বিয়ে থেকে সরে যাচ্ছে একটি প্রজন্ম, কেন?

তারা একা থাকছে, কিন্তু একাকিত্বকে এড়িয়ে যাচ্ছে না। টোকিওর ছোট ক্যাফেগুলোয় একা বসে থাকা তরুণ-তরুণী বা সিউলের স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টে নিঃশব্দ সন্ধ্যা, এই দৃশ্যগুলো এখন খুব সাধারণ। অনেকে বলেন, একটা সঙ্গের অভাব তারা অনুভব করেন, কিন্তু তবুও সম্পর্কের জটিলতায় জড়াতে চান না

দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলের এক তরুণ। বয়স তিরিশ ছুঁইছুঁই। পরিবার থেকে চাপ আসছে ‘এখনো বিয়ে করছ না কেন?’ বন্ধুরা কেউ কেউ বিয়ে করেছে, কেউ সন্তানও নিয়েছে। তরুণটি বিয়ে চান না তা নয়। কিন্তু বিয়ের কথা ভাবলেই একটা অদ্ভুত ভয় চেপে বসে তার ঘাড়ে। এ গল্প একা তার নয়। এশিয়ার অনেক শহর- টোকিও, সাংহাই, সিউলে তরুণদের মনে বিয়ে নিয়ে চলছে নানা দ্বিধা-দ্বন্দ। এদিকে চীনের শহরগুলোয় এখন বিয়ের সংখ্যা নেমে এসেছে গত ১২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে. জাপানে বছরে বিয়ের সংখ্যা ৫ লাখের নিচে নেমে ছুঁয়েছে এক ঐতিহাসিক নিম্নগতি. আর দক্ষিণ কোরিয়ায় কেউ কেউ বিয়ের কথা ভাবছেই না। একাকী জীবন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। চলুন জেনে আসি এর পেছনের সম্ভাব্য কারণগুলো।

ভয়ের কাছে হারছে ভালোবাসা

একটা সময় ছিল, যখন বিয়ে মানেই ছিল অর্থনৈতিক, সামাজিক, মানসিক নিরাপত্তা। এখন সমীকরণটা বদলে গেছে। এখন বিয়ে করার আগে মানুষকে ভাবতে হয়, আমি কি দায়িত্ব নিতে পারব?

জাপান কিংবা কোরিয়ার অনেক তরুণই মাঝারি কোম্পানিতে চাকরি করে জীবিকা নির্বাহ করছে। সেখানে বেশির ভাগ চাকরিই স্থায়ী নয়, বেতনও অনিশ্চিত। তাদের কাছে বিয়ে মানে শুধু সম্পর্ক নয়, একটি আর্থিক দায়, যা তিনি বহন করতে প্রস্তুত নন।

সিউলে বাড়ির দাম আকাশছোঁয়া, চীনে সন্তানের শিক্ষার খরচ অসহনীয়, জাপানে অনিশ্চিত কর্মসংস্থান—সব মিলিয়ে বিয়ে এখন হয়ে উঠেছে বোঝা। ভালোবাসা তাই আজ সেখানকার অনেকের কাছে এক ধরনের বিলাসিতা।

স্বপ্ন আর বাস্তবতার বেড়াজাল

এই প্রজন্মের অনেকেই ভালোবাসা চায়। কিন্তু সেই ভালোবাসার জন্য যে মূল্য দিতে হয় অর্থাৎ সময়, স্থিতি, আত্মত্যাগ তা দিতে তারা অনিচ্ছুকই নয়, বরং অক্ষম। একদিকে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অন্যদিকে ব্যক্তিগত জীবনের ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসা পরিসর। অফিসের পর ক্লান্ত শরীর, মাথায় অসমাপ্ত কাজের চাপ, এর মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলা, তা টিকিয়ে রাখা—সবই যেন এক অতিরিক্ত বোঝা। তারা অনেকেই বলেন, ‘সময় নেই।’ কিন্তু আসলে হয়তো তা শুধু সময়ের অভাব নয়। এটা মানসিক শক্তির অভাব, ক্লান্তির সঞ্চয়।

