ক্লোন ভেড়া ডলি কি জন্মের দিন থেকেই ৬ বছর বয়সের ছিল?

একটি ৬ বছরের পুরোনো ল্যাপটপকে সম্পূর্ণ রিসেট বা ফরম্যাট দিলে সেটি ভেতরের সব ফাইল ও অপ্রয়োজনীয় তথ্য মুছে নতুনের মতো দ্রুত কাজ করতে পারে। কিন্তু তাই বলে কি এর ব্যাটারি, ডিসপ্লে বা হার্ডওয়্যার নতুন হয়ে যায়? উত্তর হলো, না। সেগুলো আগের মতোই ৬ বছরের পুরনোই থাকে।

ডলির ক্ষেত্রেও বিষয়টি অনেকটা এমনই। তার কোষের জিনগত তথ্য নতুন করে কাজ শুরু করলেও সেই তথ্য এসেছিল একটি ৬ বছর বয়সী ভেড়ার দেহকোষ থেকে।

গবেষকেরা মোট ২৭৭টি ভ্রূণ তৈরি করেছিলেন। সেগুলো ১৩টি সারোগেট ভেড়ার শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাত্র একটি গর্ভধারণ সফল হয়। সেই একমাত্র সফল জন্মই ছিল ডলি। অর্থাৎ শত শত ব্যর্থতা, নষ্ট ভ্রূণ এবং অসংখ্য পরীক্ষার পর একটি ক্লোন প্রাণী জন্মেছিল।

৩০ বছর আগের এই দিনে স্কটল্যান্ডের একটি গবেষণাগারে জন্ম নিয়েছিল একটি ছোট্ট ফিন ডরসেট ভেড়া। ওর নাম রাখা হয় ‘ডলি’। সে দেখতে ছিল একেবারে সাধারণ একটি মেষশাবকের মতো। কিন্তু জন্মের কয়েক মাস পর যখন তার পরিচয় প্রকাশ করা হলো, তখন বিজ্ঞানজগতে শুরু হলো তুমুল আলোড়ন। কারণ ডলি কোনো স্বাভাবিক প্রজননের ফল ছিল না। সে ছিল পৃথিবীর প্রথম সফলভাবে ক্লোন করা পূর্ণবয়স্ক একটি স্তন্যপায়ী প্রাণী।

ডলির জন্মের প্রায় তিন দশক পরও তাকে ঘিরে দুটি প্রশ্ন সবচেয়ে বেশি মনে ঘুরপাক খায়। একটি হলো— ক্লোন আসলে কী? অন্যটি, ডলি কি জন্মের দিন থেকেই ৬ বছরের ‘বুড়ো’ ছিল?

ক্লোন মানে কী?

সহজ ভাষায় ক্লোন হলো এমন একটি প্রাণী, যার জিনগত গঠন আরেকটি প্রাণীর সঙ্গে প্রায় পুরোপুরি একই। প্রকৃতিতেও এমন ঘটনা ঘটে। অভিন্ন যমজ সন্তান একে অন্যের স্বাভাবিক ক্লোন। তবে ডলির ঘটনা ছিল ভিন্ন। তার জন্ম হয়েছে কোনো নিষিক্ত ডিম্বাণু থেকে নয়, বরং একটি পূর্ণবয়স্ক ভেড়ার শরীরের ডিএনএ থেকে।

গবেষকেরা একটি ৬ বছর বয়সী ফিন ডরসেট মাদি ভেড়ার স্তনগ্রন্থির কোষ থেকে নিউক্লিয়াস বের করেন। এরপর আরেকটি স্কটিশ ব্ল্যাকফেস ভেড়ার ডিম্বাণুর নিউক্লিয়াস ফেলে দিয়ে সেখানে সেই ডিএনএ বসানো হয়। পরে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে কোষটির বিভাজন ঘটানো হয়। পরে ভ্রূণটি আরেকটি স্কটিশ ব্ল্যাকফেস সারোগেট মায়ের গর্ভে প্রতিস্থাপন করা হয়। এর ১৪৮ দিন পর জন্ম নেয় ডলি।

তাহলে ডলির ‘মা’ কে?

