উগান্ডার কিবালে ন্যাশনাল পার্কের ঘন জঙ্গলে এক সময় ছিল শিম্পাঞ্জিদের এক বিশাল শান্ত সমাজ। প্রায় দুই শতাধিক শিম্পাঞ্জি একই দলে থাকত, একসঙ্গে চলাফেরা করত, খাবার ভাগাভাগি করত, বিপদে একে-অন্যের পাশে দাঁড়াত। গবেষকদের কাছে দলটি ছিল ঐক্য আর সামাজিক বন্ধনের এক বিরল উদাহরণ। কিন্তু সে শান্ত সমাজে হঠাৎ দেখা দেয় অদৃশ্য ফাটল। একদিনের অস্বাভাবিক আচরণ ধীরে ধীরে রূপ নেয় বিভাজনে, যা এক পর্যায়ে পৌঁছে যায় রক্তক্ষয়ী সংঘাতে। এখন সেই জঙ্গলে চলছে শিম্পাঞ্জিদের এক নির্মম ‘গৃহযুদ্ধ’। একসময়কার সঙ্গীরাই আজ একে অন্যের শত্রু।
উগান্ডার এনগোগো শিম্পাঞ্জি প্রকল্পের গবেষকেরা জানান, ২০১৫ সালের ২৪ জুন প্রথম তারা এ পরিবর্তনের আভাস পান। সেদিন জঙ্গলে শিম্পাঞ্জিদের একটি দল হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে নীরব হয়ে যায়। কয়েকটি শিম্পাঞ্জি আতঙ্কে মুখ বিকৃত করে ফেলে, কেউ কেউ আবার একে অন্যকে স্পর্শ করে আশ্বস্ত হওয়ার চেষ্টা করছিল। দূরে আরো কিছু শিম্পাঞ্জির উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছিল। সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে তারা চিৎকার আর উচ্ছ্বাসে একে অন্যকে স্বাগত জানায়। কিন্তু সেদিন ঘটল উল্টোটা। কয়েকটি শিম্পাঞ্জি আচমকা দৌড়ে পালিয়ে গেল।
তাদের এ আচরণে দুই দশকের অভিজ্ঞ গবেষকেরাও হতবাক হয়ে যান। তাদের চোখের সামনে বহু বছরের ঐক্য ভেঙে অপরিচিতের মতো আচরণ করতে শুরু করেছিল প্রাণীগুলো। সেই মুহূর্তটিকেই গবেষকেরা এখন সংঘাতের সূচনা হিসেবে দেখছেন।
এরপর বিশাল শিম্পাঞ্জি সমাজটি ধীরে ধীরে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়— ‘ওয়েস্টার্ন’ ও ‘সেন্ট্রাল’। আগে যারা এক এলাকায় নির্বিঘ্নে চলাফেরা করত, তারা তখন নিজেদের সীমানা ভাগ করে নিল। শুরু হলো সীমান্ত পাহারা, দখলদারিত্ব আর হঠাৎ আক্রমণ।
গবেষকদের মতে, বন্যপ্রাণী জগতে এমন ঘটনা অন্তত ৫০০ বছরে একবার ঘটে। এর আগে, সত্তরের দশকে বিশ্বখ্যাত শিম্পাঞ্জি বিশেষজ্ঞ জেন গুডাল তানজানিয়ায় এমন যুদ্ধ দেখেছিলেন। এখন উগান্ডার এ বনে প্রায়ই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ঘটনা ঘটছে। ওয়েস্টার্ন শিম্পাঞ্জিরা অনেক বেশি হিংস্র হয়ে উঠেছে। ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তারা অন্তত ১৫ বার পরিকল্পিত হামলা চালিয়েছে। আর সেন্ট্রাল গ্রুপের অসংখ্য সদস্যকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে।
গবেষকরা বলছেন, ওয়েস্টার্ন দলের শিম্পাঞ্জিরা বেশি সংগঠিত ও আক্রমণাত্মক। যুদ্ধের শুরু থেকেই তারা নিজ নিজ সীমানায় নিয়মিত টহল দিচ্ছে। আর সুযোগ পেলেই বিপক্ষ দলের ওপর হামলা চালাচ্ছে।
যুদ্ধের এ ভয়াবহ নৃশংসতা বেশ কয়েকটি শিম্পাঞ্জির জীবন কেড়ে নিয়েছে। ২০১৮ সালে ‘এরল’ নামের এক তরুণ শিম্পাঞ্জিকে ওয়েস্টার্ন গ্রুপের পাঁচজন মিলে হত্যা করে। এর পরের বছর মারা যায় ৩৩ বছর বয়সী ‘বেসি’। তাকে যখন প্রতিপক্ষরা ঘিরে ধরে মারছিল, তখন ‘আরেথা’ নামের এক স্ত্রী শিম্পাঞ্জি নিজের শরীর দিয়ে ঢাল হয়ে বেসিকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। এখন পর্যন্ত এ গৃহযুদ্ধে ৭টি পূর্ণবয়স্ক ও ১৭টি শিশু শিম্পাঞ্জির মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া আরো ১৪টি শিম্পাঞ্জি নিখোঁজ রয়েছে, যাদের কপালে সম্ভবত একই মৃত্যু জুটেছে।
সেন্ট্রাল গ্রুপের বেসির ওপর ওয়েস্টার্ন গ্রুপের শিম্পাঞ্জিদের ভয়াবহ হামলার দৃশ্য
গবেষকদের ধারণা, কয়েকটি বড় পরিবর্তন এ বিভাজনের পেছনে কাজ করেছে। কয়েকটি শিম্পাঞ্জির মৃত্যু, নেতৃত্বে পরিবর্তন ও রোগের প্রাদুর্ভাব দলটির সামাজিক বন্ধন দুর্বল করে দেয়। ধীরে ধীরে সেই দুর্বলতা রূপ নেয় বিভাজনে, আর বিভাজন পৌঁছে যায় সংঘাতে।
এ গৃহযুদ্ধ এখন কোন দিকে মোড় নেবে, তা নিয়ে গবেষকরা চিন্তিত। প্রথমত, সেন্ট্রাল গ্রুপ যদি নিজেদের সংগঠিত করে পাল্টা প্রতিরোধ গড়তে পারে, তবে হয়তো হামলা কমবে। দ্বিতীয়ত, শক্তিশালী ওয়েস্টার্ন গ্রুপ হয়তো দুর্বল সেন্ট্রাল গ্রুপের শেষ সদস্যটি পর্যন্ত মেরে ফেলে পুরো এলাকা দখল করবে। গবেষকরা আরেকটি ক্ষীণ আশার কথাও ভাবছেন। তা হলো, হয়তো কোনো এক দিন তারা সব ভুলে আবার এক হবে। যদিও শিম্পাঞ্জির আচরণ অনুযায়ী এটি প্রায় অসম্ভব, তবুও প্রকৃতির এই নিষ্ঠুর খেলার শেষ কোথায়, তা দেখার অপেক্ষায় আছেন বিজ্ঞানীরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংঘাতটি শুধু প্রাণীজগতের একটি বিরল ঘটনা নয়, এটি মানুষের সমাজ সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। কারণ ধর্ম, জাতি বা রাজনীতির মতো মানবিক বিভাজন ছাড়াও কেবল সামাজিক সম্পর্কের দুর্বলতা থেকেই ভয়াবহ সংঘাত জন্ম নিতে পারে। শিম্পাঞ্জিদের এ লড়াই যেন মানুষের ইতিহাসেরই এক প্রতিচ্ছবি।
—মাহফুজা মিম অনূদিত ও পরিমার্জিত