নারী-পুরুষের অদৃশ্য দূরত্ব

এ পরিবর্তনের ভেতরে আরেকটি নীরব টানাপোড়েন কাজ করছে। নারীরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি শিক্ষিত, স্বনির্ভর ও আত্মসচেতন। তারা নিজেদের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চান। কিন্তু সমাজের প্রত্যাশা কি বদলেছে? অনেক ক্ষেত্রে, না।

বিয়ের পরও নারীদের ওপরই পড়ে পরিবার, সন্তান, গৃহস্থালির প্রধান দায়। ক্যারিয়ারের সঙ্গে এই ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন। ফলে অনেক নারীই বিয়েকে এড়িয়ে যান। অন্যদিকে, পুরুষদের ওপর এখনো ‘অর্থনৈতিক ভিত্তি’ হওয়ার চাপ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেকেই সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছেন না। এ অমিলই তৈরি করছে এক অদৃশ্য দূরত্ব, যেখানে দুই পক্ষই ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।

একাকিত্ব: পছন্দ না পরিণতি?

অদ্ভুত এক দ্বৈততা তৈরি হয়েছে তরুণদের মাঝে। তারা একা থাকছে, কিন্তু একাকিত্বকে এড়িয়ে যাচ্ছে না। টোকিওর ছোট ক্যাফেগুলোয় একা বসে থাকা তরুণ-তরুণী বা সিউলের স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টে নিঃশব্দ সন্ধ্যা, এ দৃশ্যগুলো এখন খুব সাধারণ। অনেকে বলেন, সঙ্গের অভাব তারা অনুভব করেন, কিন্তু তবুও সম্পর্কের জটিলতায় জড়াতে চান না। ডিজিটাল পৃথিবী এক ধরনের বিকল্প সংযোগ দিয়েছে বটে কিন্তু সেই সংযোগে নেই স্থায়িত্ব, নেই গভীরতা। ফলে মানুষ সংযুক্ত থেকেও বিচ্ছিন্ন।

হাজার বছরের গল্পে ফাটল

এশিয়ার সমাজে বিয়ে শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ছিল না, এটি ছিল সামাজিক কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দু। পরিবার, বংশ, ঐতিহ্য, সবকিছুই এর সঙ্গে জড়িত। কিন্তু এখন সেই গল্পে ফাটল ধরেছে। নতুন প্রজন্ম বলছে— আমার জীবন, আমার সিদ্ধান্ত। তারা আর পূর্বনির্ধারিত পথ ধরে হাঁটতে চায় না।

​এশিয়ার এই পরিবর্তনের হাওয়া কিন্তু এখন আমাদের বাংলাদেশের গায়েও লাগতে শুরু করেছে। বেকারত্ব, আকাশছোঁয়া ঘরভাড়া, আর ক্যারিয়ারে একটু থিতু হওয়ার লড়াইয়ে বিয়েটা এখন আমাদের এখানেও অনেক পিছিয়ে যাচ্ছে।

​বাঙালির চিরচেনা সেই ‘কবে বিয়ে করছ?’ প্রশ্নের উত্তর এখন আর আগের মতো সোজাসাপ্টা নেই। আমাদের সমাজেও এখন ক্যারিয়ার আর ব্যক্তি স্বাধীনতার গুরুত্ব বাড়ছে, আর সেই সঙ্গে বাড়ছে বিয়ে নিয়ে এক ধরণের অনিশ্চয়তা।

​শেষ পর্যন্ত বিয়েটা কি শুধু একটা সামাজিক প্রথা হিসেবেই টিকে থাকবে, নাকি মানুষ তার নিজের মতো করে খুঁজে নেবে যাপনের নতুন কোনো পথ? এ প্রশ্নটা আজ শুধু সিউল বা টোকিওতে আটকে নেই—প্রশ্নটা হয়তো এখন আমাদের সবার জন্যই তোলা রইল।

আরও