এ প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দেয়া যায় না। কারণ ডলির ক্ষেত্রে তিনটি ভিন্ন ভেড়া জড়িত ছিল।

প্রথমটি সেই ৬ বছর বয়সী ফিন ডরসেট মাদি ভেড়া, যার স্তনগ্রন্থির কোষ থেকে ডিএনএ নেয়া হয়েছিল। জিনগত অর্থে ডলি ছিল এই ভেড়ারই ক্লোন বা অনুলিপি। দ্বিতীয়টি ছিল এক ভেড়া ডিম্বাণু দিয়েছিল। আর তৃতীয় এক স্কটিশ ব্ল্যাকফেস ভেড়া, যে নিজের গর্ভে ডলিকে বড় করে জন্ম দেয়। অর্থাৎ ডলির জন্মদাত্রী আর জিনগত ‘মা’ একই ভেড়া ছিল না। গবেষণাপত্রে এই তিনটি ভেড়ার কোনো নাম দেয়া হয়নি। কারণ হিসেবে ধারণা করা হয়, এ ভেড়াগুলোকে শুধু কোড বা নম্বর দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

ডলি কি জন্ম থেকেই ৬ বছর বয়সের ছিল?

এখানেই সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে। ডলি দেখতে জন্মের সময় একেবারেই স্বাভাবিক নবজাতক ভেড়ার মতো ছিল। কিন্তু তার শরীরের প্রতিটি কোষে যে নিউক্লিয়াস ছিল, সেটি এসেছিল ৬ বছর বয়সী একটি ভেড়ার দেহকোষ থেকে। অর্থাৎ সে দেখতে শাবক হলেও তার শরীরের অভ্যন্তরীণ উপাদান সবই ছিল ৬ বছর বয়সী সেই ভেড়াটির অনুরূপ। তার জিনগত উপাদান নতুন ছিল না। সেগুলো ছিল আগে থেকেই পূর্ণবয়স্ক একটি প্রাণীর কোষ।

ঠিক যেমন, ৬ বছরের পুরোনো একটি ল্যাপটপকে সম্পূর্ণ রিসেট বা ফরম্যাট দিলে সেটি ভেতরের সব ফাইল ও অপ্রয়োজনীয় তথ্য মুছে নতুনের মতো দ্রুত কাজ করতে পারে। কিন্তু তাই বলে কি এর ব্যাটারি, ডিসপ্লে বা হার্ডওয়্যার নতুন হয়ে যায়? উত্তর হলো, না। সেগুলো আগের মতোই ৬ বছরের পুরনোই থাকে।

ডলির ক্ষেত্রেও বিষয়টি অনেকটা এমনই। তার কোষের জিনগত তথ্য নতুন করে কাজ শুরু করলেও সেই তথ্য এসেছিল একটি ৬ বছর বয়সী ভেড়ার দেহকোষ থেকে। তাই ক্লোনিং নিয়ে বার্ধক্য ও কোষের বয়স নিয়ে আজও বিজ্ঞানী ও নীতিবিদদের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

এত ঝুঁকি নিয়ে কেন ডলি?

ডলি তৈরি করার উদ্দেশ্য ছিল পূর্ণবয়স্ক প্রাণীর কোষকে আবার ‘রিসেট’ করে নতুন প্রাণী তৈরি করা সম্ভব কি না। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন প্রাণী তৈরি করার পথ খুঁজছিলেন তারা, যেগুলো মানুষের প্রয়োজনীয় ওষুধ তৈরিতে কাজে লাগতে পারে। এই ধারণাকেই বলা হয় ‘ফার্মিং’। পাশাপাশি এর পেছনে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ওষুধ শিল্পের এক বিশাল বাণিজ্যিক ও গবেষণামূলক উদ্দেশ্য তো ছিলই।

পলি কে?

ডলির এক বছর পর ১৯৯৭ সালে জন্ম নেয় আরেকটি বিখ্যাত ক্লোন ভেড়া— পলি।

পলিকেও ক্লোনিং প্রযুক্তিতে তৈরি করা হয়েছিল। তবে তার শরীরে মানুষের ‘ফ্যাক্টর নাইন’ নামের একটি জিন যুক্ত করা হয়েছিল, যাতে তার দুধ থেকে হিমোফিলিয়া রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় রক্ত জমাট বাঁধার প্রোটিন তৈরি করা যায়।

বিজ্ঞানীদের কাছে এটিই ছিল আরো বড় সাফল্য। কারণ এতে প্রমাণ হয়, ক্লোন প্রাণী শুধু গবেষণার বিষয় নয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।

