শহরের ব্যস্ত মুদি দোকান থেকে শুরু করে গ্রামের চায়ের দোকান, প্রায় সর্বত্রই বিড়ালের উপস্থিতি। কিন্তু মানুষ প্রথম কবে ও কোথায় আদুরে এ প্রাণীকে আপন করে নিয়েছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর দীর্ঘদিন ধরেই ছিল বিতর্কিত। প্রত্নতত্ত্ব, শিল্পকলা ও জিনতত্ত্বের বিভিন্ন সূত্র মিলিয়ে গবেষকরা একটি সময়রেখা দাঁড় করালেও, সাম্প্রতিক ডিএনএ বিশ্লেষণ সেই ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
প্রাচীন ধারণা: কৃষির সূচনালগ্নেই গৃহপালন?
দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল, আধুনিক গৃহপালিত বিড়ালের পূর্বপুরুষ ছিল মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বন্যবিড়াল (Felis silvestris lybica)। প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার ও প্রাথমিক জিনগত বিশ্লেষণ ইঙ্গিত দিয়েছিল, প্রায় ১০ হাজার বছর আগে, প্রস্তর যুগে কৃষির সূচনার পর মধ্যপ্রাচ্যে গৃহপালিত পশু হিসেবে বিড়াল পরিচিত হয়। শস্যভান্ডারে ইঁদুরের আনাগোনা বেড়ে গেলে বন্যবিড়াল মানুষের বসতির আশপাশে ঘোরাফেরা শুরু করে। আর তখনই মানুষ বিড়ালকে পালন করতে শুরু করে।
২০০৪ সালে সাইপ্রাসে আবিষ্কৃত একটি সমাধি এ তত্ত্বকে জোরালো করেছিল। সেখানে এক ব্যক্তির দেহাবশেষের পাশে কুঁকড়ে থাকা একটি বিড়ালের কঙ্কাল পাওয়া যায়, যা প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ৭৫০০ সাল অর্থাৎ নিওলিথিক যুগের কঙ্কাল ছিল। আবার প্রাচীন মিশরের শিল্পকর্মে খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২০০০ সাল নাগাদ গলায় কলার পরা বিড়াল ও বিড়াল-সদৃশ পশুর চিত্র দেখা যায়, যা ইঙ্গিত করে, মিশরীয়রা তখন বিড়ালকে গৃহপালিত করেছিল।
২০১৭ সালে প্রাচীন বিড়ালের মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ বিশ্লেষণ করে গবেষকরা সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে প্রায় ৬৫০০ বছর আগে মধ্যপ্রাচ্য থেকে গৃহপালিত বিড়াল ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে।
নতুন গবেষণা: পূর্ণ জিনোমে মিলল ভিন্ন গল্প
বৈজ্ঞানিক সাময়িকী সায়েন্সে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ১০ হাজার বছরেরও বেশি সময়জুড়ে বিস্তৃত ২২৫টি প্রাচীন বিড়ালের নমুনা এবং উত্তর আফ্রিকা ও ইসরায়েলের আধুনিক বন্যবিড়ালের ডিএনএ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষকরা রেডিওকার্বন ডেটিংয়ের মাধ্যমে নমুনাগুলোর বয়স নির্ধারণ করে ৮৭টি পূর্ণ জিনোম পুনর্গঠন করেন। ফলাফল ছিল চমকপ্রদ।
গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, খ্রিস্টপূর্ব ২০০ সালের আগের ইউরোপীয় বিড়ালদের জিনগত গঠন আধুনিক গৃহপালিত বিড়ালের সঙ্গে মেলে না। বরং তারা ছিল আজকের ইউরোপীয় বন্যবিড়ালের (Felis silvestris) নিকটাত্মীয়। অর্থাৎ নিওলিথিক যুগে ইউরোপে যে বিড়ালদের উপস্থিতি দেখা যায়, তারা মানুষের আশপাশে থাকলেও আদতে গৃহপালিত ছিল না।
গবেষণায় দেখা যায়, আধুনিক গৃহপালিত বিড়ালের পূর্বসূরি ইউরোপে আসে প্রায় ২০০০ বছর আগে। ইউরোপের মূলভূমিতে পাওয়া প্রাচীনতম গৃহপালিত বিড়ালের নিদর্শন প্রথম শতক অর্থাৎ রোমান সাম্রাজ্যের প্রারম্ভিক সময়ে।
উত্তর আফ্রিকায় উৎস, রোমান যুগে বিস্তার
নতুন জিনোম বিশ্লেষণ বলছে, আধুনিক গৃহপালিত বিড়ালের উৎপত্তি মধ্যপ্রাচ্যে নয়, বরং উত্তর আফ্রিকায়। তিউনিসিয়ার আশপাশে দেখা আধুনিক আফ্রিকান বন্যবিড়ালের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ জিনগত সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এমনকি সার্ডিনিয়ায় বর্তমান যে রহস্যময় বন্যবিড়াল রয়েছে, তারাও উত্তর আফ্রিকান পূর্বসূরিদের বংশধর।
গবেষকরা ধারণা করছেন, সমুদ্রগামী ফিনিশীয় ও পুনিক সংস্কৃতির বণিকরা উত্তর আফ্রিকা, সার্ডিনিয়া ও দক্ষিণ আইবেরীয় উপদ্বীপে বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপনকালে সঙ্গে করে বিড়াল নিয়ে যান। পরবর্তীতে রোমান সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ইউরোপজুড়ে বিড়ালের বিস্তার দ্রুততর হয়। অস্ট্রিয়া, সার্বিয়া ও ব্রিটেনে রোমান সামরিক স্থাপনা থেকে পাওয়া বিড়ালের দেহাবশেষ আধুনিক গৃহপালিত বিড়ালের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
রোমান যুগে নগরায়ণের প্রসার বিড়ালের বিস্তারের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছিল। মানুষের বসতভিত্তিক ইকোসিস্টেমে অভিযোজনের ক্ষেত্রে বিড়াল যে কতটা দক্ষ, এই স্বল্পসময়ে তাদের বিস্তার তারই প্রমাণ।
পূর্ব এশিয়ায় যাত্রা ও আরো প্রশ্ন
অন্য এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ১৪০০ বছর আগে সিল্ক রোড ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বণিকদের সঙ্গে গৃহপালিত বিড়াল পূর্ব এশিয়ায় পৌঁছে। চীনে আবিষ্কৃত আরো পুরোনো ছোট বিড়ালের কঙ্কাল আসলে স্থানীয় লেপার্ড ক্যাটের, যারা বসতির আশপাশে খাবারের সন্ধানে যেত, কিন্তু পুরোপুরি গৃহপালিত ছিল না।
রহস্য এখনো বাকি
নতুন গবেষণাটি দেখায়, বিড়ালের গৃহপালনের ইতিহাস আগের ধারণার চেয়ে অনেক দেরিতে এবং ভিন্ন ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটে শুরু হয়েছে। তবু সব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। মানুষের সভ্যতার সঙ্গে বিড়ালের সহযাত্রা তাই শুধু পোষা প্রাণীর গল্প নয়, এটি অভিযোজন, বাণিজ্য, সাম্রাজ্য ও সহাবস্থানের এক দীর্ঘ বিবর্তন-গাথা।