অর্ধশতাব্দী পর কেন আবার চাঁদে যাচ্ছে মানুষ?

এই যাত্রায় ক্রুরা কেবল পরিচালনাকারী নন—তারা নিজেরাই হয়ে উঠবেন ‘মেডিক্যাল টেস্ট সাবজেক্ট’। গভীর মহাকাশ থেকে তথ্য ও চিত্র পাঠাবেন, যা ভবিষ্যৎ দীর্ঘমেয়াদি মিশনে মানুষের শরীর ও স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।

শীতল যুদ্ধের উত্তপ্ত সময়টায় চাঁদে যাওয়ার প্রশ্নটি ছিল বিজ্ঞানের চেয়ে বেশি ভূরাজনীতির। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার প্রতিযোগিতায় কে প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে—তা প্রমাণ করার মঞ্চ হয়ে উঠেছিল মহাকাশ। অ্যাপোলো কর্মসূচির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র যখন চাঁদের মাটিতে মানুষ নামাতে সক্ষম হলো, তখন সেই প্রতিযোগিতার মূল উদ্দেশ্য পূরণ হয়ে যায়। চাদের মাটিতে পতাকা তোলা, টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার, আর ‘প্রথম’ হওয়ার গৌরব—সবই অর্জিত হয়েছিল। এর পরই রাজনৈতিক আগ্রহ কমে আসে, বিপুল ব্যয়ের কারণে চাঁদে মানুষ পাঠানোর বিষয়টি ধীরে ধীরে কার্যত বাতিলের তালিকায় চলে যায়। অ্যাপোলো কর্মসূচিতে মোট ২৪ জন নভোচারী চাঁদ পর্যন্ত গিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ১২ জন চাঁদের মাটিতে হাঁটেন। ২৪ জনের মধ্যে এখন জীবিত আছেন মাত্র পাঁচজন।

১৯৭২ সালে অ্যাপোলো–১৭ এর পর চন্দ্র অভিযান থেমে যায় প্রায় অর্ধশতাব্দীর জন্য। এই দীর্ঘ বিরতির পেছনে কারণ ছিল স্পষ্ট। চাঁদে যাওয়া তখন আর কোনো তাৎক্ষণিক কৌশলগত প্রয়োজন মেটাচ্ছিল না। পৃথিবীর কক্ষপথে স্যাটেলাইট, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পরে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের মতো প্রকল্পগুলো তুলনামূলক কম খরচে বেশি ব্যবহারিক ফল দিচ্ছিল। ফলে চাঁদ হয়ে উঠেছিল ইতিহাসের অংশ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার নয়।

কিন্তু সময় বদলেছে, বদলেছে মহাকাশকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও। প্রায় অর্ধশতাব্দী পর পৃথিবীর মানুষ আবার চাঁদে পাড়ি জমানোর চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা তাদের বহুল প্রতীক্ষিত ‘আর্টেমিস-২’ মিশনের শুভসূচনা করতে পারে। ৫০ বছরেরও বেশি সময় পর এই প্রথম কোনো নভোচারীবাহী যান চাঁদের কক্ষপথের দিকে রওনা হবে।

আর্টেমিস-২। ছবি: রয়টার্স

কেন চাঁদে অভিযানে আগ্রহ?

মূলত চাঁদকে এবার দেখা হচ্ছে ভবিষ্যৎ গভীর মহাকাশ অভিযানের একটি ভিত্তি হিসেবে—যেখান থেকে মঙ্গলসহ আরো দূরের গ্রহে মানুষের যাত্রা সম্ভব হবে। দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, মানবস্বাস্থ্য, শক্তি ও সরবরাহ ব্যবস্থার পরীক্ষা পৃথিবীর কাছাকাছি থেকেই করা যাবে—এমন একটি পরীক্ষাগার হিসেবেই চাঁদের গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে। এর পাশাপাশি চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে সম্ভাব্য পানির অস্তিত্ব, নতুন প্রযুক্তি যাচাইয়ের সুযোগ, বেসরকারি কোম্পানি ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের যুক্ত করা এবং মহাকাশে নতুন করে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার আবির্ভাব—সব মিলিয়ে চাঁদ আবার কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে এসেছে। শীতল যুদ্ধের সময় চাঁদ ছিল প্রতীকী বিজয়ের মঞ্চ; আজ সেই চাঁদই হয়ে উঠছে ভবিষ্যৎ মানব সভ্যতার পরবর্তী অভিযানের প্রস্তুতিভূমি।

উদ্দেশ্য কী

এবার উদ্দেশ্য একবার গিয়ে ফিরে আসা নয়, বরং নতুন প্রযুক্তি ও বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির ভিত্তি তৈরি করা। যাতে ভবিষ্যতে চাঁদের চারপাশে ও চাঁদের পৃষ্ঠে মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে পারে। আর্টেমিস–২ এই দীর্ঘ পরিকল্পনার প্রথম বড় মানব-পরীক্ষা: মিশনটি হবে প্রায় ১০ দিনের, এবং নাসার ভাষ্য অনুযায়ী এটি নভোচারীদের ডিপ স্পেস বা মহাকাশের এমন গভীর দূরত্বে নিয়ে যাবে—যেখানে আগে কেউ যায়নি।

মহাকাশ জয়ের এই মহাযজ্ঞের প্রস্তুতি এখন তুঙ্গে। গত শনিবার নাসা তাদের দানবীয় ‘স্পেস লঞ্চ সিস্টেম’ (এসএলএস) রকেট এবং ‘ওরিয়ন’ স্পেস ক্যাপসুলকে বিশালকার যান তৈরির ভবন থেকে নিয়ে এসেছে উৎক্ষেপণ মঞ্চে। মাত্র ৪ মাইলের এ পথ পাড়ি দিতে রকেটটির সময় লেগেছে প্রায় ১২ ঘণ্টা।

বর্তমানে প্রকৌশলীরা রকেটের বৈদ্যুতিক সংযোগ, জ্বালানি ব্যবস্থা ও অন্যান্য জটিল যান্ত্রিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন। জানুয়ারির শেষদিকে অনুষ্ঠিত হবে একটি ‘ওয়েট ড্রেস রিহার্সাল’। এ সময় রকেটে জ্বালানি ভরে উৎক্ষেপণের আগের সব প্রস্তুতি নিখুঁতভাবে যাচাই করা হবে।

ছবি: নাসা

অভিযান কবে?