২৭৭টি চেষ্টা, সফল মাত্র ১টি

ডলির জন্মের গল্পে সবচেয়ে কঠিন অংশটি প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়।

গবেষকেরা মোট ২৭৭টি ভ্রূণ তৈরি করেছিলেন। সেগুলো ১৩টি সারোগেট ভেড়ার শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাত্র একটি গর্ভধারণ সফল হয়। সেই একমাত্র সফল জন্মই ছিল ডলি। অর্থাৎ শত শত ব্যর্থতা, নষ্ট ভ্রূণ এবং অসংখ্য পরীক্ষার পর একটি ক্লোন প্রাণী জন্মেছিল।

কিন্তু বিজ্ঞানীদের মনে ভয় ছিল। এই আবিষ্কার দুনিয়া কাঁপিয়ে দেবে এবং বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি করবে। তাই ডলির জন্মের খবরটি তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে জানানো হয়নি। প্রায় ৭ মাস ধরে ডলিকে ল্যাবের ভেতরে সম্পূর্ণ গোপনে বড় করা হয়। অবশেষে ১৯৯৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিজ্ঞানীরা আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ববাসীকে জানান যে, তারা প্রকৃতিকে চ্যালেঞ্জ করে ল্যাবে প্রথম স্তন্যপায়ী প্রাণীর ক্লোন তৈরি করতে সফল হয়েছেন।

এখানেই শুরু নৈতিক বিতর্ক

ডলির জন্মের পর থেকেই প্রশ্ন ওঠে— শুধু সম্ভব বলেই কি সবকিছু করা উচিত?

সমালোচকদের মতে, এত বিপুলসংখ্যক ব্যর্থ ভ্রূণ ও প্রাণীর কষ্টের বিনিময়ে একটি সফল ক্লোন তৈরি করা প্রাণীকল্যাণের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। আবার অনেকের আশঙ্কা ছিল, যদি একদিন একই প্রযুক্তি মানুষের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়, তাহলে পরিচয়, মর্যাদা, বৈষম্য ও ‘ডিজাইনার মানুষ’ তৈরির মতো ভয়ংকর সামাজিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।

অন্যদিকে সমর্থকেরা বলেন, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে স্টেম সেল চিকিৎসা, জিনগত রোগের গবেষণা এবং নতুন ওষুধ তৈরিতে মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে। তাই কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে গবেষণা চালিয়ে যাওয়া উচিত।

মানুষ ক্লোন করা কি নিষিদ্ধ?

অনেক দেশ মানুষের প্রজননমূলক ক্লোনিংয়ের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা বা কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে।

২০০৫ সালে জাতিসংঘ সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে মানুষের মর্যাদার পরিপন্থী সব ধরনের মানব ক্লোনিং নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানিয়ে একটি ঘোষণা গ্রহণ করে।

যুক্তরাজ্যে মানুষের ভ্রূণ নিয়ে গবেষণার জন্য বিশেষ লাইসেন্স লাগে এবং ১৪ দিনের বেশি ভ্রূণ সংরক্ষণ করা যায় না। যুক্তরাষ্ট্রে এখনো এ বিষয়ে একক ফেডারেল আইন নেই, তবে সরকারি অর্থে মানব ভ্রূণ ধ্বংস করে গবেষণা করার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই বিধিনিষেধ রয়েছে।

ডলির শেষ যাত্রা

ডলি ছয়টি মেষশাবকের জন্ম দিয়েছিল। পরে তার ফুসফুসের জটিল রোগ ধরা পড়ে। ২০০৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তাকে কষ্ট থেকে মুক্তি দিতে চিকিৎসকেরা ব্যথাহীন মৃত্যু বা ইউথেনেশিয়া (Euthanasia) দিতে বাধ্য হন। বর্তমানে ডলির দেহ স্কটল্যান্ডের জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষণ করা আছে।

সংক্ষেপে বললে, ডলির জীবনটা ছিল একটা বড় ট্র্যাজেডি। বিজ্ঞান তার মাধ্যমে একটা নির্মম সত্য জানতে পেরেছিল, কিন্তু সেই জানার মূল্যটা দিতে হয়েছিল ডলি নামের একটা নিরীহ ভেড়াকে, যা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।

আরও