ বিষয়ে তাদের আরো উৎসাহিত করছে।
রোভারের পরীক্ষাগারে ধরা পড়া অণুগুলোর মধ্যে একটি বিশেষ রাসায়নিক পাওয়া গেছে, যা ডিএনএ তৈরির প্রাথমিক উপাদানের সঙ্গে অনেকটা মিলে যায়। অধ্যাপক উইলিয়ামস বিষয়টিকে সহজভাবে ব্যাখ্যা করে বলেন, কোনো প্রাণীর ডিএনএ না পাওয়ার বিষয়টি হচ্ছে এমন, ‘তারা হয়তো বাড়ির সন্ধান পাননি; কিন্তু সেই বাড়ি তৈরির ইট ঠিকই খুঁজে পেয়েছেন।’
তবে বিজ্ঞানীরা আরেকটি বিষয়েও জোর দিয়ে জানিয়েছেন, এ অণুগুলো উল্কাপাতের মাধ্যমেও মঙ্গলে আসতে পারে। মজার বিষয় হলো, ঠিক একই ধরনের উল্কাপাত একসময় পৃথিবীতেও ঘটেছিল, যা আমাদের এই নীল গ্রহে প্রাণের ভিত গড়ে দিয়েছিল বলে অনেক বিজ্ঞানী বিশ্বাস করেন।
মঙ্গলের রহস্যময় এ জৈব অণুগুলো নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে তুমুল আগ্রহ। ২০২৮ সালে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার ‘রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন’ মিশন চালু হওয়ার কথা রয়েছে। সেই অভিযানে ২ মিটার গভীরে খনন করে আরো সূক্ষ্ম পরীক্ষা চালানো হবে। কিউরিওসিটি রোভারের এই প্রাথমিক আবিষ্কার ভবিষ্যতের সেই বড় মিশনের পথকে আরো প্রশস্ত করে দিল।
দ্য গার্ডিয়ান থেকে তথ্য নেয়া