তবে এবারের চাঁদে যাওয়ার এ যাত্রা মোটেও সহজ নয়। তাই আর্টেমিস-২ মিশন উৎক্ষেপণের জন্য নাসা নির্দিষ্ট কিছু সময় বা উইন্ডো নির্ধারণ করেছে। যদি সব যান্ত্রিক ব্যবস্থা সঠিকভাবে কাজ করে, তবে আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি হতে পারে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। এজন্য শুধু রকেট প্রস্তুত থাকলেই হবে না, চাঁদকেও পৃথিবীর সাপেক্ষে সঠিক অবস্থানে থাকতে হবে।

ছবি: ইউরোপিয়ান এজেন্সি

নাসা সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে ৬, ৭, ৮, ১০ এবং ১১ ফেব্রুয়ারিকে নির্ধারণ করেছে। কোনো কারণে ফেব্রুয়ারিতে সম্ভব না হলে মার্চ বা এপ্রিলেও কিছু বিকল্প তারিখ রাখা হয়েছে।

যাচ্ছেন কারা?

১০ দিনের রুদ্ধশ্বাস এ অভিযানে ওরিয়ন মহাকাশযানে থাকবেন চারজন সাহসী নভোচারী। দলের নেতৃত্বে থাকবেন নাসার কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান। তার সফরসঙ্গী হবেন পাইলট ভিক্টর গ্লোভার এবং মিশন স্পেশালিস্ট ক্রিস্টিনা কোচ। এছাড়া কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির জেরেমি হ্যানসেনও এ এ মিশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। তারা চাঁদকে প্রদক্ষিণ করে মহাকাশের এমন গভীরে যাবেন, যেখানে আগে কখনো কোনো মানুষ পৌঁছাতে পারেনি।

মিশনটি শুরুতে পৃথিবীর কক্ষপথে নিরাপদে পৌঁছানোর পর নভোচারীরা পরীক্ষা করবেন ওরিয়ন মহাকাশযান কীভাবে পরিচালিত হয়। এর মধ্যে থাকবে হাতে-কলমে (ম্যানুয়ালি) ক্যাপসুল চালিয়ে দেখা—পৃথিবীর কক্ষপথে স্টিয়ারিং, নিয়ন্ত্রণ, এবং ভবিষ্যৎ চাঁদে অবতরণের জন্য মহাকাশযানকে সঠিকভাবে সারিবদ্ধ (লাইনিং আপ) করার অনুশীলন। এরপর তারা চাঁদেরও বহু হাজার কিলোমিটার পেছনে একটি বিন্দুতে যাবে—যেখানে গিয়ে ওরিয়নের লাইফ-সাপোর্ট, প্রপালশন, বিদ্যুৎ এবং ন্যাভিগেশন ব্যবস্থা যাচাই করা হবে।

আর্টেমিস-২ মিশনের চার সদস্যের এই দলে রয়েছেন (বাম থেকে) ক্রিস্টিনা কোচ, ভিক্টর গ্লোভার, কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান এবং জেরেমি হ্যানসেন। ছবি: নাসা

এই যাত্রায় ক্রুরা কেবল পরিচালনাকারী নন—তারা নিজেরাই হয়ে উঠবেন ‘মেডিক্যাল টেস্ট সাবজেক্ট’। গভীর মহাকাশ থেকে তথ্য ও চিত্র পাঠাবেন, যা ভবিষ্যৎ দীর্ঘমেয়াদি মিশনে মানুষের শরীর ও স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে। তারা কাজ করবেন ছোট একটি কেবিনে, শূন্য মাধ্যাকর্ষণে। নাসা বলছে, বিকিরণের মাত্রা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের (আইএসএস) চেয়ে বেশি হবে।

আর্টেমিস-২ কি চাঁদের মাটিতে নামবে?

উত্তর হলো—না। মিশনটির মূল লক্ষ্য হলো মহাকাশযানের জীবন-রক্ষণ ব্যবস্থা, প্রোপালশন এবং দিকনির্ণয় পদ্ধতিগুলো চরম প্রতিকূল পরিবেশে পরীক্ষা করা। এটি মূলত ২০২৭ বা ২০২৮ সালে পরিকল্পিত ‘আর্টেমিস-৩’ অভিযানের ভিত্তি তৈরি করতে যাচ্ছে। আর সেই অভিযানেই মানুষ চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে আবার নিজের পায়ের ছাপ রেখে আসবে।

এছাড়াও এবারের মিশনের মূল লক্ষ্য কেবল চাঁদে ঘুরে আসা নয়। বরং সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের পরিবেশ তৈরি করা। নাসা এখন চাঁদের চারপাশে ‘গেটওয়ে’ নামে একটি ছোট মহাকাশ স্টেশন তৈরির পরিকল্পনাও করছে।

আরও